নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে যেমন বাংলাদেশ অনেকদিন মনে রাখবে, পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাজপথে নামা ইলিয়াস কাঞ্চনকে এদেশের মানুষ একশো বছর পরেও স্মরণ করবে, এটা নিশ্চিত। আর কেউ না করলেও আমরা অন্তত মনে রাখব, এই মানুষটা আকাশছোঁয়া তারকাখ্যাতি ফেলে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন...

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের কথা। 'বেদের মেয়ে জোৎস্না' সিনেমা দিয়ে তখন সাফল্যের শিখরে উঠে গিয়েছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। অঞ্জু ঘোষের সঙ্গে তার জুটি লুফে নিয়েছিল দর্শক, টানা আড়াই বছর ধরে সিনেমাটা চলেছে সিনেমা হলে। আগেকার সব রেকর্ড ভেঙে দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি টাকা আয় করেছিল বেদের মেয়ে জোৎস্না, যে রেকর্ড আজও কেউ ভাঙতে পারেনি। ভারতে এই সিনেমার রিমেক হয়েছে, সেই সময়ে বাংলাদেশী নায়কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নিতেন ইলিয়াস কাঞ্চন। কিন্ত সুখ কপালে সইলো না বেশিদিন, তার জীবনে নেমে এল করুণ এক অধ্যায়। 

১৯৯৩ সালের ঘটনা। ইলিয়াস কাঞ্চন তখন বান্দরবনে শুটিং করছেন। তাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্যে গাড়ি ভাড়া করে  বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে বান্দরবনে রওনা হলেন কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা। পাহাড়ি রাস্তায় ড্রাইভারের ভুলে ঘটলো মারাত্নক এক দুর্ঘটনা, গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দুমড়ে মুচড়ে গেল গাড়ি। বাচ্চারা বেঁচে গেলেও, ঘটনাস্থলেই মারা গেলেন জাহানারা। খবর পেয়ে ছুটে এলেন ইলিয়াস কাঞ্চন, পেলে জাহানারার নিথর মরদেহ। স্ত্রীর সেই অকাল মৃত্যুতে প্রচন্ড মানসিক আঘাত পান কাঞ্চন। এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে ঠিকই করে ফেলেছিলেন, আর কোন ছবিতে অভিনয় করবেন না তিনি।

বেশ কিছুদিন শুটিং থেকে দূরে ছিলেন। পরিচিত কয়েকজন তাকে বোঝালেন, শুটিং বন্ধ করে দিয়ে তো লাভ নেই। যদি পারো, মানুষকে সচেতন করো, সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর জন্যে কাজ করো। আইডিয়াটা পছন্দ হলো কাঞ্চনের, সড়ক দুর্ঘটনায় যেন আর কোন প্রাণ ঝরে না পড়ে, কোন মানুষ যাতে প্রিয়জন না হারায়, সেই মিশন নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন 'নিরাপদ সড়ক চাই' আন্দোলনের। প্রেসক্লাবের সামনে বিশাল এক র‍্যালি দিয়ে যাত্রা শুরু হলো সংগঠনের। সেই র‍্যালিতে মানুষ সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সচেতন হতে আসেনি, এসেছিল প্রিয় নায়ককে সামনে থেকে এক নজর দেখার জন্যে।

ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা

নিজের ব্যস্ত শিডিউল, চাকরি, শুটিং, তারকাখ্যাতি- সবকিছু সামলে নিয়মিত রাস্তায় ছুটে গেছেন কাঞ্চন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। চালকদের বুঝিয়েছেন, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি না চালানোর অনুরোধ করেছেন। যাত্রীদের বলেছেন সড়ক আইনের কথা, পথচারী পারাপারের নিয়মের কথা। নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে সংগঠন চালিয়েছেন, অফিসের ভাড়া দিয়েছেন, লিফলেট ছাপিয়ে বিলি করেছেন সেগুলো। অনেকেই তাকে নিয়ে হেসেছে, মশকরা করেছে, ইলিয়াস কাঞ্চন তাতে দমে যাননি একটুও, নতুন উদ্যোমে কাজ শুরু করেছেন বারবার। 

১৯৯৩ সালের পর থেকে ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রতিটি সিনেমা শুরুর আগে পর্দায় লেখা উঠতো- 'নিরাপদ সড়ক চাই।' তিনি দেশের নানা প্রান্তে স্কুলে স্কুলে ঘুরে বেড়িয়েছেন, ছাত্র-ছাত্রীদের শেখানোর চেষ্টা করেছেন কিভাবে নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে হবে। সরকারের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ প্রয়োগ করেছেন তিনি, যাতে দুর্ঘটনায় দায়ী চালকদের বিচারের আওতায় আনা হয় সেজন্যে। টেলিভিশনের লাইভ টক-শো তে সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খানকে তিনি ধুয়ে দিয়েছিলেন দোষী চালকদের পক্ষে কথা বলায়। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় যখন ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলা চালানো হলো, তখন তিনি কেঁদে বলেছিলেন, 'তোমরা প্লিজ বাড়ি ফিরে যাও, জীবনের চেয়ে দামী আর কিছু নেই।'

একটা সময়ে পরিবহন শ্রমিকেরা তাকে শত্রু ভাবতে শুরু করেছে, মালিকপক্ষ তাদের বুঝিয়েছে, এই ইলিয়াস কাঞ্চন লোকটা ড্রাইভার-হেল্পারদের বিচার চায়, তারা তাই কাঞ্চনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রও করা হয়েছে, উড়ো ফোনে হুমকি দেয়া হয়েছে মেরে ফেলার। কাঞ্চন সেসবে ভয় পাননি, আন্দোলন থামানোর কথা মাথায় আনেননি। যতোবার হুমকি এসেছে, কাঞ্চনের চোখে ভেসে উঠেছে তার স্ত্রী জাহানারার রক্তে ভেসে যাওয়া দেহটার ছবি। প্রিয়জন হারানোর এমন পরিণতি যেন আর কারো ভাগ্যে না জোটে, সেই মিশনে আরও জোর কদমে চলতে শুরু করেছেন তিনি।

স্ত্রী জাহানারার সঙ্গে ইলিয়াস কাঞ্চন

গতবছর যখন সড়ক আইন করা হলো, পরিবহন শ্রমিকেরা তখন লাগলো ইলিয়াস কাঞ্চনের পেছনে, যেন তিনি তাদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছেন। গত ছাব্বিশ বছর ধরে ইলিয়াস কাঞ্চন চালক থেকে শুরু করে যাত্রী, এমনকি সাধারণ পথচারীদেরও সড়কে চলাচলের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, সেই মানুষটার ছবিতে জুতার মালা দিলো পরিবহন শ্রমিকেরা, বিশ্রি ভাষায় তাকে আক্রমণ করে, পরিবহন শ্রমিকদের শত্রু আখ্যা দিয়ে ব্যানার-পোস্টার ছাপানো হলো। পরিবহন শ্রমিকদের নেতা শাজাহান খান তার বিরুদ্ধে অবান্তর সব অভিযোগ তুললেন। ছাব্বিশটা বছর ধরে রক্ত পানি করা পরিশ্রমের প্রতিদান আমরা এভাবেই দিয়েছিলাম ইলিয়াস কাঞ্চনকে।

চালকদের কথা বাদই দিলাম, আমাদের মধ্যেও কিছু মানুষ ইলিয়াস কাঞ্চনকে নিয়ে হাসাহাসি করে, তার কাজের সমালোচনা করে, প্রশ্ন তোলে, নিরাপদ সড়কের আন্দোলন করে কয়টা মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন তিনি? কাঞ্চন এসবে কান দেন না, তিনি একমনে নিজের কাজটা করে যান। এখনও তিনি হ্যান্ডমাইক নিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ান, মানুষকে সচেতন করেন, উল্টো রাস্তায় কাউকে গাড়ি নিয়ে যেতে দেখলে পথ আটকে কড়া ধমক দেন। যে পরিবহন শ্রমিকেরা তাকে অপমান করে, গালাগাল দেয়, করোনার দুর্যোগের সময় তিনি খাদ্যসামগ্রীর ব্যাগ নিয়ে তাদের কাছেই ছুটে যান!

মানুষ মানুষের জন্যে, এই প্রবাদটা সমাজ থেকে উঠে গেছে প্রায়, সেই সমাজে ইলিয়াস কাঞ্চন মানুষের জন্যে কাজ করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন প্রতিদিনই। নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে যেমন বাংলাদেশ অনেকদিন মনে রাখবে, পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাজপথে নামা ইলিয়াস কাঞ্চনকে এদেশের মানুষ একশো বছর পরেও স্মরণ করবে, এটা নিশ্চিত। আর কেউ না করলেও আমরা অন্তত মনে রাখব, এই মানুষটা আকাশছোঁয়া তারকাখ্যাতি ফেলে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা