সিনেমা যতই বড়সড় অডিয়েন্সকে প্রভাবিত করুক না কেন, এই প্রভাব বরাবরই সাময়িক। ভেতরে ধারণ করতে না পারলে সিনেমা কখনোই কারো মানসিকতাকে পাল্টাতে পারে না। সেটিরই যেন জ্বলজ্বলে নজির দেখছি এখন৷ সিনেমার মূলভাব কী, কেন এই সিনেমা নির্মিত হয়েছে, সিনেমার পুরোটাজুড়ে কোন বার্তার আধিপত্য- এসব কিছু না ভেবে একদল মানুষ আচমকাই হয়ে উঠেছেন আক্রমনাত্মক, প্রতিহিংসাপরায়ণ!

জাস্টিস চন্দ্রুর জীবনকাহিনীকে উপজীব্য করে নির্মিত 'জয় ভীম' নিয়ে আলোচনা মোটে যেন থামছেই না। আইএমডিবি'র টপার বয় 'শশাঙ্ক রিডেম্পশন'কে টপকে এ সিনেমা দখল করেছে শীর্ষস্থান, সারা ভারত জুড়েই গুণমুগ্ধ প্রশংসা হচ্ছে সিনেমাটির। নানা রাজ্যের বিচারবিভাগের কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে তৃণমূল মানুষ, এমন কেউ নেই যে এই সিনেমা নিয়ে প্রশংসাবাক্যে সামিল হননি। এখানেই শেষ না। এ সিনেমায় উঠে আসা নির্যাতিত ইরুল গোত্রের মানুষের জন্যে আবাসস্থল বানিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অভিনেতা-নির্মাতা রাঘব লরেন্স। মন ভালো করার মতন অজস্র সব ঘটনাই ঘটছে সিনেমাকে ঘিরে। কিন্তু ভালো ভালো এতসব কিছুর পাশাপাশি দুয়েকটি বিতর্কও সঙ্গী হয়েছে সিনেমাটির। সে বিতর্কও ছোটোখাটো নয়। 

'জয় ভীম' মুগ্ধ করেছিলো সবাইকে! 

ভান্নিয়ার সাঙ্গাম স্টেট প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি এক আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন অভিনেতা সুরিয়া এবং এই সিনেমার নির্মাতা টিজে নানাভেল বরাবর। যেখানে দাবী করা হচ্ছে- সিনেমাটিতে ভান্নিয়ার কমিউনিটির মানহানি করা হয়েছে। এবং ঠিক সে কারণেই সিনেমার কিছু দৃশ্য ছাঁটাই করার এবং সিনেমা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে মাফ চাওয়ারও দাবী করেছেন তিনি। এবং ৫ কোটির ক্ষতিপূরণ মামলাও করা হয়েছে সে সাথে৷ 

যারা সিনেমাটি দেখেছেন, তারা জানেন, পুলিশি নির্যাতনে কিছু নিরপরাধ নিম্নগোত্রের মানুষের যাপিত যন্ত্রনাকে কেন্দ্র করে এই সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে।  নির্যাতন, পাশবিকতার এক বীভৎস সমীকরণের মধ্য দিয়েই ক্রমশ সামনে এগিয়েছে 'জয় ভীম' এর গল্প৷ ভান্নিয়ার সাঙ্গামের দাবী, এ সিনেমায় নির্যাতনকারী যে পুলিশ অফিসারকে দেখানো হয়েছে সর্বাগ্রে, তাকে ইচ্ছে করেই ভান্নিয়ার গোত্রের দেখানো হয়েছে।

যে সত্যঘটনা অবলম্বনে এ সিনেমা নির্মিত হয়েছে, সে ঘটনায় যে প্রোটাগনিস্ট পুলিশ অফিসার সমুখে থেকে তৃণমূল মানুষদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিলো, তার নাম ছিলো অ্যান্থনিসামি। যিনি খ্রিস্টানধর্মের। সেই পুলিশের নামকে পরিবর্তন করে কেন ভান্নিয়ার গোত্রের একজনের নাম দেয়া হলো, 'অ্যান্থনিসামি' নাম পালটে 'গুরুমূর্তি' করা হলো, সেটিও প্রশ্ন ভান্নিয়ার সাঙ্গামের। মূলত এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই বিক্ষুব্ধ হয়েছে ভান্নিয়ার কমিউনিটির মানুষজন। এছাড়াও সিনেমার এক দৃশ্যে নির্যাতনকারী পুলিশ অফিসারের বাড়িতে ক্যালেন্ডারে অগ্নি কুণ্ডম (আগুনের পাত্র, যেটি ভান্নিয়ারদের প্রতীক) দেখানো হয়েছে। এ বিষয়টিতেও উষ্মা প্রকাশ করেছে ভান্নিয়ার সম্প্রদায়। যদিও তাদের অসন্তোষের বিপরীতে সিনেমা থেকে পরবর্তীতে এ দৃশ্যটি সরিয়ে নেয়াও হয়েছিলো। 

ভান্নিয়ারদের এই অভিযোগের সাপেক্ষে 'জয় ভীম' এর প্রোটাগনিস্ট সুরিয়া বেশ দারুণ জবাবই দিয়েছেন। 'জয় ভীম' এর একমাত্র আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু যে জাস্টিস চান্দ্রু, তৃণমূল মানুষদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে জাস্টিস চান্দ্রুর সারাজীবনের লড়াইয়ের কথাই যে বলতে চেয়েছে এ সিনেমা, সুরিয়া সেটিই বলেছেন সর্বাগ্রে। কোনো কমিউনিটিকে আঘাত করা নয়, বরং সবাই মিলে উদার এক মানসিকতায় সামনে এগোলেই যে সর্বাঙ্গসুন্দর, সে কথাও বলেছেন। পাশাপাশি, যদি অসাবধানতাবশত কোনো ভুল করে থাকে এ সিনেমা, তাহলে সে ভুল সংশোধন করতে যে মোটেও দ্বিধা করবেন না তারা, সুরিয়া জানিয়েছেন সেটিও। 

কিছু বিতর্কও সঙ্গী এ সিনেমার! 

তবে পরিস্থিতি যে ক্রমশই ঘোলাটে হচ্ছে, তা বোঝা যাচ্ছে। সম্প্রতি একজন দুষ্কৃতিকারীকে আটক করেছে পুলিশ। এই দুষ্কৃতিকারী সুরিয়াকে আক্রমণ করার জন্যে তক্কে তক্কে ছিলেন বহুদিন, পরিকল্পনা মাফিক ওঁত পেতে ছিলো বেশ কিছুদিন ধরে। এখানেই শেষ না। এই সিনেমার সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষজন নিয়মিতই পাচ্ছেন মৃত্যুর হুমকি। তবে একদিকে যেমন এরকম আক্রমনাত্মক মানুষও আছেন, অন্যদিকে অজস্র মানুষ আছেন যারা দ্ব্যর্থক কন্ঠেই বলেছেন, তারা এই সিনেমার সাথেই আছেন। এই দুর্দিনে এই সমর্থনই মূলত মনোবল যোগাচ্ছে 'জয় ভীম' এর সবাইকে।

এই সিনেমা নিয়ে যখন রিভিউ লিখেছিলাম, তখন বলেছিলাম, সিনেমা যতই বড়সড় অডিয়েন্সকে প্রভাবিত করুক না কেন, এই প্রভাব বরাবরই সাময়িক। ভেতরে ধারণ করতে না পারলে সিনেমা কখনোই কারো মানসিকতাকে পাল্টাতে পারে না। সেটিরই যেন জ্বলজ্বলে নজির দেখছি এখন৷ সিনেমার মূলভাব কী, কেন এই সিনেমা নির্মিত হয়েছে, সিনেমার পুরোটাজুড়ে কোন বার্তার আধিপত্য...এসব কিছু না ভেবে একদল মানুষ আচমকাই হয়ে উঠেছেন আক্রমনাত্মক, প্রতিহিংসাপরায়ণ। এই যদি হয় আশেপাশের সবার মানসিক অবস্থা, তাদের জন্যে সিনেমায় সমাজ পাল্টানোর বার্তা দেওয়া তাই অনেকটা উলুবনে মুক্তা কিংবা অন্ধের দেশে চশমা বিক্রি করারই সামিল কী না, সে প্রশ্নে ক্রমশই তাই বিভ্রান্ত হই। তবে এসব বিভ্রান্তিকে পাশে রেখে আবার হই আশাবাদীও। কারণ, আশাবাদী হতে হয়। নাহয় জীবন এগোয় না। সেজন্যেই তাই আশা রাখি, এই উন্মাদ মানুষদেরও বোধোদয় হবে। তাহলেই হয়তো সবার মঙ্গল। নিরন্তর কল্যান। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা