মানুষজন তাকে স্টেডিয়ামে ঢুকতে দেখেই প্রবল চিৎকার, চেঁচামেচি শুরু করে সেদিন। ইব্রাহিম হকচকিয়ে যান খানিকটা৷ বানের জলের মতন মানুষ এসে তাকে 'শাহরুখ খান' ভেবে সেলফি তোলা শুরু করে। মানুষজন এতটাই মরিয়া ছিলো, তারা ইব্রাহিমের গায়ের শার্টও ছিঁড়ে ফেলে...

বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীতে একজন মানুষের হুবহু চেহারার আরো ছয়জন মানুষ থাকতে পারে। চেহারায় মিলজনিত এই অদ্ভুতুড়ে বিষয়টিকে বলা হয় ডোপেলগ্যাঙ্গার। তবে সব মানুষেরই যে আবার ডোপেলগ্যাঙ্গার থাকবেই, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। গবেষণায় বলে, প্রতি ট্রিলিয়নে হয়তো একজন মানুষের এরকম ডোপেলগ্যাঙ্গার থাকে৷ আবার যাদের ডোপেলগ্যাঙ্গার থাকে, তাদেরও একে অন্যের সাথে খুব একটা দেখা হয়না। সারাজীবনে একজন মানুষের সাথে তার ডোপেলগ্যাঙ্গারের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১১ শতাংশ! 

তবে 'ডোপেলগ্যাঙ্গার' কনসেপ্ট নিয়ে অনেক বিতর্কও আছে৷ তা সত্বেও শিল্পসাহিত্যে এই কনসেপ্ট নিয়ে কাজের সংখ্যাও কম না। সত্যজিৎ রায় এর 'গল্প ১০১' এ ডোপেলগ্যাঙ্গার নিয়ে গল্প আছে। সিনেমা-সিরিজে আকছারই দেখা যায় এই কনসেপ্টের ব্যবহার৷ তবে শিল্পসাহিত্যে যা-ই থাকুক, বাস্তবে এই কনসেপ্টের উদাহরণ খুব একটা চোখে পড়েনা৷ তবে সম্প্রতি বাস্তব পৃথিবীতেও চোখে পড়লো ডোপেলগ্যাঙ্গারের দুর্দান্ত এক উদাহরণ। 

মানুষটির নাম ইব্রাহিম কাদরি। গুজরাটের খুব ছোট্ট এক শহর জুনাগড়ে থাকেন বত্রিশ বছরের এই ভদ্রলোক। 'ওয়াল পেইন্টিং' করে জীবিকা নির্বাহ করেন। খুব নিস্তরঙ্গ,  উত্তেজনাহীন, ম্যাড়মেড়ে এক জীবন হতে পারতো তার। কিন্তু স্রষ্টার লীলা বিচিত্র। ছাপোষা ইব্রাহিমকে স্রষ্টা বানালেন এমন এক মানুষের ডোপেলগ্যাঙ্গার, যে মানুষটি গোটা পৃথিবীতে কম-বেশি পরিচিত, জনপ্রিয়। সে মানুষটির নাম শাহরুখ খান! 

ইব্রাহিম কাদরি'কে অনেকেই নানা সময়ে বলতেন, তার চেহারা অনেকটা 'এসআরকে'র মতন৷ ইব্রাহিম কাদরি এ প্রশংসায় খুশিও হতেন। কিন্তু বিষয়টির গভীরতা ঠিক কতটুকু, তা তিনি প্রথম বুঝেছিলেন ২০১৭ সালে। আইপিএল এ কলকাতা নাইট রাইডার্স এবং গুজরাট লায়ন্স এর মধ্যকার একটা ম্যাচ দেখতে রাজকোটের খান্ডেরি স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন তিনি। খেলা দেখতে যে মুহুর্তে তিনি স্টেডিয়ামে ঢোকেন, ঠিক সে মুহুর্তেই শুরু হয় বিপত্তি। 

মানুষজন তাকে স্টেডিয়ামে ঢুকতে দেখে প্রবলবেগে চিৎকার, চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। ইব্রাহিম নিজেও হকচকিয়ে যান খানিকটা৷ বানের জলের মতন মানুষ  এসে তাকে 'শাহরুখ খান' ভেবে সেলফি তোলা শুরু করে। মানুষজন এতটাই মরিয়া ছিলো, তাদের প্রবল আতিশয্যে গায়ের শার্ট পুরোপুরি ছিঁড়ে যায় ইব্রাহিমের৷ ক্রমশই তিনি বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি হাতের নাগালে চলে যাচ্ছে৷ সাহায্যের জন্যে যখন তিনি পুলিশের কাছে গেলেন, পুলিশও ভাবলো উলটো। তাকে 'শাহরুখ খান' ভেবে তারাও ছবি তোলা শুরু করার উপক্রম করছিলো প্রায়। তবে বিস্তারিত ঘটনা শুনবার পরে তারা নিজেদের ভুল বুঝলেন,  হট্টগোল সামলালেন৷ ইব্রাহিমও প্রাণটুকু হাতে নিয়ে জনস্রোত থেকে কোনোক্রমে বেরোলেন সেদিন। 

ইব্রাহিম এরপর এই বিষয়টিকে সিরিয়াসলি নিয়ে নিলেন। শাহরুখ খানের সব সিনেমা, ইউটিউবে তাঁর যত মিউজিক ভিডিও, ড্যান্স মুভমেন্ট, ইন্টারভিউ আছে, সব দেখলেন। এসআরকে'র স্টাইলগুলো নকল করা শুরু করলেন৷ অভিনয় শিখলেন। শিখলেন নাচও। টানা দুই বছর চেষ্টাচরিত্রের পর তিনি 'কিং খান' এর সিগনেচার স্টাইল আয়ত্বে আনলেন পুরোপুরি। 

এরপর থেকে জীবনটাই পালটে গিয়েছে ইব্রাহিমের। বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে রাজনীতির প্রচারণা...সবখানেই তাকে ডাকা হয় এখন। নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে তিনি যাচ্ছেনও সেসব প্রোগ্রামে। শাহরুখ খানের বিখ্যাত ডায়লগ, নাচের স্টেপ, হাঁটার সিগনেচার স্টাইল দেখাচ্ছেন মানুষকে। মানুষ এভাবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে পেরে তীব্র আনন্দও পাচ্ছে। এভাবেই ক্রমশ নিজ এলাকায় 'ইব্রাহিম কাদরি' রূপান্তরিত হয়েছে 'ডুপ্লিকেট শাহরুখ খান' এ!

তবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি খানিকটা খেসারতও দিতে হয়েছে তাকে। শাহরুখ খান এর হাবভাব নকল করার পরে এখন স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে বেগ পেতে হয়। মাফলার বা রুমাল  মুখে পেঁচিয়ে এরপর তাকে যেতে হয় জনসমাগমে। নাহয় বিড়ম্বনা বাড়ে৷  অবশ্য এই বিড়ম্বনাকে উপভোগই করেন কাদরি। 

দেখে চেনার উপায়ই নেই যে, মানুষটি শাহরুখ খান নন! 

এই মানুষটির এখন একটাই ইচ্ছে, শাহরুখ খানের সাথে দেখা করবেন। দেখা হলে একটাই লাইনই বলবেন; আই লাভ ইউ, স্যার...দিল সে। আমাদের ঠিক জানা নেই, শাহরুখ খানের সাথে তার ডোপেলগ্যাঙ্গারের দেখা হবে কী না। যদি দেখা হয় কোনোদিন, তাহলে এটা হবে বিরল সুন্দর এক বিষয়। প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়ালের সার্থক মঞ্চায়নও সেদিন উপভোগ করতে পারবে মানুষজন! সে দিনের জন্যে অপেক্ষা হয়তো করাই যায়। তাই না? 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা