ছেলের পীড়াপীড়িতে কিশোয়ার নাম লেখান 'মাস্টার শেফ অস্ট্রেলিয়া' রিয়েলিটি শো'তে। বাকিটা হয়ে থাকে বাংলাদেশে শেকড় গেঁড়ে থাকা এক প্রবাসী রাঁধুনির দিগ্বিজয়ের গল্প। যে রাঁধুনি লাউ চিংড়ি, বেগুন ভর্তা অথবা আমের টকের আদিম রসায়নে ক্রমশই জয় করে নেন বহু মানুষের হৃদয়...

এ বছরের শুরুর দিকে 'ইন্দুবালা ভাতের হোটেল' নামে এক বই বেশ জনপ্রিয় হয়। দুর্দান্ত এ উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র ইন্দুবালা। যিনি পূর্ব বাংলার মেয়ে, যিনি সময়ের ফেরে এক ভাতের হোটেল খোলেন পশ্চিমবাংলায়। ভাতের হোটেলটির বিশেষত্ব, এখানে কেবলমাত্র রান্না হয় পূর্ব বাংলার খাবার। খাবারের সূত্রে ইন্দুবালা কাঁটাতারের প্রভেদ ঘোচাতে চান, খাবারের ঘ্রাণে দুই বাংলাকে করতে চান অভিন্ন। তা নিয়েই গল্প। অবশ্য গল্পের এই আকুতির বাস্তব উদাহরণও আছে অজস্র। মানুষ নানাভাবে আঁকড়ে ধরতে চায় নিজের দেশ, ভূখণ্ড, সময়'কে। সাদাত হোসেন মান্টো বা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে তাই বারবার ফিরে আসে দেশভাগের দুঃসহ স্মৃতি, স্বভূমির আক্ষেপ। ঋত্বিক ঘটক ওপারে গিয়েও তাই ফিরে আসেন এপারে, ক্যামেরার চোখে, ক্যামেরার মগজে। সৈয়দ মুজতবা আলী কায়রো থেকে প্যারিস, নানা মুলুকের খাবার চেখে দেখার সুযোগ পান। তবু তাঁর মন পড়ে থাকে কুঁচো চিংড়ি দিয়ে ভাজা করলা, রুই মাছের ঝোল আর একথালা গরম ভাতে। এরকমটা দেখি কিশোয়ার চৌধুরী নামের একজন মানুষের ক্ষেত্রেও। যাকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় চলছে। যিনি পরবাসে থেকেও রান্নাসূত্রে স্পর্শ করতে চান নিজের দেশকে। বাংলাদেশকে। 

কিশোয়ার চৌধুরী; সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচিত এক নাম! 

রান্না বিষয়ক জনপ্রিয় টেলিভিশন রিয়েলিটি শো 'মাস্টার শেফ অস্ট্রেলিয়া'য় দুর্দান্ত নৈপুণ্যের বরাতে কিশোয়ার চৌধুরী এখন বহুল চর্চিত এক নাম। তিনি পৌঁছে গিয়েছেন এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বেও। অনেকেই আশা করছেন, এবারের শিরোপাও তিনিই জিতবেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত একজন মানুষের এহেন আন্তর্জাতিক সাফল্যে সামাজিক মাধ্যমে যে পরিমাণ কথাবার্তা হচ্ছে, তা হওয়াটা স্বাভাবিকও। তবে কিশোয়ার চৌধুরীকে নিয়ে এদেশীয় মানুষের আগ্রহ বেশি হওয়ার প্রধানতম কারণ সম্ভবত, তার রান্নার পদ নির্বাচন। বিদেশবিভুঁইয়ের এই রান্নার মঞ্চে তিনি নিয়মিত লড়াই করেছেন বাংলাদেশের আবহমান রান্নাকে ঢাল-তলোয়ার বানিয়ে। অনেকটা ইন্দুবালার মতন, খাবারের মধ্য দিয়ে তিনি দেশকে নিয়মিত হাজির করেন অজ্ঞাতকুলশীল মানুষের সামনে৷ বিচারকদের মুগ্ধতার সমানুপাতিক হারে  যিনি এটাই প্রমাণ করেন, চাইলে দেশের আটপৌরে রান্না দিয়েও অসাধ্যসাধন করা সম্ভব।

ধোঁয়া-ঘ্রাণ-স্বাদের হেঁশেল সামলাচ্ছেন পরম যত্নে! 

কিশোয়ার চৌধুরীর বাবা বাংলাদেশের মানুষ। মা কলকাতার। তার বাবা-মা বিয়ে করার পরেই পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়, তাও প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। অনেকেই যেমন বিদেশে এসে সবার আগে নিজের 'দেশীয় অবয়ব' মুছে ফেলতে উদ্যোগী হন, সেখানে কিশোয়ার চৌধুরীর বাবা-মা দেখান ব্যতিক্রম এক উদাহরণ৷ তারা অস্ট্রেলিয়ায় থাকা সত্বেও ভুলে যান না নিজস্ব ভূখণ্ডকে,  দেশের ভাষা-সংস্কৃতির চর্চাও তাই অটুট থাকে তাদের পারিবারিক পরিমন্ডলে৷ তারই ফলশ্রুতিতে, কিশোয়ার জন্মের পর থেকেই দেশজ পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠার এক বিরল সুযোগ পান৷ দেশের ভাষা-সংস্কৃতির চর্চার পাশাপাশি কিশোয়ার আগ্রহী হন রান্নাবান্না নিয়ে, তাও খুব অল্পবয়সে। মায়ের হাতেই হয় দেশ-বিদেশের বহু রান্নার হাতেখড়ি। 

পরিবারের সবাই একত্রে

তবে রান্না নিয়ে এতকিছু করবেন, এতদূর আসবেন, এরকমটা হয়তো কল্পনা করেন নি তিনিও। তবে ভেতরে ভেতরে একটুখানি আক্ষেপ ছিলো, নিজের ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশের রান্না নিয়ে অতটা জানে না, অতটা আগ্রহী না, সে আক্ষেপ। কিশোয়ার তাই ভাবতেন, রান্না নিয়ে এক বই লিখবেন। যে বই হয়তো তার ছেলেমেয়েকে আগ্রহী করবে রান্না নিয়ে। সে বই নিয়ে কাজ শুরুর আগেই গত বছরে শুরু হয় মহামারী। ছেলের পীড়াপীড়িতে কিশোয়ার নাম লেখান 'মাস্টার শেফ অস্ট্রেলিয়া' রিয়েলিটি শো'তে। বাকিটা হয়ে থাকে বাংলাদেশে শেকড় গাড়া এক প্রবাসী রাঁধুনির দিগ্বিজয়ের গল্প। যে রাঁধুনি লাউ চিংড়ি, বেগুন ভর্তা, অথবা আমের টকের আদিম রসায়নে ক্রমশই জয় করে নেন বহু মানুষের হৃদয়। 

বহু হাসি-কান্নার মুহুর্ত তাকে উপহার দিয়েছে এই রিয়েলিটি শো! 

কিশোয়ার রান্না নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেন৷ কোনো একটি পদ রান্না করার আগে সে খাবারটি নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করেন। যখন বাংলাদেশের কোনো খাবার রাঁধেন, আদি ও অকৃত্রিম বাংলাদেশের রন্ধনপ্রণালী অনুসরণ করেন। আবার যখন অস্ট্রেলিয়া বা ইতালির কোনো পদ চড়ান হেঁশেলে, সেখানেও তিনি গোঁড়া। মূলস্রোতে থাকেন৷ সংযুক্তি বা বিযুক্তির লেশমাত্র রাখেন না পদপ্রণালী তে। এমন কী, তিনি খাবারগুলোর নামের ক্ষেত্রেও ফিউশন আনেন না। যে খাবারের যে নাম, সে নামেই তিনি সেগুলো তুলে ধরেন। যেমন- এই রিয়েলিটি শো এর ফাইনালে তিনি যেসব পদ রান্না করলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিলো আলু ভর্তা। তিনি খাবারটিকে 'ম্যাশড পটেটো' না বলে 'আলু ভর্তা' নামেই পরিচয় করালেন সবার সাথে। খাবারের ঐতিহ্যের সঠিক তাৎপর্য ও মূলসূত্র বজায় রাখার এই যে অক্লান্ত প্রচেষ্টা, সে জন্যে কুর্নিশ নিঃসন্দেহে প্রাপ্য তার। 

খাবারের দীপ্তিতে এ জনপদকে গর্বিত করছেন যিনি, তিনি আক্ষেপ করেন, বিদেশে অনেকরকম রেস্টুরেন্ট থাকলেও দেশীয় খাবারের ভালো কোনো রেস্টুরেন্ট নেই। তিনি তাই আশা করেন, এই প্রতিযোগিতার পরে মানুষ হয়তো বাংলাদেশি খাবার নিয়ে আগ্রহী হবে৷ দেশের খাবারগুলো জনপ্রিয় হবে বিদেশেও। আমরাও সেটাই আশা করি। সেসাথে প্রত্যাশা করি,দেশের ঘ্রাণমাখা এ খাবার-রথের সারথি হয়ে এই সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষটি আরো বহুদূর যাবেন। ভোজনরসিক দেশের মানুষের পক্ষ থেকে কিশোয়ার চৌধুরীর জন্যে রইলো নিখাদ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা