সরাসরি ধর্ষণের কোন দৃশ্য না দেখিয়েও পরিচালক বুঝিয়ে দিয়েছেন, ঘাতকেরা কতটা নির্মম হয়েছিল সেই রাতে, মা ও তার তিন সন্তানের ওপর দিয়ে কি ঝড়টা বয়ে গিয়েছিল কয়েকটা ঘন্টায়...

২০২০ সালের তেইশে এপ্রিলের বিকেলটা অন্যরকম ছিল গাজীপুরের শ্রীপুরের মানুষের জন্য। গোটা এলাকাজুড়ে অন্যরকম একটা চাঞ্চল্য, পুলিশ ভ্যানের আনাগোনা, চারপাশে ফিসফাস, চাপা আতঙ্ক বাসা বেঁধেছিল সবার মনে। করোনাভাইরাসের কারণে তখন এমনিতেই গোটা দেশ লকডাউনে, প্রতিদিন আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। সেই ভয়াবহ সময়েই শ্রীপুরে ঘটেছিল রোমহর্ষক এক ঘটনা। রাতের অন্ধকারে দুর্বৃত্তরা ডাকাতির উদ্দেশ্যে ঘরে ঢুকে গলা কেটে খুন করেছিল একই পরিবারের চারজনকে। সেই হত্যাকান্ডের ঘটনা সাড়া ফেলেছিল গোটা দেশেই, পত্র-পত্রিকায় হয়েছিল বিস্তর লেখালেখি। র‍্যাব এবং পুলিশের তড়িৎ অ্যাকশনে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছিল ঘাতকেরা, আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও দিয়েছে তারা। 

পরিচালক রায়হান রাফি তার নতুন সিনেমা নিয়ে এসেছেন, নাম 'জানোয়ার'। ব্রুটাল ভায়োলেন্সের নজিরবিহীন এক প্রদর্শনী দেখা গেল সোয়া এক ঘন্টা দৈর্ঘ্যের জানোয়ার- এ। এই সিনেমাটা দর্শককে আনন্দ দেবে না, বরং ধাক্কা দেবে প্রতি সেকেন্ডে, প্রতিটা সিকোয়েন্সে, প্রতি সংলাপে। মানুষের ভেতর যে পশুর বসবাস, সেই পশুটাকেই জানোয়ার হিসেবে বের করে এনেছেন রায়হান রাফি। নিজেদের সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে দাবী করা মানুষ যে কতটা নির্মম আর নৃশংস হতে পারে, তারই অকল্পনীয় এক চিত্র এঁকেছেন পরিচালক। জানোয়ার আসলে অসুস্থ এক সমাজের গল্প, জানোয়ার একদল অমানুষের গল্প, কয়েকটা পিশাচের গল্প, যারা মানুষের মুখোশ পরে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। 

জানোয়ারের গল্পের ডেডলাইন ২০২০ সালের বাইশ ও তেইশে এপ্রিল। রাত বারোটায় পরিবারের ছোট আদুরে মেয়েটার জন্মদিন, তাতেই উচ্ছ্বসিত রাজকণ্যা সবাইকে জ্বালিয়ে মারছে। আনন্দ আর উৎসবের একটা আবরণ ঘরজুড়ে, সেই উৎসব যে রাত পোহানোর আগেই বিভীষিকায় রূপ নেবে, সেটা কে ভেবেছিল? বাড়িতে বিশ লাখ টাকা রাখা আছে, এমন খবর পেয়ে রাত দুপুরে হানা দেয় হায়েনার দল। কিন্ত ডাকাতিতেই থেমে থাকে না তাদের পরিকল্পনা, রাত বাড়ে, সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে তাদের নৃশংসতার মাত্রা। 

জানোয়ার সিনেমার একটি দৃশ্য

রাফির প্রথম দুটো সিনেমায় মূল চরিত্রে ছিলেন সিয়াম এবং পূজা চেরি, অন্যান্য চরিত্রেও প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের ব্যবহার করেছিলেন তিনি। কিন্ত জানোয়ার- এর অভিনেতাদের মধ্যে তাসকিন রহমান এবং রাশেদ মামুন অপু ছাড়া কাউকেই তেমন পরিচিত বলা যাবে না। তাতে কী, প্রত্যেকেই যেন নিজেদের সেরা অভিনয়টা ঢেলে দিয়েছেন সিনেমায়, যার যার চরিত্রে করেছেন দুর্দান্ত অভিনয়। এমনকি শিশু শিল্পী তিনজনও খুঁত ধরার অবকাশ রাখেননি কোথাও। পুলিশ অফিসারের চরিত্রে তাসকিন চমৎকার। ফরহাদ লিমন, মুনমুন আহমেদরাও করেছেন সাবলীল অভিনয়। 

রাশেদ মামুন অপুর কথা আলাদাভাবে বলা দরকার। বাংলা নাটকে কমিক রোলে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি, একটা সময় পাদপ্রদীপের আলো থেকে দূরেও সরে গিয়েছিলেন। রায়হান রাফীর দহন সিনেমায় মর্গের ডোম চরিত্রে অল্প সময়ের জন্য হাজির হয়ে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছিলেন। সেই রাফিই তাকে আরেকটা ব্রেক দিলেন জানোয়ার- এ। এই সিনেমায় অপুর অভিনয় দেখে তার প্রতি অদ্ভুত একটা ঘৃণা জন্ম নেবে, মানুষ কেন এত জঘন্য, এত হিংস্র হয়- সেই প্রশ্ন উঠবে মনের ভেতর। এটাই একজন অভিনেতার স্বার্থকতা, চরিত্রেত ভেতর ঢুকে যাওয়ার সাফল্য। অপু সেটা করতে পেরেছেন। 

সরাসরি ধর্ষণের কোন দৃশ্য না দেখিয়েও পরিচালক বুঝিয়ে দিয়েছেন, ঘাতকেরা কতটা নির্মম হয়েছিল সেই রাতে, মা ও তার তিন সন্তানের ওপর দিয়ে কি ঝড়টা বয়ে গিয়েছিল সেদিন। রায়হান রাফী কোন মাস্টারপিস বানাননি, তিনি বানিয়েছেন মানুষের অমানবিক আচরণের এক প্রামাণ্য দলিল। মানুষ কতটা বিকৃত মানসিকতার হলে এগারো এবং চৌদ্দ বছরের দুটো বাচ্চা মেয়ের ওপর এমন বর্বরতা চালাতে পারে, একটা অটিস্টিক শিশু যে কীনা কিছু বলতে পারে না, কানে শোনে না, কিছু বোঝে না- তাকেও গলা কেটে হত্যা করতে পারে, সেটা জানোয়ার না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। এই সিনেমাটা যেন মানুষের ভেতর বাস করা জানোয়ার প্রবৃত্তির স্বরূপটাকেই বের করে এনেছে।

জানোয়ার সিনেমার একটি দৃশ্য

বাংলা সিনেমা এমন বীভৎস নৃশংসতা এর আগে কখনও দেখেনি। ওই যে বললাম, জানোয়ারের মাধ্যমে রাফি দর্শককে ধাক্কা দিতে চেয়েছেন, তাই ভায়োলেন্স দেখানোর বেলায় কমতি রাখেননি কোথাও। আলো-আঁধারির পরিবেশটা তাতে বাড়তি প্রলেপ দিয়েছে, সেইসঙ্গে ছিল দুর্দান্ত সিনেম্যাটোগ্রাফি। ক্যামেরার কাজের প্রশংসা না করলে বিষয়টা আনফেয়ার হয়ে যাবে। রিপন নাথের সাউন্ডের কাজ এবং সন্ধির মিউজিক- দুটোই মনোমুগ্ধকর। দুর্বল হৃদয়ের মানুষদের জন্য তাই জানোয়ার পুরোটা এক বসায় দেখাটা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিংই হবার কথা। 

রায়হান রাফির গল্প বলার স্টাইলটা বরাবরই বেশ ইউনিক। জানোয়ারেও সেটা বজায় ছিল মনে হবে, ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে গোটা দৃশ্যটা দেখছেন আপনি, আপনার চোখের সামনেই ঘটে চলেছে সবকিছু, শুধু বাধা দেয়ার কোন ক্ষমতা আপনার নেই। হতভাগ্য পরিবারটি আর চারজন মানুষের কথা ভেবে মন খারাপ হবে যে কারো, নিহতদের প্রতি একদিকে যেমন মায়ার জন্ম নেবে তেমনই ঘাতক অমানুষগুলোর প্রতি জন্ম নেবে তীব্র বিতৃষ্ণা। জানোয়ার আপনাকে এই বিপরীতধর্মী দুটো অনুভূতিতে আচ্ছন্ন করবে একই সময়ে, রায়হান রাফি এবং তার টিম এজন্যেই একটা বড়সড় ধন্যবাদ পেতে পারেন দর্শকদের তরফ থেকে।

বিঃ দ্রঃ- সিনেম্যাটিক (Cinematic) অ্যাপে মাত্র আড়াই টাকা খরচ করলেই দেখতে পাবেন জানোয়ার সিনেমাটি। প্লেস্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করুন, মোবাইল নম্বর দিয়ে সাইন-ইন করে দেখে ফেলুন জানোয়ার। ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং, এমনকি আপনার মোবাইলের ব্যালেন্স থেকেও টাকা পরিশোধ করতে পারেন চাইলে। কেন তাহলে কষ্ট করে ডাউনলোড লিংক খুঁজে বেড়াবেন? পাইরেসিকে না বলুন, দেশীয় কন্টেন্টের পাশে থাকুন।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা