আড়াইশো বছর ধরে এক মানু্ষ জেলবন্দী, যার দাবী তিনি খুন করেছেন মীরজাফরকে, যার আবির্ভাবে পালটে যাচ্ছে কারাগারের আবহাওয়া; কে তিনি? কেনই বা তার এমন আবির্ভাব? সত্যিই কি মানুষ অমর হয়? রহস্য কি কখনো হয় বাস্তব?

যদি ভুল না হয়, 'তাকদীর'ই প্রথম বাংলা ওটিটি কন্টেন্ট, যেটা দুই বাংলাতে ম্যাসিভ পপুলার হওয়ার পাশাপাশি ক্রিটিক্যালি অ্যাক্লেইমডও হয়েছিলো। এরপর ধীরে ধীরে আরো বাংলাদেশি কন্টেন্ট এসেছে। ওয়েব সিরিজ, ওয়েব ফিল্ম, অ্যান্থোলজি, সিনেমায় বাংলাদেশি ডিরেক্টররা এখন আলাদা একটা জায়গাই তৈরী করে ফেলেছেন৷ তবে, এই উত্থানের শুরুটা যেহেতু 'তাকদীর' এর মাধ্যমে, সেহেতু যখন নজরে এসেছে, 'তাকদীর' এর ডিরেক্টর সৈয়দ আহমেদ শাওকি নতুন ওয়েব সিরিজ বানাচ্ছেন, খানিকটা নড়েচড়ে বসতে হয়েছে। পাশাপাশি এও ভালো লেগেছে, 'তাকদীর' এর ওরকম হালফিল জনপ্রিয়তার পরপরই স্রোতে গা না ভাসিয়ে নতুন নির্মাণের জন্যে শাওকি বেশ লম্বা একটা সময় নিয়েছেন। টুলস অ্যাণ্ড ক্রাফটস নিয়ে ভেবেছেন। 

যে ভাবনারই খুব সার্থক এক রূপান্তর 'কারাগার।' সার্থক বলার বেশ কয়েকটি কারণ আছে। যার প্রথমটি- মিস্টিক, ডার্ক স্টোরিলাইন। শাওকির একটা ইন্টারভিউতে তিনি বলেছিলেন, এবার এমন একটা গল্প বলতে চান তিনি, যে গল্পে 'তাকদীর' এর প্রভাব থাকবেনা। এবং এটা স্বীকার করতেই হবে, 'কারাগার' এর শুরু থেকেই অক্ষরে অক্ষরে মানা হয়েছে বিষয়টিকে৷ 'তাকদীর' শুরু থেকেই বেশ স্পিডি ছিলো। 'কারাগার' মোটেও তা না৷ 'তাকদির' পুরোদস্তুর থ্রিলার। 'কারাগার' মিস্টিক ড্রামা। অর্থাৎ, পার্থক্যটা ফান্ডামেন্টাল জায়গা থেকেই শুরু। এবং খুব জেনেবুঝেই করা।

কারাগার, ফান্ডামেন্টাল জায়গা থেকেই 'তাকদীর' এর চেয়ে ভিন্ন

তাছাড়া 'কারাগার' এর গল্পটা যেহেতু মিস্ট্রি-বেজড, সেজন্যে স্টোরি ডেভেলপমেন্টে সময় নেয়া হয়েছে। গল্পের সুতো ধীরে ধীরে আলগা করে দর্শককে এই গল্পের সাথে ধাতস্থ করা হয়েছে৷ যে কারণে গল্প প্রথমদিকে অনেকটাই স্লোবার্ণ। যেটার দরকারও ছিলো। যে গল্পে অর্ধশতক ধরে তালাবন্ধ এক সেলে এক রহস্যময় বোবা মানুষকে পাওয়া যায়, যে মানুষটির দাবী- তিনি বিগত আড়াইশো বছর ধরে জেলবন্দী; এমন এক গল্পকে স্টাবলিশ করতে স্ক্রিনপ্লে খানিকটা শ্লথ হওয়া ছাড়া বোধহয় উপায়ও ছিলোনা। হয়েছেও সেটি। গল্প ক্রমশই ডালপালা মেলেছে। এবং এভাবে এগোনো গল্পের শেষটায় যে ক্লিফহ্যাঙ্গার... বাংলা কোনো কন্টেন্টে এমন ক্লিফহ্যাঙ্গার দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়েছে, তৃপ্তিও পেয়েছি। 

'কারাগার'কে সফল বলার দ্বিতীয় কারণ- চরিত্র বন্টন। যখন কোনো নির্মাণে আজকাল চঞ্চল চৌধুরীকে দেখি, ধরে নিতেই হয়- লাইমলাইটের আলো তিনিই কেড়ে নেবেন পুরোটা। বলা বাহুল্য, অভিনয়ের জৌলুশে তিনি আলো কেড়ে নিয়েছেনও আগে৷ কিন্তু, এই কন্টেন্টে সেখানেই দেখেছি ব্যত্যয়। এখানে চঞ্চল চৌধুরীর খুব বড় এক স্পেস আছে। কিন্তু, তাই বলে বাকিরা এখানে মোটেও ম্লান না৷ ইন্তেখাব দিনার এখানে আছেন বড়সড় জায়গা জুড়ে। এফএস নাঈম, আফজাল হোসেন, বিজরী বরকতুল্লাহ, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়'সহ বাকিদের প্রেজেন্সও সেন্স মেক করছে৷ যদিও জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্র খানিকটা অবহেলিত। তবে, দ্বিতীয় অংশে তার ভূমিকা থাকবে। গল্পও সেভাবেই এগোচ্ছে। ভালো লেগেছে এটাই যে, একটা ওয়েব সিরিজে সবমিলিয়ে ১০৭ টা স্পিকিং ক্যারেক্টার থাকা সত্বেও, ক্যারেক্টার ডিস্ট্রিবিউশন হয়েছে ঠিকঠাক। ক্যালকুলেটিভ। তবে, জেলের কিছু পুলিশ সদস্যের কথাবার্তা খানিকটা আড়ষ্ট লেগেছে। এখানে আরেকটু নজর দেয়া বোধহয় যেতো। 

তৃতীয় কারণ- মেটাফোর। চঞ্চল চৌধুরীর '১৪৫ নম্বর সেল' থেকে যে '১৪৫' সংখ্যাটিকে পাওয়া যায়, কোরআন শরীফ ও বাইবেলে যে সংখ্যার আছে আলাদা তাৎপর্য, মেটাফোরের সেখান থেকে শুরু। প্রথম পর্বে ব্যস্ত রাস্তার মাঝখানে 'ব্ল্যাক শিপ' দেখানো, ব্ল্যাক শিপের রিলিজিয়াস ভ্যালু ডিকোড করাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ লেগেছে। রহস্যময় কয়েদীকে প্রিজনের যে ইউনিটে রাখা হয়েছে, সে ইউনিটের নাম 'মাতৃছায়া', এই শব্দটির সাথেও থাকতে পারে প্রোটাগনিস্টের জার্নির কিছু কানেকশন৷ যেটা কন্টেন্টের দ্বিতীয় অংশে বোঝা যাবে। গল্পের শেষাংশে এসে ১৯৭১ এর রেফারেন্স এসেছে। হয়তো মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গও আসবে 'কারাগার' এর পরবর্তী কিস্তিতে৷ শাওকি তার এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন- বাংলাদেশের বিগেস্ট হিস্ট্রি আর মিস্ট্রিকেই তিনি ব্লেন্ড করছেন এখানে। আর একাত্তরের চেয়ে বিগেস্ট হিস্ট্রি কিইবা আছে বাংলাদেশের! 

মেটাফোর

আসা যাক কিছু মুগ্ধতার জায়গায়। চঞ্চল চৌধুরীকে নিয়ে ইতিবাচক কথা বলতে বলতে প্রশংসাসূচক শব্দের ভাঁড়ারে তো বহু আগেই টান পড়েছে, তবুও বলা- কথা না বলে শুধুমাত্র ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন দিয়ে যে অরা তিনি তৈরী করেছেন এখানে, দুর্দান্ত! এই চরিত্রের মধ্যে মিস্ট্রি থাকবে, খানিকটা শকিং এলিমেন্ট থাকবে, খানিকটা টুইস্ট থাকবে... তা বুঝতে পারা যাচ্ছিলো আগেই। কিন্তু, তিনি যে এই ন্যারো স্পেসে এভাবে ডমিনেটিং অভিনয় করবেন, তা ভাবিনি মোটেও। চমকাতে হয়েছে। ইন্তেখাব দিনারও মাপা অভিনয়ে অনবদ্য। সমানে সমান। ওটিটি'র রিসেন্ট টাইমের ফাইনেস্ট দুই আর্টিস্টকে এভাবে চুটিয়ে পারফর্ম করতে দেখতে পারাটা ভীষণ সন্তুষ্টিরও। অভিনয়ের পাশাপাশি ভালো লেগেছে টুকরো-টাকরা আরো কিছু বিষয়ও। 'গডস মাস্ট বি ক্রেজি'কে মেনশন করা, 'মহানগর' এর প্রসঙ্গ টানা... এক্সট্রা টপিংস হিসেবে কাজ করেছে। 

অনবদ্য চঞ্চল চৌধুরী

যদিও কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, গল্পের জটিলতা  আরেকটু কমানো যেতে পারতো। মিস্ট্রির কুয়াশা খানিকটা পাতলা হলে গড়পড়তা দর্শকের সুবিধে হতো। যে মানুষকে ঘিরে এত কাণ্ড, তিনি আরেকটু স্পেস পেলে বোধহয় অডিয়েন্সের পর্যাপ্ত অ্যাড্রেনালিন রাশ হতো। তবে সেসব হয়নি। তা নিয়ে অভিযোগও নেই। যদি কন্টেন্টের দ্বিতীয় পার্টে এসব দিকে ফোকাস করা হয়, যদি ডটসগুলো কানেক্ট করা হয়, যদি পুরো গল্পের উদ্দেশ্য ও বিধেয় জাস্টিফাইড হয়, সেটাই যথেষ্ট। নির্মাতা জানিয়েছেন- এই কন্টেন্টের অনেক প্রশ্নের উত্তর দর্শক পাবেনা৷ অনেকগুলো প্রশ্ন ছুঁড়ে থামবেন তিনি। তবুও, সব প্রশ্নের উত্তর না পেলেও,ফান্ডামেন্টাল প্যারাডক্সগুলো যেন ইগনোর না করা হয়, অনুরোধ থাকবে সেখানটাতেই৷ 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা