অর্থের অনটনে কলম বিক্রি করতেন মুম্বাই এর রাস্তায়৷ বলিউডের অভিনেতাদের মিমিক্রি করেও জীবনপাত করতে হয়েছে বহুদিন। এরপর বলিউডে আসা। এখানে জনপ্রিয়তা, খ্যাতি, সম্মান পেয়েছেন ঢের। তবু মানুষটি রয়ে গেছেন আগের মতনই। পা বরাবরই মাটিতে!

মানুষটিকে আমরা পর্দায় বরাবরই দেখেছি কমেডিয়ানের চরিত্রে। হয়তো সিরিয়াস সিনেমা, হয়তো কষ্টের সিনেমা... কিন্তু যখনই তাঁর উদয়, পর্দার সব আলো একাই টেনে নিয়েছেন তিনি। ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত যিনি অভিনয় করেছেন সাড়ে তিনশোরও বেশি সিনেমায়। এত এত খ্যাতি, অর্থের প্রাচুর্য যার, তিনিই জীবনের শুরুতে খেয়েছেন বড়সড় ধাক্কা। জীবনের প্রখর রোদে হাঁটতে হাঁটতে যিনি আস্তে আস্তে হয়েছেন পরিণত। এত বছরের ক্যারিয়ারে অগুণতি ফ্যান-ফলোয়াররা যাকে চেনে জনি লিভার নামে। কিন্তু যার আসল নাম মোটেও জনি লিভার না। তাঁর আসল নাম- জন প্রকাশ রাও জানুমালা।

অন্ধ্রপ্রদেশের এক খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম জনি লিভারের। বেড়ে ওঠা মুম্বাই এর ঘিঞ্জি বস্তিতে৷ বাবা কাজ করতেন হিন্দুস্থান লিভার লিমিটেডের এক ছোটখাটো পোস্টে। তিন ভাই, দুই বোন, বাবা, মা এদের নিয়েই কায়ক্লেশে চলতো সংসার। জনি ছিলো পরিবারের সবচেয়ে বড় সন্তান। লেখাপড়াও শুরু করেছিলো। কিন্তু ক্লাস সেভেনে থাকতেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয় তাকে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই নেমে যায় যে, জনিকে পড়াশোনা করানোই আর সম্ভব হয় না।

জনির তখন করার কিছুই নেই। ঘরে টাকাপয়সার টানাটানি। পরিবারের বড়ছেলে হিসেবেও কিছু করতে পারছেন না। দগ্ধে দগ্ধে মরে যাচ্ছিলেন। বাধ্য হয়েই মুম্বাইয়ের ব্যস্ত রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কলম বিক্রি করা শুরু করেন তিনি৷ বলিউডের স্টারদের গলা আর নাচের স্টাইল নকল করে খদ্দেরদের আকৃষ্ট করে কলম বিক্রি করতো সে।

কিন্তু এভাবে চলছিলো না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কলম বিক্রি করে কতটুকুই বা লাভ হয়? জনি তাও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো পুরোদমে। পরিবারে কিছু দিতে হবে তো। নিষ্কর্মা হয়ে বসে থেকেও তো লাভ নেই।

জনি লিভার

এভাবেই কাটে বেশ কিছুদিন। এরপর বাবার সাথে 'হিন্দুস্থান ইউনিলিভার লিমিটেড' এ কাজে যোগ দেয় সে। নিয়মিত অর্থের মোটামুটি এক সংস্থান হয়। পায়ের নীচে মাটি পায় পুরো পরিবার। তবে কলম বিক্রির সময়ে বলিউড স্টারদের মিমিক্রি করার যে গুণ রপ্ত করেছিলো জনি লিভার, সেটিকে সে ত্যাগ করেনি। মাঝেমধ্যেই ঝালিয়ে নিতো এই অভ্যাস। অফিসের প্রোগ্রামে জনি মাঝেমধ্যেই বলিউড সেলিব্রেটিদের গলা ও নাচ নকল করে দেখাতো। এরকমই এক অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার সময়ে সে বলিউড স্টারদের নকল না করে বরং ইউনিলিভার এর কিছু অফিসারের গলা ও নাচ নকল করে। সেই নকল এতটাই অবিকল ও অসাধারণ হয় যে, সকলে মিলে তার নাম দেয়- জনি লিভার। তখন থেকেই তাঁর নাম- জনি লিভার।

অফিসে কাজের পাশাপাশি স্ট্যান্ড আপ কমেডিও করতো সে । বলা হয়ে থাকে, ভারতবর্ষের প্রথম স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ানও সে৷ একটা সময়ে স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান হিসেবে বেশ খ্যাতি অর্জন করে সে। শো বাড়ছিলো, টাকাপয়সাও। একপর্যায়ে এসে অফিস ছেড়ে দিতে হয় তাকে। ব্যালেন্স করা যাচ্ছিলো না। ছয় বছর চাকরী করে আর 'জনি লিভার' টাইটেল নিয়ে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার লিমিটেড ছাড়েন তিনি।

এরপর পুরো মনোযোগ তিনি স্ট্যান্ডআপ কমেডিতেই দেন। ঘরের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হচ্ছিলো। জনি লিভারও জনপ্রিয়তা পাচ্ছিলেন। দেশে বিদেশে ঘুরছিলেন স্ট্যান্ড আপ কমেডির সুবাদে৷ টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনেও নিয়মিত মুখ ছিলেন তিনি। বলিউডের 'বিগ বি' অমিতাভ বচ্চনের সাথেও একটি অনুষ্ঠান করেন জনি। এই অনুষ্ঠানের পরপরেই বলিউডের চোখে পড়েন তিনি। বলিউডের অভিনেতা সুনীল দত্ত তাকে 'দর্দ কা রিশতা' সিনেমায় অভিনয়ের জন্যে অফার করেন।

জনি লিভার সিনেমায় প্রথম আসেন 'ইয়ে রিস্তে না টুটে' সিনেমা দিয়ে। তবে অভিনেতা হিসেবে প্রথম সাড়া ফেলেন 'তুম পার হাম কুরবান' সিনেমার মাধ্যমে। এরপরে সুনীল দত্তের অফারে সাড়া দিয়ে 'দর্দ কা রিশতা' সিনেমাতেও দেখা যায় তাকে। 'হত্যা', 'তেজাব', 'চালবাজ', 'রূপ কি রানি চোরো কি রাজা', 'আনাড়ি', 'জাদুকর', 'খিলাড়ি', 'চমৎকার'সহ অজস্র সিনেমাতে ছিলেন। টিভি সিরিয়ালে অভিনয় করেছেন। কমেডি শো' এর জাজও হয়েছেন। বিজ্ঞাপনে অভিনয় তো আছেই।

ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীর সঙ্গে জনি লিভার

জনি লিভারকে নিয়ে নানারকম অদ্ভুত কথাবার্তাও ছড়িয়েছে মাঝেসাঝে। যেমন একবার খবর রটলো, জনি লিভার মারা গিয়েছেন। সে নিয়ে তো তুলকালাম অবস্থা। পরে জানা গেলো, বহাল তবিয়তেই আছেন তিনি। তবে মৃত্যুর গুজব যতই ছড়াক, মৃত্যু নিয়ে তাঁর আছে এক অদ্ভুত সুন্দর গল্প। হুট করে তাঁর ছেলের ক্যান্সার ধরা পড়ে একবার। ছেলের ক্যান্সারের ঘটনায় রীতিমতো ভেঙ্গে পড়েন তিনি। সিনেমার শ্যুটিং, বাকিসব ব্যস্ততা, সবকিছু থেকে ইস্তফা নিয়ে নেন। সারাক্ষণ ছেলের পাশেই পড়ে থাকতেন। একমনে ঈশ্বরকে ডাকতেন। এভাবে কেটে যায় দশদিন। দশদিন পরে ছেলেকে একটা টেস্টের জন্যে নিয়ে যান ডাক্তারেরা। এবং আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেন, শরীরে ক্যান্সার নেই একবিন্দু!

এই ঘটনাটি জনি লিভারের জীবনদর্শন পাল্টে দেয় পুরোপুরি। ইশ্বরের প্রতি ভক্তি শতগুণ বেড়ে যায় এবং মানুষের মাঝেও এই স্পিরিচুয়াল বিষয়গুলো ছড়িয়ে দেয়া শুরু করেন তিনি৷

জনি লিভারের সবচেয়ে গুনমুগ্ধ ভক্ত বোধহয় বলিউদ বাদশা শাহরুখ খান। যিনি বলেন- 'জনি ভাই যেরকম ডেডিকেশন দিয়ে এ্যাক্টিং করেন, ভাবলেও অবাক হয়ে যেতে হয়। ক্যামেরার সামনে মানুষকে হাসাচ্ছেন। অথচ পেছনের মানুষটা কিন্তু খুবই সিরিয়াস।' জনি লিভারের জীবনের দিকে তাকালেও এই তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়। ক্যামেরার সামনে শুধু তিনি অভিনয় করেন না। তাঁর চোখ, মুখ, প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অভিনয় করে। কিন্তু ক্যামেরার পেছনেই তিনি পরিবারকে আগলে রাখা সিরিয়াস এক মানুষ। এ্যাওয়ার্ড, পুরস্কার, অর্জন, খ্যাতি এতকিছু থাকার পরেও তিনি বরাবরই আপাদমস্তক বিনয়ী। পরিচিত কারো কোনো সমস্যা হলে সবার আগেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন যিনি। নিজের ইমেজ, স্টার তকমা, সেলিব্রেটি স্ট্যাটাস সবকিছুকে ছাপিয়ে যিনি সবসময়েই চলেছেন পা মাটিতে রেখেই। এভাবেই সহমর্মী, উদার ও পরোপকারী হয়ে ক্যামেরার সামনে, ক্যামেরার পেছনে বহুকাল ধরে সবার প্রিয় হয়ে আছেন মানুষটি...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা