ভিকি জাহেদের শর্টফিল্ম 'লাল ডাকাত নীল কাতান' এ ফজলুর রহমান বাবু গ্রাম্য এক ডাকাতের চরিত্রে দারুণ অভিনয় দিয়ে শুরু করলেন ওটিটি-যাত্রা। পরপরই রায়হান রাফির ওয়েব ফিল্ম 'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি'তে এলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেক চরিত্রে। গতানুগতিক চরিত্র তো নয়ই। ভিন্ন খোলসে আবৃত হলেন। দেখালেন অভিনয়ের চমৎকারিত্ব। মুগ্ধ করলেন সবাইকে...

'চরকি'তে আসা রায়হান রাফির সাম্প্রতিক নির্মাণ 'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি'তে 'সাংসদ ফিরোজ খান' চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু যে অভিনয় করলেন, সে অভিনয়ের নানা দিক গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রোটাগনিস্ট হিসেবে চরিত্রের মূখ্য দাবী সামলানোর পাশাপাশি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম নানা ব্রিলিয়ান্সে তিনি যেভাবে চরিত্রটিকে জ্যান্ত করলেন, সেটি আবারও বেশ ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছে- কেন তিনি অভিনয়টা আর বাদবাকি পাঁচজনের চেয়ে ভালো বোঝেন। কেন তার অভিনয়ে বিলকুল আস্থা রাখে আপামর দর্শক।

'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি'র শুরুর খানিকটা দেখে দর্শক ধরেই নিয়েছিলো, সারভাইভাল এক ড্রামা হতে যাচ্ছে এই নির্মাণ। কিন্তু ক্রমশই সেখান থেকে সরে এসে যেভাবে পলিটিক্যাল এক থ্রিলারে টার্ণ নেয় এই ওয়েব ফিল্ম, তা অনবদ্য। এবং তার চেয়েও বেশি অনবদ্য, ফজলুর রহমান বাবুর ক্যারেক্টার আর্ক। ক্রমশই রঙ পাল্টানো এ চরিত্র আনপ্রেডিক্টেবলই থেকে যায় শেষতক। যে চরিত্র ভালো-খারাপ এর অদ্ভুত এক সরল দোলক  হয়ে নিরন্তর দুলতে থাকে। কোনো পক্ষেই থিতু হয় না। গল্পশেষে তাই একপেশে কোনো মন্তব্য করা যায় না চরিত্রটিকে নিয়ে৷ ভাবতে হয়। দর্শকের করোটিতে ভাবনার বিস্তর রসদ জুগিয়ে ক্রমশ সমাপ্ত হয় এই চরিত্র। 

চার বছর ধরে পরিত্যক্ত এক কারখানায় আটকে থাকা এক মানুষের চেহারায় যতটুকু বিভ্রান্তি, ক্লান্তি ও পাগলাটেপনা ফুটে ওঠা উচিত, ঠিক তার পুরোটাই ফজলুর রহমান বাবু যেভাবে উঠিয়ে আনলেন চেহারায়, তাতে প্রাথমিকভাবে ধাক্কা খাবেন অনেকেই। উসকোখুসকো চুল, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত দাড়িগোঁফ এবং বহুকালের ময়লা জামাকাপড়ের অভ্যন্তরের এই মানুষটিকে প্রথমবার স্ক্রিনে দেখে খানিকটা শিউরেই উঠতে হয়। কথায় আছে- আগে দর্শনদারী। পরে বাকিসব। সে নিয়ম মেনেই চেহারাতেই বাজিমাত করলেন প্রথমে। বাকিটা পুষিয়ে দিলেন অভিনয়ে।

দুর্দান্ত অভিনয় করলেন 'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি'তে! 

ফজলুর রহমান বাবুর সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনয় বলতে এখনও সবার আগে চলে আসে 'অজ্ঞাতনামা'র কথা৷ সন্তানহারা দিশেহারা এক বাবা হতে চেহারায় যে কয়টি দুঃখের বলিরেখা ফুটিয়ে তোলা দরকার, 'অজ্ঞাতনামা'য় তিনি হুবহু সে ক'টি বলিরেখাই ফুটিয়ে তুলেছিলেন চেহারায়। অভিনয় করা কঠিন। কিন্তু সেই অভিনয়ে যখন চোখ-মুখ-নাক-গলা সহ গোটা দেহকেই যুক্ত করা হয়, তখন যে অসাধ্যসাধন হয়, তা বর্ণনাতীত। সেটিই দর্শক পেয়েছিলো 'অজ্ঞাতনামা'য়। ঠিক একই রকম অভিনয় এলো 'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি'তেও। পুরো শরীর দিয়েই অভিনয় করলেন। ক্যারেক্টার স্টাবলিশমেন্টের একটা মুহুর্তও অপচয় করলেন না। শুরু থেকে শেষতক ধরে রইলেন অভিনয়ের হাল। 

আমাদের ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে বেশ বড়সড় এক অভিযোগ, আমরা আমাদের সংস্কৃতিক্ষেত্রের অজস্র প্রতিভাকে ঠিকমত মূল্যায়ন করতে পারি নি৷ এ অভিযোগের সপক্ষে একগাদা অবহেলিত রত্নকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আসা যাবে সামনে। সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। তবে প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে এটুকু জানানোই যায়, অবহেলিত সে রত্নের তালিকায় ফজলুর রহমান বাবু আছেন আগেভাগেই। চারবারের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এ অভিনেতার আক্ষেপ আমরা মাঝেমধ্যেই শুনেছি। যে আক্ষেপজুড়ে বরাবরই ছিলো বৈচিত্র্যময় চরিত্র না পাওয়ার আক্ষেপ। পেটের তাগিদে একঘেয়ে কাজ করার আক্ষেপ। অথচ ভিন্ন স্বাদের চরিত্র পেলে তিনি কী করতে পারেন, তা সর্বজনবিদিত। 

আশার কথা, গুণী অভিনেতাদের বৈচিত্র্যময় চরিত্র না পাওয়ার আক্ষেপ ঘোচানোর জন্যেই স্ট্রিমিং সাইটগুলোর আবির্ভাব। যাদের সৌজন্যে উপমহাদেশের অনেক গুণী অভিনেতাই আজকাল নিজেদের অভিনয়ের সৌকর্য দেখাতে পারছেন নিয়মিত। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম না। ফজলুর রহমান বাবু, চঞ্চল চৌধুরী কিংবা মোশাররফ করিমের মতন তুখোড় অভিনেতা ওটিটির বদান্যতায় নিয়মিতই হাজির হচ্ছেন ভিন্ন স্বাদের চরিত্রে। দেখাচ্ছেন তাদের সৃজনীশক্তি। ফজলুর রহমান বাবু যেমন ভিকি জাহেদের শর্টফিল্ম 'লাল ডাকাত নীল কাতান' এ গ্রাম্য এক ডাকাতের চরিত্রে দারুণ অভিনয় দিয়ে শুরু করলেন ওটিটি-যাত্রা।  পরপরই রায়হান রাফির ওয়েব ফিল্ম 'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি'তে এলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেক চরিত্রে। গতানুগতিক চরিত্র তো নয়ই। ভিন্ন খোলসে আবৃত হলেন। দেখালেন অভিনয়ের চমৎকারিত্ব। ওটিটি'র প্রবল আধিপত্য না থাকলে এই নির্মাণগুলো কবে নাগাদ হতো, আদৌ হতো কী না, সে প্রশ্ন কেউ তুললে, তা অমূলক তো হবেই না, বরং তা হবে বিস্তর প্রাসঙ্গিক। 

নীল ডাকাত! 

ফজলুর রহমান বাবু'তে ফিরি আবার। 'বিকেল বেলার পাখি' নাটকের ভীষণ অসহায় মধ্যবিত্ত বাবা কিংবা 'দারুচিনি দ্বীপ' এ প্রবল বিরক্তিকর বিত্তবান এক মানুষ...যখনই যে চরিত্রে এসেছেন তিনি, সে চরিত্রের ব্যাপ্তি অল্প হোক কিংবা দীর্ঘ...অদ্ভুত ক্ষমতাবলে চরিত্রকে পর্দায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বাঙ্গে। নিরাপদ বেতনের ব্যাঙ্কের চাকরী ছেড়ে অভিনয়ে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া এই থিয়েটার-পাগল অভিনেতার অনিশ্চিত শঙ্কা-সময়ের আপাতত ইতি। এখন নির্মাতারা তাকে বৈচিত্র‍্যের নানা কাজের চ্যালেঞ্জ নিয়মিতই দিচ্ছেন এবং তিনিও সেসব চ্যালেঞ্জকে সাদরে গ্রহণ করছেন। দেখাচ্ছেন চমক। এবং এতে আখেরে লাভ হচ্ছে দর্শকেরই।

গুণমুগ্ধ দর্শক হিসেবে আশা থাকবে, গুণী এ অভিনেতা নিয়মিতই আসবেন ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে। নিজের চরিত্রের কাঠামো নিজেই নিয়মিত ভাঙ্গবেন। নিজের শ্রেষ্ঠত্বের পুরোপুরিই দেখাবেন। তাহলেই রাজযোটক। সোনায় সোহাগা।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা