ইত্যাদির শক্তির দিক এই ব্যালেন্স৷ কখনোই মনে হবে না, 'ইত্যাদি' শুধুমাত্র রাশভারী বিষয়বস্তুর একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান৷ আবার কখনোই মনে হবে না, এটা সস্তাদরের কোনো অনুষ্ঠান। দর্শকের পালস বুঝে সবকিছুর সামঞ্জস্য বজায় রেখে এত দীর্ঘ সময় ধরে দর্শক চাহিদার শীর্ষে থাকা, ইত্যাদির চমৎকারিত্ব এখানেই...

শৈশবের ঈদের কয়েকদিন আমাদের জন্যে ছিলো অখণ্ড শান্তির এক পার্বণ। পড়াশোনার চাপ নেই, বাবা-মা'র শাসন নেই, স্কুলে ক্লাস নেই... এ এক অদ্ভুত সময়। টিভিতে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন, ডিশ লাইনের কারিকুরি নেই। সাদাকালো টিভিতে একটিমাত্র চ্যানেল; বিটিভি৷ সেই চ্যানেলে ঈদের পাঁচ-ছয়'দিন ধরে নানারকম অনুষ্ঠান। দোতলা বাসায় সারাবছর টিভি থাকতো উপরের তলায়। ঈদের এই কয়দিনের জন্যে টিভি স্থানান্তরিত হয়ে আবির্ভূত হতো নীচে। খাওয়া, ঘুম, খুনসুটি সবই টিভিসেটের সামনে। পেপার দেখে খাতায় লিখে রাখা হতো, কী কী অনুষ্ঠান অবশ্যই দেখতে হবে। দেখার সেই লিস্টে আর কিছু থাকুক আর না থাকুক, একটা অনুষ্ঠান কখনো মিস হতো না। সচেতন পাঠকদের অবশ্য ধরে ফেলার কথা, কোন অনুষ্ঠানের কথা বলছি। 

আরেকটু হিন্ট দেয়া যাক। সেই অনুষ্ঠানের শুরুর লাইনটি হচ্ছে- কেউ কেউ অবিরাম চুপিচুপি... এবার নির্ঘাত ভাবেই  সবাই বুঝে গিয়েছেন, কোন অনুষ্ঠানের কথা বলছি৷ হ্যাঁ, ইত্যাদি নিয়েই কথা আজ। শুকনো, পলকা একজন মানুষ, 'হানিফ সংকেত' যার নাম, আজ থেকে বহু বছর আগে, ১৯৮৯ সালে শুরু করেছিলেন 'ইত্যাদি' নিয়ে পথচলা। এই এত বছরের যাত্রাপত্রে সেই 'ইত্যাদি'র জৌলুশ তো কমেইনি৷ বরং প্রতিবারেই আগের বারকে ছাপিয়ে গিয়েছে স্রোতের বিপরীতে থাকা এ ম্যাগাজিন শো। 

'স্রোতের বিপরীতে' বলার পেছনে কারণ আছে। 'বিনোদন' মানেই আমরা সবসময়ে ধরে নেই চটকদার বিষয়। যেখানে জাঁকজমক আর জৌলুশ থাকবে ঠাঁসাঠাসি করে। কিন্তু বিনোদন-হাস্যরস'কে হাতিয়ার করে যে সমাজসংস্কার এর নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরা যায়, মানুষের যাপিত সব সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরা যায়... স্রোতের বিপরীতে গিয়ে সেই কনসেপ্টটি তুলে ধরার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ- ইত্যাদি। আপনি শো দেখে প্রানখুলে হাসবেন, সাথে বিবেকের দোরগোড়ায়ও একটা বড়সড় ধাক্কা খাবেন...এরচেয়ে অসাধারণ আর কী হতে পারে? এই অসাধারণত্ব আর চমৎকারিত্বই ঘটিয়েছে হানিফ সংকেত ও টীম। 

হানিফ সংকেত; ইত্যাদির কারিগর! 

শুধুমাত্র কন্টেন্ট এর ভ্যারাইটির দিকেই না, তারা খেয়াল রাখে কন্টেন্টের কোয়ালিটি, ডেপথ আর দেশের ঐতিহ্য-সংস্কৃতির দিকেও। যখন যেখানে শো করেছে তারা, সেসব জায়গার অজানা নানা ইতিহাস তুলে ধরেছে।  সেসব স্থানের কৃতী অথচ সবার অগোচরে থাকা মানুষগুলোকে, তাদের কাজগুলোকে তুলে ধরেছে, সহায়তা করেছে ইত্যাদি। এই বিষয়টা অন্যরকম। একটা ম্যাগাজিন শো, তারা বিভিন্ন অঞ্চলের এত গভীরে গিয়ে রিসার্চ করে গুনী গুনী মানুষদের তুলে আনছে, যাদের নিয়ে পরবর্তীতে দেশ মাতামাতি করেছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করেছে, সেটার শুরুটা হয়তো ইত্যাদির মাধ্যমেই। 

অজস্র প্রতিভারও জন্ম দিয়েছে এ মঞ্চ। ফোক সম্রাজ্ঞী 'মমতাজ' প্রথমবার টিভি পর্দায় এসেছিলেন ইত্যাদির মঞ্চের মাধ্যমেই। মানিকগঞ্জের মমতাজকে সারাদেশের মমতাজ বানিয়েছেন হানিফ সংকেত। রিক্সাচালক 'আকবর'কেও জনপ্রিয় করেছিলো এই অনুষ্ঠান। রাজশাহীর বইপাগল 'পলান সরকার'কেও তুলে এনেছিলো ইত্যাদি।  সবচেয়ে যেটা ভালো লাগে, 'ইত্যাদি' যাদের জনপ্রিয় করেছে, তাদের দুর্দিনেও 'ইত্যাদি' তাদের ভুলে যায় নি। যেমন- আকবরের কথাই বলা যায়। আকবর অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পরে হানিফ সংকেত বেশ ভালো একটা অনুদান দিয়েছিলেন আকবরকে৷ যেই অনুদানের কথা তিনি কোথাও প্রচার করেননি৷ অনেকটা নিভৃতেই এই কাজটি করেন তিনি। যে ঘটনার কথা পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি আকবরের মুখে। মন ছুঁয়ে গিয়েছিলো শুনে। 

মমতাজের শুরুটাও ইত্যাদি'র মাধ্যমে! 

'ফাগুন অডিও ভিশন' এর ব্যানারে এবং 'কেয়া কসমেটিকস' এর সৌজন্যে ত্রিশ বছর ধরে চলা 'ইত্যাদি'র মুগ্ধকরী জাদুটোনা বানের পেছনে হানিফ সংকেতের ব্রিলিয়ান্ট উপস্থাপনা তো রইলোই। সে সাথে দর্শকের রুচি বুঝে 'ইত্যাদি'র স্ট্রাকচারাল স্টাইলও পাল্টেছে সময়ের সাথে সাথে। হ্যাঁ, এটা ঠিক, ইত্যাদির উপহারের তালিকায় এখনো দেখা যায়, অনেক আগে থেকে চলে আসা কেয়া কসমেটিকস এর সৌজন্যে মূল্যবান উপহার গাছ এবং বই'কে। এখানে বৈচিত্র্য আসেনি আজও। এটা নিয়ে আমরা ট্রোলও করি দেদারসে। কিন্তু ইত্যাদির বিচিত্র সব এক্সপেরিমেন্ট এসেছে অরিয়েন্টেশন, কন্টেন্ট মেকিং এ। করোনাকালীন সময়ে যেমন ফাঁকা অডিয়েন্স রেখে শুটিং হলো ইত্যাদির। মাঝখানে যখন লকডাউন শিথিল করা হলো, তখন ইত্যাদি'র নতুন পর্বে সবার জন্যে নিশ্চিত করা হয়েছিলো মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার সহ সবকিছু। আর যখন যেখানে শো করা হচ্ছে, সেই স্থানের বিখ্যাত স্থাপনাকে 'ইত্যাদি'র সেটে তুলে নিয়ে আসার অভিনবত্ব নিয়ে আর নাই বা বললাম কিছু।

এটা ঠিক, 'ইত্যাদি' টানা তিন দশক ধরে সমাজকে বদলে দেয়ার কাজটা করা যাচ্ছে। তাদের প্রত্যেকটা কন্টেন্ট এর মধ্যেই নানারকম মেসেজ থাকে৷ সমাজ পালটে দেয়ার মিশনে তারা তাদের মত করে সফলও। তবু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এসব করতে গিয়ে আনন্দ, বিনোদনের জায়গাগুলোও কখনো ফিকে হয় না তাদের। ইত্যাদির  শক্তির দিক এই ব্যালেন্সটা৷ কখনোই মনে হবে না, এটা শুধুমাত্র ভারী ভারী বিষয়বস্তুর এক শো৷ আবার কখনোই মনে হবে না, এটা সস্তাদরের কোনো শো। দর্শকের পালস বুঝে এত বড় একটা সময় ধরে দর্শকচাহিদার শীর্ষে থাকা, সে সাথে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংকটগুলো নিয়ে নিয়মিত কাজ করা... এটা মোটেও সোজা কোনো বিষয় নয়।

এই ত্রিশ বছর ধরে চলা শো'তে 'নানা-নাতি' সেগমেন্ট ছিলো জনপ্রিয়। সেই সেগমেন্টের 'নানা' অর্থাৎ অমল বোস প্রয়াত হওয়ার পরে কনসেপ্টে চেঞ্জ এসে 'নানি-নাতি' হলো।  'মামা-ভাগ্নে' সেগমেন্টের 'মামা' অর্থাৎ আবদুল কাদের চলে গেলেন। এস এম মহসিন ছিলেন ইত্যাদির প্রত্যেক পর্বেরই নিয়মিত মুখ। চলে গিয়েছেন তিনিও৷ সময়ের ফেরে হারিয়ে যাওয়া মুখের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে ক্রমশই। তবুও আমরা প্রতি ঈদে হাপিত্যেশ করে বসে থাকি 'ইত্যাদি'র জন্যে। বহু বছরের ফেরে ইদের সমার্থক শব্দ বলতে যদি কিছু বুঝি, সেটিই হয়ে গিয়েছে 'ইত্যাদি।'

দেশের মুক্তিযুদ্ধ, শিল্প, সাহিত্য, প্রযুক্তি, সম্ভাবনা নিয়ে হালকা চালে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার যে ট্রাপিজের অভিনব খেলা 'ইত্যাদি' দেখিয়ে চলেছে এত লম্বা সময় ধরে, সে চলা আরো দীর্ঘায়িত হোক, এটাই প্রত্যাশা। বাঙ্গালীর হাসি, কান্নায়, চিন্তাচেতনায়, মননে, টক-ঝাল-মিষ্টিতে মিশে থাকুক সমাজের ছোট বড় অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলা এই শো; ইত্যাদি৷ 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা