আমরা বহু বছর ধরে 'কোয়ি মিল গায়া' সিনেমার 'জাদু' চরিত্রটিকে নিয়ে প্রবল মাতামাতি করেছি, অথচ আমরা জানতামই না নীল এই কস্টিউমের আড়ালে লুকিয়ে আছেন কোন সে মানুষ! এবং আড়ালে থাকা সে মানুষটির গল্প খুবই অন্যরকম, বিষন্ন এবং মন খারাপেরও!

২০০৩ সালে বলিউডে মুক্তি পায় এক বিশেষ সিনেমা। সেই সিনেমা মুক্তির আগে ভারতের প্রেক্ষাপট এমন ছিলো, সেখানে কল্পবিজ্ঞান নিয়ে আদিখ্যেতা দেখানোর মতন মানসম্মত সিনেমা ছিলো অনুপস্থিত। পাশাপাশি, ভারতের ছিলো না নিজস্ব কোনো সুপারহিরোও। সেরকম এক সময়ে রাকেশ রোশন নির্মাণ করলেন- কই মিল গায়া। কল্পবিজ্ঞান নিয়ে সিনেমা; সাথে উপরিপাওনা- 'কৃষ' নামের এক সুপারহিরো। ভিনগ্রহ থেকে আসা 'জাদু' নামের সেই অদ্ভুতুড়ে প্রাণী, সেই প্রাণীর সাথে সম্পর্কিত কিছু মানুষের জীবন চিরকালের জন্যে পালটে যাওয়া, গল্পের মাঝে মাঝে খানিকটা রোমান্টিসিজম, খানিকটা অ্যাকশন, সব মিলিয়ে দারুণ এক পটবয়লার।

'কোই মিল গায়া' কিংবা 'কোই মিল গায়া'র সিক্যুয়েল 'কৃষ' অথবা 'কৃষ থ্রি'... এই সিনেমাগুলো আমাদের অনেকেরই নস্টালজিয়া। এবং এই সিনেমাগুলোর অনেক অনুষঙ্গের পাশাপাশি এক বিশেষ চরিত্রও আমাদের খুব প্রিয়। হ্যাঁ, 'জাদু'র কথাই বলছি। নীলরঙা এ ভিনগ্রহের প্রাণীর প্রধান খাদ্য- আলো। তার শ্লথ হাঁটাচলা এবং কীর্তিকলাপ... আমাদের তৃপ্তিবর্ধক। যতবারই এই সিরিজের সিনেমাগুলো দেখেছি, এই চরিত্রটির জন্যে আলাদা মায়া অনুভব করেছি।

মজার ব্যাপার হলো, এই 'জাদু' চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছিলেন, সেই মানুষটির জীবন-গল্পও কিন্তু খুব অন্যরকম। 'জাদু' চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ইন্দ্রবদন পুরোহিত। যিনি 'ছোটে ওস্তাদ' নামে ফিল্মপাড়ায় সম্যক পরিচিত। আমরা বহু বছর ধরে 'জাদু' চরিত্রটিকে নিয়ে প্রবল মাতামাতি করেছি, অথচ আমরা জানতামই না নীল এই কস্টিউমের আড়ালে লুকিয়ে আছেন কোন সে মানুষ! এই বিষয়টিকে ইন্দ্রবদন পুরোহিতের জীবনের সারাংশ হিসেবেও ধরে নেয়া যেতে পারে। ১৯৭৬ সালে অভিনয়ের ক্যারিয়ার শুরু করার পর থেকে তিনি সারাজীবনে ৩০০টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। সাব টিভির কিডস শো'তে 'ডুবা ডুবা" চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তারাক মেহতা'র 'উলটো চশমা'তেও যুক্ত ছিলেন। এবং অবাক করার মতন বিষয়, তিনি হলিউড মাস্টারপিস 'লর্ড অব দ্য রিংস' সিরিজের 'লর্ড অব দ্য রিংস- দ্য ফেলোশিপ অফ দ্য কিং' সিনেমাতেও যুক্ত ছিলেন! এছাড়াও নাগিনা, বোল রাধা বোল, দারার সহ সিনেমাতে যুক্ত ছিলেন তিনি৷ কিন্তু তবুও তাকে খুব কম মানুষই চিনতেন সেভাবে! 

'জাদু'র কস্টিউম হাতে ইন্দ্রবদন পুরোহিত! 

অজস্র চরিত্রে অভিনয় করলেও 'কৃষ' ফ্রাঞ্চাইজির 'জাদু' চরিত্রই তার ক্যারিয়ারের ল্যান্ডমার্ক । রাকেশ রোশন এই চরিত্রে অভিনয়ের আগে ৩০-৪০ জন লোকের ট্রায়াল নিয়েছেন। সবশেষে ইন্দ্রবদন'কে বাছাই করেছেন। ইন্দ্রবদন একটু স্বাস্থ্যবান হওয়ায়, জিম এবং ডায়েট করে তাকে ওজন কমাতেও হয়েছিলো। 'জাদু'র নীল কস্টিউম খানিকটা ভারি থাকায় প্রতিবারই শট শেষ হলে তাই আলাদা করে অক্সিজেন নিতে হতো ইন্দ্রবদন'কে। বেশ কষ্টসাধ্য এক কাজই তাকে করতে হয়েছিলো সিনেমার পুরো সময়ে।

অথচ মানুষ 'জাদু'কে যতটা চেনে, তার সিকিভাগও চেনে না এই চরিত্রের জন্যে অক্লান্ত শ্রম দেয়া মানুষটিকে। 'কামিয়াব' নামে এক সিনেমা দেখেছিলাম সম্প্রতি। যে সিনেমার প্রোটাগনিস্ট চরিত্রটি সারাজীবন অজস্র সিনেমায় ছোটোখাটো চরিত্রে অভিনয় করেছে। কিন্তু কেউ মনে রাখেনি তাকে। তাই শেষ বয়সে এসে তার শখ হয়েছিলো, ক্যারিয়ারের শেষ সিনেমায় দারুণ এক চরিত্রে অভিনয় করবেন তিনি। যাতে করে মানু্ষ মনে রাখে তাকে! শেষ পর্যন্ত তিনি তা পেরেছিলেন কী না, তা সিনেমা দেখলেই জানা যাবে। কিন্তু, এই সিনেমার সাথে যার গল্প মিলে যায়, সেই ইন্দ্রবদন পুরোহিত শেষপর্যন্ত সবার অগোচরে থেকেই মারা গিয়েছেন ২০১৪ সালে; 'জাদু' চরিত্রের আড়ালে থাকা নিভৃতচারী এক জীবন নিয়ে। 

ইন্দ্রবদন পুরোহিত! 

ইন্দ্রবদন পুরোহিত এর জন্যে রইলো শ্রদ্ধা। সে সাথে শ্রদ্ধা রইলো সিনেমার সেসব নাম না জানা অগুনতি শিল্পীর জন্যেও, যারা স্বীকৃতির দাম কোনোদিনই পায় নি, হয়তো সামনেও পাবে না, কিন্তু মনে রাখতে হবে এটুকুই, কেউ মনে রাখুক কিংবা না, তাদের অবদান কোনোদিন তিলমাত্রও অস্বীকারও করা যাবে না। তাদের শ্রম, ত্যাগ, অবদান অস্বীকার করলে তা অন্যায় হবে, হবে অবিবেচক আচরণ। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা