একজন 'ফজলুর রহমান বাবু'র অসাধারণ অভিনয় দেখার জন্যে হলেও 'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি' দেখা যেতে পারে। কিংবা খানিকটা অন্যরকম এক পলিটিক্যাল স্টোরি দেখার জন্যে হলেও দেখা যেতে পারে এই ওয়েব ফিল্ম। খারাপ লাগবে না মোটেও...

যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে

রায়হান রাফির সাম্প্রতিক নির্মাণ 'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি'র সারমর্ম হিসেবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার এই দুই লাইনকে অবলীলায় ব্যবহার করা যায়। রায়হান রাফির নির্মাণে আমরা যে ধরনের কাঠামো পেয়ে  অভ্যস্ত, অর্থাৎ, জানোয়ার কিংবা ডার্ক সাইড অব ঢাকা'তে যে প্যাটার্ন আমরা দেখেছি, সেটি উপস্থিত এই ওয়েব ফিল্মেও। থমথমে গল্প, রুদ্ধশ্বাস থ্রিল কিংবা অপ্রত্যাশিত পরিণতি- সবই বহাল তবিয়তে উপস্থিত৷ পুরোমাত্রায় উপস্থিত। 

আশফাক নিপুণের সাম্প্রতিক নির্মাণ 'মহানগর' যেমন রাজধানীর এক থানাকে কেন্দ্র করে লতায়-পাতায় বেড়ে ওঠে, তেমনটি লক্ষ্য করি 'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি'র ক্ষেত্রেও। জরাজীর্ণ এক সুগার মিলের ভেতরে আটকে পড়া দুই প্রাণীর বেঁচে থাকার সংগ্রাম, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং ফ্ল্যাশব্যাকে আসা একাধিক ঘটনার মিলিত বুনোটে ফিকে গল্প ক্রমশই স্পষ্ট হয় দর্শকের সামনে। গল্প স্পষ্ট হতে হতে আচমকাই মোড় নেয় পলিটিক্যাল পটবয়লারে, যেখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাস, লোভ, ক্রোধ আসে যুগপৎভাবে। ক্রমান্বয়ে।

সাধারণত এ জাতীয় নির্মাণে, যে নির্মাণে লোকেশনের খুব বেশি ঘনঘটা নেই, সিনেম্যাটিক অ্যাসথেটিজম এর চূড়ান্ত নেই, সেখানে চালকের আসনে আসতে হয় গল্পকে, নির্মেদ স্ক্রিপ্টকে। রায়হান রাফির এই ওয়েব ফিল্ম যে সে লক্ষ্যেই এগিয়েছে, তা একেবারে শুরু থেকেই বুঝতে পারবে দর্শক। বাগেরহাটের 'পাখি' নামের এক সহজসরল তরুণী যখন ঘটনার ঘনঘটায় আটকে পড়ে কোনো এক পরিত্যক্ত সুগার মিলে এবং যেখানে খুঁজতে খুঁজতে সে আবিষ্কার করে শিকলবন্দী প্রভাবশালী এক এমপিকে, যিনি কী না গত চার বছর ধরে নিখোঁজ, ঠিক তখনই গল্প সাদামাটা এক 'সারভাইভাল স্টোরি' থেকে খানিকটা গোত্তা খেয়ে অন্য সড়কের যাত্রী হয়। 

সুগার মিলের অভ্যন্তরে লতাগুল্মের মতন গিজগিজে বিকটাকার যন্ত্রপাতির থমথমে আবহ কিংবা মিটমিটে ঘোলাটে আলোর ভৌতিক শুনশান স্তব্ধতা, পাশাপাশি পাখি (তমা মির্জা) এবং এমপি ফিরোজ খান (ফজলুর রহমান বাবু) এর ভয়ালদর্শন অবয়ব- এসব অনুষঙ্গের সম্মিলিত উৎসাহে দর্শক শুরু থেকেই নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হবে এ নির্মাণের পরবর্তী অংশ দেখার জন্যে। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সাথে মানানসই ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং অতি অবশ্যই দুই প্রধান কুশীলবের অভিনয়ের চমৎকারিত্ব দর্শকের এ প্রাথমিক উত্তেজনা ক্রমান্বয়েই বাড়াবে।

দুই প্রোটাগনিস্টের দ্বন্দ্ব বেশ উপভোগ্য! 

আস্তে আস্তে গল্পে ঢুকবেন বহু-বিচিত্র চরিত্র। প্রথমেই নাসির উদ্দিন খান। যিনি দুষ্টু লোক। শঠ। কপট। বন্দী ফজলুর রহমান বাবুকে ক্রমশই শাসাবেন তিনি। কোনো এক বিষয়ে মুখ খুলতে বলবেন। এখানে একটি অদ্ভুত প্যারাডাইম শিফটের মুখোমুখি হবে দর্শক। কিছুদিন আগে স্ট্রিমিং সাইট 'চরকি'তে ভিকি জাহেদের স্বল্পদৈর্ঘ্যের নাটক 'লাল কাতান নীল ডাকাত' এ ডাকাত হিসেবে ফজলুর রহমান বাবু শাসিয়েছিলেন নিরীহ নাসির উদ্দিন খান'কে। সেখান থেকে চরিত্রের স্থানান্তর হয়ে নিপীড়কের আসনে নাসির উদ্দিন খানের উপস্থিতি, তাও ফজলুর রহমান বাবুর বিপরীতে- খানিকটা বৈপরীত্যের স্বাদই দেবে। ক্রমান্বয়ে দৃশ্যপটে আসবেন সুমন আনোয়ার কিংবা ইন্তেখাব দিনার। এই শিল্পীরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে দুর্দান্ত অভিনেতা। তারা এখানেও তাদের সে মান বজায় রেখেছেন পুরোপুরি। হতাশ করেন নি মোটেও। বিশেষ করে- সুমন আনোয়ার অনবদ্য। 'মরিবার হলো তার স্বাদ' এ 'ডিউক' চরিত্র থেকে 'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি'র 'রমিজ উদ্দিন'; চরিত্রের চাহিদা এবং অভিনয়ের সৌকর্য, বেশ ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি।

তবে সবাইকেই ছাপিয়ে গেলেন একজন। তিনি ফজলুর রহমান বাবু। তিনি এই নির্মাণে আবারও প্রমাণ করলেন, কেন তিনি বাকিদের চেয়ে খানিকটা হলেও উত্তম! কেন তার অভিনয়ে আস্থা রাখে আপামর দর্শক! 

সবাইকে ছাপিয়ে অনবদ্য ফজলুর রহমান বাবু! 

যদি প্রথম থেকে গল্পের স্থানান্তর কেউ মনোযোগী দর্শকের মতন খেয়াল করেন, তাহলে শেষের চমকে খুব একটা চিত্তবৈকল্য ঘটবে না। খানিকটা খেলো চমকই মনে হবে। তবে যদি থ্রিলারের সেরকম দর্শক না হন, সেসব দর্শকের কাছে এ চমকও অসাধারণ হয়ে ধরা দিতে পারে। পুরোটাই দর্শকের উপর নির্ভর করছে। তাছাড়া গল্প যেভাবে এগিয়েছে, সে বিন্যাসেও ছিমছাম এক সুর ছিলো। বিজিএম, কালার টোন নিয়েও আক্ষেপের সুযোগ নেই অতটা। অভিনয়ে সবাই সবার দারুণটাই দেখিয়েছেন। সেখানেও 'যদি কিন্তু' নেই মোটেই। 

তবে খানিকটা অতৃপ্তি আছে অন্যখানে। যেভাবে গল্প শুরু হয়েছিলো, মাঝপথে গিয়ে সে গতি অনেকটাই থমকে গিয়েছে। শেষের দিকে এসে যদিও গতি বাড়িয়ে আগের সেই ঝুলে যাওয়া ক্ষতের খানিকটা ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা হয়েছে। তবু আক্ষেপ থেকেই গিয়েছে। যে ধাঁচের গল্প, চাইলে এ গল্পে আরো কিছু চরিত্র, আরো কিছু সাবপ্লট অনায়াসে যুক্ত করা যেতেই পারতো। ক্যারেক্টার স্টাবলিশমেন্ট, ব্যাকস্টোরি ডেভেলপমেন্ট নিয়েও খানিকটা কাজ করা যেতে পারতো। সাউন্ড মিক্সিং এ খানিকটা বিচ্যুতি রয়ে গিয়েছে। সেদিকে আরেকটু যত্নবান হওয়া যেতো। ভিএফএক্স এর কাজ আরেকটু বাস্তব হতে পারতো। আরেকটু খুঁতখুঁতে হওয়া যেতো স্ক্রিনপ্লে'তেও। নির্মাতা রায়হান রাফির প্রতি প্রত্যাশা বেশি বলেই ঠিক তৃপ্তির ঢেঁকুর এলো না এই নির্মাণে। আশা করি, সামনের কোনো কাজে তিনি তা পুষিয়ে দেবেন।

সুমন আনোয়ারের আরেকটি শক্তিশালী পারফরম্যান্স! 

এসবই আক্ষেপ। বাকিসব ঠিকঠাক। চলনসই। একজন 'ফজলুর রহমান বাবু'র অসাধারণ অভিনয় দেখার জন্যে হলেও 'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি' দেখা যেতে পারে। কিংবা খানিকটা অন্যরকম এক পলিটিক্যাল স্টোরি দেখার জন্যে হলেও দেখা যেতে পারে এই ওয়েব ফিল্ম। খারাপ লাগবে না মোটেও। এবং এই নির্মাতার প্রতি আরেকটি প্রত্যাশাও থাকবে। ক্রাইম-থ্রিলার জনরার বাইরে গিয়ে অন্যান্য জনরায় কাজ করার প্রত্যাশা। আশা করি, ভিন্ন ভিন্ন জনরাতে তিনি তার সৃজনশীলতা আবারও দেখাবেন।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা