পঙ্কজ একবার বলেছিলেন, তিনি কোন বিখ্যাত মানুষের বায়োপিকে অভিনয় করতে চান না, বরং চান আমজনতার বায়োপিকে অভিনয় করতে। কাগজ সিনেমায় সেটাই করলেন তিনি, পর্দায় আপনাকে ১০৯ মিনিটজুড়ে একজন মানুষই টেনে নিয়ে যাবেন; পঙ্কজ ত্রিপাঠি- দ্য জেম অফ ইন্ডিয়ান সিনেমা

ঋণ করা হলো কুকুরের মতো। যে হয়তো তোমাকে সাময়িক প্রটেকশন দেবে, কিন্তু তিন বেলা রুটি চাওয়া শুরু করবে দ্বিগুণ অধিকার নিয়ে। এক বেলা রুটি দেয়া বাদ দাও, ওমনিই তোমার উপরের ঝাপিয়ে পরবে। যে তোমাকে রক্ষা করে রক্ষক হয়ে উঠেছে, সেই তোমাকে ভক্ষণ করবে।

এমনই কিছু চমৎকার সংলাপে ভরপুর সিনেমার নাম কাগজ। হ্যাঁ, যার শুরুতে নাম ছিলো মৃতক। মৃতক থেকে কাগজের কি সম্পর্ক? তারই উপাখ্যান দেখানো হয়েছে সিনেমায়। 

যদি কেউ জানতে চায়, আপনার পরিচয় কি? তবে আমরা সাধারণত কি উত্তর দেই? আমাদের নাম ঠিকানা বলি। যদি অপর পক্ষ প্রমাণ চায়, তাহলে জাতীয় পরিচয়পত্র তুলে ধরি সামনে; প্রমাণ হয়ে যায় আমার আমি! সামান্য কাগজ তখন মহামূল্য হয়ে উঠে শুধুমাত্র সরকারী সীলমোহর সম্বলিত বলে। ওটাই হয়ে যায় আপনার পরিচয়, সমস্ত কিছু।

ভাবুন তো যদি আপনার সেই কাগজে আপনার নাম-ধাম, পরিচয়, বেঁচে থাকা কিংবা মরে যাওয়ার কোন একটা তথ্য, ভুল ক্রমে কিংবা জালিয়াতির মাধ্যমে উলটপালট করে দেয়া হয়? তাহলে কি আপনার সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যাবে? জলজ্যান্ত একজন মানুষের সমস্ত কিছুই নির্ভর করছে একটা কাগজের উপর! হ্যাঁ, এভাবেই আমাদের সাংবিধানিক গঠন্তন্ত্রের সিস্টেম চালিত হয়। আমরা এই সিস্টেমেরই একটা অংশ। এই সিস্টেমের মাধ্যমেই ভালো-মন্দের মধ্যে মন্দটাই বেশি হয়ে থাকে। সরকারী কাগজপত্র জালিয়াতি করে নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ড ঘটে প্রতিনিয়ত, তার সাক্ষী আপনি-আমি-সবাই।

যার মধ্যে জীবিত মানুষ কে কাগজপত্রে মৃত বানিয়ে তাদের সম্পত্তি বাগিয়ে নেয়া হরহামেশাই হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে বেশিরভাগই চুপ করে যায় সিস্টেমের সাথে লড়তে হবে বলে। একজন আমজনতার এতো শক্তি কোথায় যে পুরো সিস্টেমের সাথে লড়বে? এই অসম লড়াইয়ের কথা মেটাফোরিকভাবে সুন্দর করে বলা হয়েছে সিনেমায়- ‘রাম যখন মহাশক্তিধর দশ মাথার রাবণকে হত্যা করে, তখন সেটা রামের জন্য সহজ ছিলো। কারণ, রাবণের দশ মাথা থাকলেও সেটা দেখা যেতো। কিন্তু সিস্টেমের তো অগুনতি মাথা, সেগুলোও আবার অদৃশ্য! তাহলে একজন আমজনতা কিভাবে লড়াই করে টিকে থাকবে এই অসম যুদ্ধক্ষেত্রে!’

কাগজ সিনেমায় পঙ্কজ ত্রিপাঠি ও সতীশ কৌশিক

সিনেমায় হয়তো সম্ভব, তাই বলে বাস্তব জীবনে! হ্যাঁ, এমনটাই ঘটেছিলো বাস্তবে। উত্তর প্রদেশের লাল বিহারী নামক একজন মানুষ কে তারই চাচা-চাচী কাগজপত্রে মৃত বানিয়ে তার ভাগের সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছিলো। আর জীবিত থেকেও লাল বিহারী হয়ে গেছিলো সবার কাছে মৃত। কিন্তু তিনি এভাবে জীবন্মৃত থাকতে চাননি। নিজের মেয়েকে বলেছিলেন ‘যখন উপরওয়ালা আমার ভরসায় তোকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন তখন সামান্য একটা কাগজের টুকরোর কি সাধ্য আছে তোর বাবা কে মেরে ফেলে’। ঘুরে দাঁড়ান লাল বিহারী। বহাল তবিয়তে জীবিত থাকার পরেও নিজেকে জীবিত করতে নিজেই যুদ্ধ করার ঘোষনা দেন। সেই যুদ্ধে সফল হয়েছিলেন নাকি ব্যর্থ হয়েছিলেন সেটা জানতে হলে সিনেমা দেখতে হবে।

সিনেমায় এই লাল বিহারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন পঙ্কজ ত্রিপাঠি। যে মানুষটা মিনিটখানেকের রোল পেলে সেখানেই ফাটিয়ে অভিনয় করেন সেখানে ১০৯ মিনিটের পুরো সিনেমাতেই তিনি লীড রোলে। কিছুটা স্লো ধাঁচের ফ্লজ সম্বলিত সিনেমাও ভালো লাগে যখন পর্দায় পঙ্কজ ত্রিপাঠি থাকেন। এই লোকটার মধ্যে একটা ম্যাজিক আছে। তিনি সম্ভবত অভিনয় করেন না। একেকটা চরিত্রকে নিজের ভেতরে জন্ম দেন। যার কারণে অভিনয় মনে হয় না, ওটা বুঝি পঙ্কজ ত্রিপাঠি নন; পর্দায় ভেসে উঠে বিভিন্ন নামের এক একটা চরিত্র।

গত কয়েক বছর ধরেই বায়োপিক বানানোর একটা ধুম লেগে আছে বলিউডে। বায়োপিক মানেই যেনো ফুলে ফেঁপে উঠা সিনেমা বিজনেস। তখন একটা ইন্টারভিউতে পঙ্কজ ত্রিপাঠি কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো ‘কার বায়োপিকে অভিনয় করতে চান?’ উনি উত্তরে বলেছিলেন একজন আমজনতার বায়োপিক হলে সেখানে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে অভিনয় করবেন। এমনটাই করে দেখালেন। লাল বিহারী নামের একজন আমজনতার বায়োপিকই তিনি করলেন।

অভিনেতা পরিচালক সতীশ কৌশিকের পরিচালনায় এই সিনেমা প্রযোজনা করেছেন স্বয়ং সালমান খান। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে গত ৭ তারিখে রিলিজ পাওয়া সিনেমা জি ফাইভ এ খুঁজতে পারেন। সিনেমায় ফ্লজ রয়েছে, কিছুটা স্লো লাগতে পারে। কিছু জিনিস খাপছাড়াও লাগতে পারে। তবে সিনেমা দেখা শুরু করলে দেখতে চাইবেন এটা সত্যি। তার একমাত্র কারণ হলো পঙ্কজ ত্রিপাঠি। সাথে গানের ব্যবহার খুবই ভালো লাগছে। উদিত নারায়ন, অলকা ইয়াগনিক কে অনেকদিন পর একসাথে কোন অরিজিনাল গানে পাওয়া গেলো। 

সিনেমার শুরু ও শেষটা সালমান খানের ন্যারেশনে, এই জায়গায় শারদ কেলকার কিংবা অমিতাভ বচ্চন থাকলে গুজবাম্প দিতো। হয়তো নিজে প্রযোজক বলেই কি না, নিজেই হাজির হয়েছেন সালমান। তবে পর্দার পেছনে যেই থাকুক না কেন, পর্দায় আপনাকে এই ১০৯ মিনিট একজন মানুষই টেনে নিয়ে যাবেন; সেটা হলো পঙ্কজ ত্রিপাঠি- দ্য জেম অফ ইন্ডিয়ান সিনেমা।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা