এই প্রোলোগের প্রথমেই যা ভালো লেগেছে, ট্রিটমেন্ট। একেবারে শুরু থেকে যে ডিটেইলিং এবং প্রোপার প্রেজেন্টেশনে গল্প এগিয়েছে, তা প্রশংসা করার মতনই। পাশাপাশি অ্যাকশন, সাসপেন্স, ভয়ালদর্শন ডাইনোসরের ভীতিকর উপস্থিতি- সব মিলিয়ে 'জুরাসিক ওয়ার্ল্ড: ডমিয়ন' বেশ আশারই সঞ্চার করেছে...

মাইকেল ক্রাইটন এর বিখ্যাত উপন্যাস 'জুরাসিক পার্ক' অবলম্বনে যখন স্টিভেন স্পিলবার্গ এই ফ্রাঞ্চাইজির প্রথম সিনেমা বানালেন, সে সময়টা বড্ড অদ্ভুত। নাইন্টিজের কিডরা তখন আবছা আবছা সিনেমা বুঝতে শুরু করেছে। 'জুরাসিক পার্ক' এর গল্প যাই হোক, একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী ডাইনোসরদের চোখের সামনে ক্রমশ নরক গুলজার করতে দেখে সেই শতকের সব শিশু-কিশোরই কমবেশি শিউরে উঠছে, সবারই গায়ে অল্পবিস্তর কাঁটা দিচ্ছে। ভয়ে চোখ বুজে আসছে অনেকেরই। আশেপাশে ভয়াল ডাইনোসরের ভীতিকর উপস্থিতি কল্পনা করে কারো কারো শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল ঘামও বয়ে যাচ্ছে। তবুও এতকিছু সত্বেও কোনো এক অমোঘ আকর্ষণে 'জুরাসিক পার্ক' কে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। আর ঠিক এভাবেই, সময়ের সাথে এগোতে এগোতে 'জুরাসিক পার্ক' ক্রমশ ঢুকে পড়েছে প্রিয় সিনেমার মখমলের বাক্সে। 

নাইন্টিজের কিডেরা যদিও এখন বড়, চোখের সামনের সেই ঝলমলে কোমল পর্দা উবে গিয়েছে তাও আজ বহুদিন, তবুও কখনো কোনো আড্ডায় 'জুরাসিক পার্ক' এর নাম উঠলে খানিকটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে সবাই-ই। ছলকে ওঠা চায়ের কাপের টেবিল থেকে চোখ চলে যায় সেই অতীতে, যে অতীতে নতুন বইয়ের মলাটে কোন ক্যালেন্ডারের কাপড় বসবে, সে চিন্তায় ভ্রুকুটি হতো বারংবার। যে শৈশবে 'জুরাসিক পার্ক' ছিলো রোমাঞ্চকর এক অ্যাডভেঞ্চারের হাতিয়ার। 

জুরাসিক পার্কঃ শৈশবের রোমাঞ্চের হাতিয়ার! 

যদিও 'জুরাসিক পার্ক' ফ্রাঞ্চাইজির কিছু সিনেমা অতীতের প্রতি ঠিক সুবিচার করতে পারেনি, কিছু সিনেমার তথৈবচ গল্প-বিন্যাস দেখে নিরন্তর আক্ষেপে তড়পাতে হয়েছে, তবুও যখনই এই ফ্রাঞ্চাইজির নতুন কোনো সিনেমা আসে, খানিকটা পক্ষপাতদুষ্ট হই। শৈশবের মেমোরি-লেনে ঘোরার জন্যে মেনে নেই গল্পের যাবতীয় ত্রুটি। সে কারণেই তাই এই ফ্রাঞ্চাইজির নবতম নির্মাণ 'জুরাসিক ওয়ার্ল্ডঃ ডমিয়ন' এর প্রোলোগ দেখতে বসা। এবং সত্যি বলতে অনেকদিন পরে 'জুরাসিক পার্ক' এর বিস্মৃতপ্রায় সেই অনুভূতিটুকুই যেন পেলাম পাঁচ মিনিটের এই প্রোলোগ দেখে। যে প্রোলোগ কোনো কাটছাঁট ছাড়া সিনেমার শুরুতেও থাকবে। 

প্রোলোগ শুরু হয় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে, পাহাড়-সমুদ্র-নরম কাদার এক পৃথিবীতে। যে পৃথিবীতে নানা রঙের, নানা আকারের ডাইনোসরের আধিপত্য। যে ডাইনোসরদের মধ্যে কেউ জলকেলি করছে। কেউ জল পান করছে। কারো দেহে বসছে তেলাপোকা, মশা। এরইমধ্যে একঝাঁক ডাইনোসর উড়ে বেড়াচ্ছে দিকচক্রবালকে লক্ষ্য করে। পারস্পরিক সহাবস্থানের নিয়ম মেনে সবার আচরণ শান্ত, কারো মধ্যেই হিংস্রতা, জটিলতা নেই। সবাই যার যার আয়োজনে ব্যস্ত। যদিও নিস্তরঙ্গ এই সময় বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। হুট করেই এক বিশালাকার টি-রেক্স এবং এক দৈত্যাকৃতির  জাইগান্টোসেরাস সম্মুখসমরে সামিল হয়। কিছুক্ষণ পরেই মৃত্যু হয় তাদের মধ্যে একজনের। এই মহাপতনের সাথে সাথে যেন প্রমাণিত হয় সেই আদিম বাক্য- সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট। 

'জুরাসিক ওয়ার্ল্ডঃ ডমিয়ন' এর প্রোলোগ বিস্তর মুগ্ধ করেছে! 

প্রোলোগের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় বর্তমান সময়ে। যেখানে এক টি-রেক্স ঢুকে পড়ে এমন এক উন্মুক্ত জায়গায়, যেখানে কিছু মানুষ একত্রিত হয়ে সিনেমা দেখছিলো। টি-রেক্সের আগমনে মুহুর্তেই জায়গাটি রূপান্তরিত হয় ধ্বংসযজ্ঞের চারণভূমিতে। এরইমধ্যে পর্দায় আসে এক হেলিকপ্টার, আকাশপথে উড়ে যে চোখ রাখছিলো টি-রেক্সটির দিকে। উদ্দেশ্যঃ টি-রেক্সকে আটকানো। কিন্তু এরইমধ্যে হয় ছন্দপতন। হুট করেই অদৃশ্য হয়ে যায় জন্তুটি।

এই প্রোলোগের প্রথমেই যা ভালো লেগেছে, ট্রিটমেন্ট। একেবারে শুরু থেকে যে ডিটেইলিং এবং প্রোপার প্রেজেন্টেশনে গল্প এগিয়েছে, তা প্রশংসা করার মতনই। ডিটেইলিং এর একটি উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারা যাবে বিষয়টি। এই প্রোলোগের ৬৫ মিলিয়ন বছর আগের টি-রেক্স এবং বর্তমানের টি-রেক্সের দৈহিক পরিবর্তনগুলো যদি কেউ খুঁটিয়ে দেখেন, তাহলে সহজেই বুঝতে পারবেন, কোন পর্যায়ের গবেষণা করেই এ কাজটি করা হয়েছে। যদি বর্তমান সময়েও এই দোপেয়ে জন্তু বেঁচে থাকতো, তাহলে তার দৈহিক আকৃতির বিবর্তন কীরকম হতো, তা গবেষণা করে বের করে এরপর সেটিকে আনা হয়েছে পর্দায়। পাশাপাশি অ্যাকশন, সাসপেন্স, ভয়ালদর্শন ডাইনোসরের ভীতিকর উপস্থিতি...সব মিলিয়ে 'জুরাসিক ওয়ার্ল্ডঃ ডমিয়ন' বেশ আশারই সঞ্চার করেছে। 

এখন বাকিটা কলিন ট্রেভোরোর হাতে। সিনেমার ভূমিকা দেখে প্রত্যাশার পারদ যে অবস্থানে উঠেছে, সেখান থেকে দুম করে পতন হলে, তা যে বেশ বিষাদেরই বিষয় হবে, তা বলাই বাহুল্য। তবে প্রোলোগ যেরকম চমৎকৃত করেছে, তার অর্ধেকও যদি পুরো সিনেমাতে পাই, বর্তে যাবো। এখন তাই কায়মনোবাক্যে এটাই দেখার অপেক্ষা,  গল্পের ডাইনোসর কোথায় কোথায় যায়! নস্টালজিয়ায় রসদ 'জুরাসিক পার্ক' ফ্রাঞ্চাইজি এবার কতটুকু আঁচড় কাটতে পারবে মস্তিষ্কে, বা, আদৌ পারবে কীনা, সেজন্যে তাই কিছুদিনের অপেক্ষা। বাকিটা সময়ই বলবে। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা