নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকায় জন কোলম্যান তো সত্যজিৎকে তুলনাই করেছিলেন জ্যঁ রনোয়ার সঙ্গে। আর মহৎ আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ের ব্রেসঁ চিরকাল আহ্লাদ প্রকাশ করে গেছেন ‘জলসাঘর’ নিয়ে। সত্যজিৎ রায়ের অন্যতম সফল বাণিজ্যিক এক্সপেরিমেন্ট বলা চলে এই সিনেমাকে, যেখানে তিনি সত্যিকার অর্থেই বক্স অফিস সফল সিনেমার সংজ্ঞা বদলে দিয়ে, কমার্শিয়াল ফিল্ম ও আর্ট ফিল্মে সমান্তরালভাবে চালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন...

সামন্তবাদ ও নব্য বুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যকার অহংকারের অন্তর্দ্বন্দ্ব বাংলা সিনেমায় ফুটিয়ে তোলার কাজটি হাতে নিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প দিয়ে একই নামে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন তাঁর চতুর্থ সিনেমা- জলসাঘর (The music room). বলাবাহুল্য যে, এই সিনেমার ক্যারেকটার অব ফোকাস হলেন, ‘বিশ্বম্ভর রায়’ নামে অভিনয় করা ছবি বিশ্বাস। সিনেমার প্রায় বারো আনা সময় জুড়েই ক্যামেরার দৃষ্টি ছবি বিশ্বাসের উপরেই নিক্ষিপ্ত ছিল।

অভিনেতাদের জীবনে এমন কিছু চরিত্রাভিনায় থাকে, যেটাকে লাইফটাইম রোল বলা চলে। জলসাঘর সিনেমায় ছবি বিশ্বাস ‘বিশ্বম্ভর রায়’ চরিত্রে যে অভিনয় করেছেন, এটাকে নির্দ্বিধায় তার লাইফটাইম রোল বলা যায়।

এবার আবার সত্যজিৎ বাবুর দিকে ফেরা যাক। ‘জলসাঘর’ এর আগের সিনেমা ‘অপরাজিত’ সমালোচকদের মহলে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেও বক্স-অফিসে মুষড়ে পড়েছিল। সত্যিকার অর্থে, বক্স অফিসের সাফল্য আর শিল্পের সাফল্যের ফারাক তো থাকেই। ‘অপরাজিত’ সিনেমায় অপুর বাবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সাথে সাথে চালের উপর থেকে তাড়া খাওয়ার মতো ব্যস্ততায় ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি গঙ্গার দিকে উড়ে যাওয়ায় যে কী নিগূঢ় অর্থ বহন করে; এটা উপলব্ধি করার মতো ধী সকলের মধ্যে জন্মায় না বলেই সত্যিকারের চলচ্চিত্রগুলো প্রায়শই বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারে না।

সিনেমা বানাতে হলো আর্ট ও বক্স-অফিস দুটোর দিকেই সমানতালে খেয়াল রাখতে হয়। তবে, সত্যজিৎ রায়ের চোখে বক্স অফিসের ধারনা প্রচলিত ধারনার চেয়ে আলাদা ছিল। এই কথা তিনি ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমা সম্পর্কিত এক আলোচনা সভাতেই বলেছিলেন। পরবর্তীতে যেটা আমরা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মানিকদার সঙ্গে’ বই থেকে জানতে পেরেছি।

জলসাঘর সিনেমার একটি দৃশ্য

সত্যজিৎ বক্স অফিস ধারনা সম্পর্কে তার বিশ্বাসের প্রতিফল দেখিয়েছেন, জলসাঘর সিনেমায়। তারাশঙ্করের ছোটগল্পটিকে তিনি নিজের মতো করে সাজিয়ে-গুছিয়ে, যুক্ত করে দিয়েছেন ইতিহাসের দর্পণ, রাগসঙ্গীত, ধ্রুপদী বাইজী নৃত্য ও আবহমান বাংলার জমিদারি মেজাজ। সিনেমায় কখনো দর্শকদের উৎফুল্ল করেছেন। কখনো কুয়াশা নিমজ্জিত শেষরাতে আবছা আলোয় বেদনা চিত্রের মুখোমুখি দাড় করিয়েছেন। জমিদারের বোকামীপূর্ন ভালো মানুষী অহংকার, চাকরদের বিনয় ও প্রভুভক্তি, নব্য-ধনীর হীনমন্যতা সবকিছুর যেন পর্দা মধ্য থেকে দর্শককে ভিতরে টেনে নিয়ে গিয়েছে। সিনেমার সাথে সাথে দর্শক নিজেই বারবার রায়বাড়ির জলসাঘর থেকে ঘুরে এসেছে।

ডেরেক ম্যালকম জলসাঘর সিনেমাটিকে সত্যজিৎ রায়ের নিখুঁততম চলচ্চিত্র বলে আখ্যা দিয়েছেন। অবশ্য এই মন্তব্য নিয়ে আমার কিছু দ্বিমত আছে। জলসাঘর নির্মাণের পরেও সত্যজিৎ আরো কিছু নিখুঁত সিনেমা তৈরি করেছেন, সেগুলো নির্মাণের বিচারে জলসাঘরকেও ছাপিয়ে গিয়েছে।

সত্যজিৎ বক্স অফিসকে খেয়াল করেই এই সিনেমার কাজ হাতে নিয়েছিলেন আর বক্স অফিসে এই সিনেমার সফলও হয়েছিল। শুধু বাংলায় নয়, ১৯৮১ সালে প্যারিসে এই সিনেমা মুক্তির পর প্যারিসের বক্স-অফিসও দখল করে নিয়েছিল। বাণিজ্যিক বা আর্ট দুই দিক থেকেই এই সিনেমা সমানতালে সফলতার মুখ দেখেছে।

এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায় জলসাঘর প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “Zamindar is an arrogant man and yet he is sensitive; he is a fool but a generous one; above all there is something magnificent about his folly and even his final disaster is dignified.”

সত্যজিতের এই কথার প্রতিফলন, তার চিত্রনাট্যেও দেখা মিলেছে। ‘জলসাঘর গল্প থেকেই এই সিনেমার এডাপশন’- প্রায় সব জায়গায় এরকমটা বলা হলেও, জলসাঘর সিনেমাটি মূলত ‘রায়বাড়ি’ ও ‘জলসাঘর’ এই দুটো গল্পের সম্বলিত এডাপশন। সত্যজিৎ চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে এই দুটো গল্পের খোলনলচে প্রায় পাল্টে ফেলেছেন; তাতে যে মন্দ কোনো ফল বেরিয়েছে এমন নয়। তবে দুটো গল্পের সম্মলিত এডাপশন মূল ছোটগল্পের প্রধান ভাব-বক্তব্য পাল্টে দিয়েছে।

যদি গল্প এবং চিত্রনাট্যের দিকে একই সাথে তুলনামূলক নজর দেওয়া যায়, কয়েকটা বিষয় লক্ষণীয়— গল্পে জমিদারদের অহংকার, অপরিমিত খরচ এবং নিষ্ঠুর মনোভাব তুলে ধরা হলেও, চিত্রনাট্যে জমিদারকে অহংকারী শিল্প-চিন্তক প্রজাদরদী বৈষয়িক বোকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, সত্যজিৎ চিন্তার দিক থেকে সামন্তবাদের দিকে ঝুঁকে ছিলেন।

সামন্তবাদ এবং বুর্জোয়াদের এই দ্বন্দ্বে সত্যজিৎ যে, সামন্তবাদের দিকেই ঝুঁকে ছিলেন তার বারবার প্রকাশ করেছেন, নব্য ধনী মহীমকে সর্বদাই হীনমন্য হিসেবে উপস্থান করে। মূল গল্পে মহীমকে বেশ শক্তিশালী ও প্রতিযোগী চরিত্রে দেখা গেলেও চিত্রনাট্যে তার বিপরীত প্রকাশটাই ঘটেছে। তবে এরপরেও সত্যজিৎ একেবারে একপাক্ষিক আয়োজন করে যাননি, মহীমের বিনয়ের মধ্যে যে তাচ্ছিল্যের সূক্ষ্ম সুর ছিল সেটাকে বারবার তুলে ধরতে মোটেও ভুল করেননি।

জলসাঘর সিনেমায় অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন ছবি বিশ্বাস

গল্প ও চিত্রনাট্যের তুলনায় স্বার্থে আরো দুয়েকটি পার্থক্য বলা প্রয়োজনবোধ করছি, জলসাঘর মূল গল্পে বিশ্বম্ভরের স্ত্রী ও পুত্র কলেরা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেও; চিত্রনাট্যে নৌকডুবিতে মারা যায়। নৌকডুবিতে স্ত্রী পুত্র মৃত্যুর বর্ণনা জলসাঘর গল্পের প্রেক্ষাপটে না হলেও এটা ছিল ‘রায় বাড়ি’ গল্পের প্রেক্ষাপট। এখানেও স্পষ্ট হয় যা, সত্যজিৎ মূলত দুটো গল্পেরই সম্মেলন ঘটিয়েছেন।

আবার যদি সিনেমার শেষ দৃশ্যের কথা ধরি, সেখানেও মূল গল্পের সাথে চিত্রনাট্যের বেশ পার্থক্য বিদ্যমান। কিংবা কৃষ্ণ বাইজীর নাচের প্রথম নজরী দেওয়ার অংশেই গল্প ও চিত্রনাট্য আলাদা হয়ে গিয়েছে। মূল গল্পে বিশ্বম্ভর রায়ের সম্মানহানী ঘটলেও, চিত্রনাট্যে বেশ নাটকীয়ভাবেই বিশ্বম্ভর রায়ের অহংকারকে সমুচ্চিত করা হয়েছে। আবার, দুর্যোগে রায়বাড়ির সদর দরজা খুলে দেওয়ার গল্প ‘রায়বাড়ি’ গল্পের প্রেক্ষাপটে থাকলেও সেটাকে সত্যজিৎ রায় বিশ্বম্ভর রায়ের মুখে ‘জলসাঘর’ গল্পের প্রেক্ষাপটে প্রবেশ করিয়েছেন।

এছাড়াও মূল গল্পের সাথে অনেক স্থানে, সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম পার্থক্য উঠে এসেছে। এতে কিন্তু মোটেও মানের দুর্বলতা তৈরি হয়নি। বরং সত্যজিৎ রায়ের এডাপশন করার শক্তিশালী চিত্রটাই ফুটে উঠেছে। মূল গল্পের কঠোরতা থেকে সরে গিয়ে, এই করুন সুর যদি তিনি তৈরি না করতেন, তাহলে সিনেমাটি এখন যতটা আবেদন রক্ষা করতে পেরেছে; মূল গল্পের নিরিখে ততটা পারতো না।

চিত্রনাট্য, সেট পরিকল্পনায় সত্যজিৎ বরাবরে মতোই দক্ষতা দেখিয়েছেন, সেগুলো হয়ে উঠেছে বিশ্বমানের। তাই তো, নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকায় জন কোলম্যান তো সত্যজিৎকে তুলনাই করলেন জ্যঁ রনোয়ার সঙ্গে। আর মহৎ আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ের ব্রেসঁ চিরকাল আহ্লাদ প্রকাশ করে গেলেন ‘জলসাঘর’ নিয়ে। সঙ্গীতে ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ অসামান্য সংযোজন করছেন। সঙ্গীতের ভাষা এতটাই তীব্র যে, সংলাপ ছাড়াও এই সিনেমার আবেদন খুব বেশি একটা ক্ষুণ্ণ হবে না।

টেকনিক্যাল ফ্রেম সমালোচনা যদি বাদ দিই, তাহলে জলসাঘরকে আমি বলবো, সত্যজিৎ রায়ের অন্যতম সফল বাণিজ্যিক এক্সপেরিমেন্ট। যেখানে তিনি সত্যিকার অর্থেই বক্স অফিস সফল সিনেমার সংজ্ঞা বদলে দিয়ে, কমার্শিয়াল ফিল্ম ও আর্ট ফিল্মে সমান্তরালভাবে চালনা করতে সক্ষম হয়েছেন।

**এই লেখাটি লিখেছেন তাসফিন আহমেদ, তিনি সিনেগল্পের একজন কন্ট্রিবিউটর। চাইলে সিনেগল্পে কন্ট্রিবিউটর হিসেবে লেখা পাঠাতে পারেন আপনিও। লেখা পাঠানোর জন্য ক্লিক করুন এই লিংকে।**


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা