মোটাদাগে গল্প এটাই৷ তবে মূল গল্পের মধ্যেও এক্সট্রা লেয়ার হিসেবে প্রেম এসেছে, অল্পবিস্তর যৌনতা এসেছে, সাসপেন্স এলিমেন্ট এসেছে, কিছু ফান এলিমেন্টও এসেছে। এবং সত্যি বলতে, কোনোকিছুই ঠিকমতো ব্লেন্ড হয়নি...

জেরুসালেমে তখন ধর্মপ্রচার করছেন যিশু খ্রিস্ট। ধর্ম প্রচার করতে করতে একদল সহচর জুটে গেলো তাঁর, যারা সবসময়ে যিশুখ্রিষ্টের সঙ্গেই থাকেন। আবার কিছু শত্রুও জুটলো, যারা নিয়মিত ব্যস্ত থাকতো তাকে কিভাবে দমন করা যায়, সে চিন্তায়৷ এই শত্রুরা তাদের নানা কর্মকাণ্ডের এক পর্যায়ে পেয়ে যায় 'ঘরের শত্রু বিভীষণ' একজনকে। যে যিশুখ্রিস্টের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একজন, জুডাস। তাকে হাত করা হলো।

এরপর এক নির্দিষ্ট দিন ঠিক করা হলো, যেদিন এই শত্রুরা গিয়ে যিশুখ্রিস্টকে আটক করবে এবং পরে হত্যা করবে।  মুশকিল হচ্ছে, যিশুখ্রিস্ট দীনহীন, মলিন হয়ে চলাফেরা করেন সবসময়ে। তাই অনেকেই তাকে চিনতে পারেন না। শত্রুরাও তাই জানতেন না, আসল যিশুখ্রিস্ট কে। জুডাস এর মূল কাজ এখানে। যে যিশুকে চিনিয়ে দেবে শত্রুদের কাছে। 

যথারীতি সেই কাঙ্ক্ষিত দিন এলো। যিশুখ্রিস্ট তার সহচরদের নিয়ে খেলেন 'দ্য লাস্ট সাপার।' এরপরে জুডাস এসে যিশুকে চুম্বন করলেন। এই চুম্বন ছিলো সঙ্কেত। শত্রুরা বুঝলো, এই মানুষটিই যিশুখ্রিস্ট। তারা আগে থেকে এসেই ভীড়ের মধ্যে লুকিয়ে ছিলো। সঙ্কেতের পরমুহুর্তেই তারা এসে গ্রেফতার করলো যিশুখ্রিস্ট'কে। ইতিহাসের এই ঘটনা চিহ্নিত হয়ে রইলো 'কিস অব জুডাস' নামে বা 'যিশুখ্রিস্টের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা' নামে। 

'কিস অব জুডাস' এর মূল যে থিম অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতকতা, সেটিকে উপজীব্য করেই সম্প্রতি বাংলাদেশি স্ট্রিমিং সাইট 'বিঞ্জ' এ এসেছে ওয়েব সিরিজ 'কিস অব জুডাস।' গল্প এগোয় 'শুভ' নামের এক তরুণকে নিয়ে। যাপিত জীবনে তার নানা সমস্যা। শুভ'র বাবা জেলে আটক। টাকার অভাবে ঘরভাড়া, টিউশন ফি দিতে না পেরে ক্রমশই সে হয়ে যাচ্ছে কোনঠাসা। সমস্যা যখন চরমে, তখন আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় শুভ। রেললাইনে গিয়ে দাঁড়ায়। ট্রেন আসবে আসবে এরকম এক মুহুর্তে আচমকা তার কাছে রহস্যময় এক নাম্বার থেকে ফোনকল আসে। যে ফোনকল পালটে দেয় তার জীবন। হ্যাকিং, চুরি, খুন, নেশা... অজস্র সব উপাদানে ক্রমশই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যেতে থাকে সে। 

মোটাদাগে গল্প এটাই৷ তবে মূল গল্পের মধ্যেও এক্সট্রা লেয়ার হিসেবে প্রেম এসেছে, অল্পবিস্তর যৌনতা এসেছে, কিছু সাসপেন্স এলিমেন্ট এসেছে, কিছু ফান এলিমেন্ট এসেছে। এবং সত্যি বলতে, কোনোকিছুই ঠিক জমেনি। 

প্রথমত, চরিত্রগুলোর কারো অভিনয়ই সাবলীল ছিলো না অতটা। সংলাপগুলোও আড়ষ্ট, ক্লিশে। একজন ড্রাগ অ্যাডিক্ট, একজন মডেল, একজন রহস্যময় হ্যাকার এবং একজন কিলার... এই চরিত্রগুলো যে রকম ট্রিটমেন্ট দাবি করে, তার কোনোটাই ছিলো না এখানে। প্রোটাগনিস্ট চরিত্র আবু হুরায়রা তানভীর, যিনি ছিলেন 'শুভ' চরিত্রে, তার চরিত্র থেকে অনেকগুলো লেয়ার পাওয়ার কথা ছিলো। কিন্ত সেরকম কোনোকিছুই পাওয়া যায়নি। অনেকটা একরৈখিক অভিনয় করে গিয়েছেন তিনি। বাকি চরিত্রদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। জান্নাতুন নূর মুন, ওয়াহিদ তারেক, টুটুল চৌধুরী... কাউকেই ঠিকঠাক লাগলো না। 

'শুভ' চরিত্র থেকে প্রত্যাশা ছিলো অনেকটুকুই! 

দ্বিতীয় সমস্যা, স্ক্রিপ্ট। ড্রাগ বিজনেস এবং তার ডিজিটালাইজেশন নিয়েই পুরো গল্প এগিয়েছে। কিন্তু 'হ্যাকিং' নামক বিষয়টিকে এতটা খেলোভাবে দেখানো হয়েছে এখানে, যা অবিশ্বাস্য। প্রত্যেক পর্বের শুরুতে খানিকটা করে সাসপেন্স সিন রাখা হয়েছিলো। সেই সিনগুলো খুবই অদরকারি এবং অগুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে৷ যেকোনো নির্মাণের একটা স্ট্রাকচার থাকে। পর্বের শুরুতেই অহেতুক, অযাচিত টুইস্ট আনতে গিয়ে সেই স্ট্রাকচারের সর্বনাশই করেছেন পরিচালক। আর মূল গল্পটাও খুবই ক্লিশে। 'ওল্ড ওয়াইন ইন আ নিউ বটল' টাইপের কিছু করতে চেয়েছিলেন নির্মাতাসহ টিমের সবাই৷ তাদের প্রচেষ্টা খুব যে বেশি সুবিচার করতে পেরেছে, তা বলতে পারছি না। 

'হ্যাকিং'কে খুবই খেলো করে দেখানো হয়েছে!  

তৃতীয় সমস্যা, এডিটিং এবং সাউন্ড মিক্সিং। আপনি যখন হাত থেকে মোবাইল টেবিলে রাখবেন তখন একটা শব্দ হবে। কিন্তু মোবাইল হাতে থাকা অবস্থায় যদি আপনি সেই শব্দ শোনেন এবং মোবাইল নিঃশব্দে টেবিলে রাখার দৃশ্য দেখেন, তাহলে এটি ভয়ানক সমস্যা। এরকম এডিটিং ও সাউন্ড-জনিত সমস্যা আছে আরো অজস্র। ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হবে...তাই আর লিখছি না। 

'কিস অব জুডাস' দেখে মনে হয়েছে, গল্প যেটাই হোক, নির্মানের যত্নে এবং পরিচালনা-অভিনয়ের মুন্সিয়ানায় এই কাজ উতরে গেলেও যেতে পারতো। কিন্তু ওয়েব সিরিজটির প্রতিটি বিভাগেই এত অযত্নের ছাপ এবং এতটা দায়সারা গোছের কাজ হয়েছে, সেখানে এই নির্মাণ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার মতন আসলেই কিছু নেই। বাংলাদেশের ওয়েব সিরিজগুলোতে বর্তমানে এত দারুণ দারুণ সব কাজ হচ্ছে, সেখানে 'কিস অব জুডাস' মোটামুটি হয়েছে... এই কথাটুকু বলার সুযোগটাও পাচ্ছি না।

'কিস অব জুডাস' আরো সাবলীল হতে পারতো! 

শেষ করি, বাংলাদেশের স্ট্রিমিং সাইটগুলোর প্রসঙ্গ টেনে। বাংলাদেশে অল্প সময়ের ব্যবধানে অনেকগুলো স্ট্রিমিং সাইট গজিয়েছে। কিন্তু আফসোসের বিষয়, সেগুলো গজানোর জন্যেই গজিয়েছে শুধু। অজস্র বিজ্ঞাপন, শ্লথগতি, সমস্যায় ভরা ইন্টারফেস- একজন গ্রাহক টাকা দিয়ে সাবস্ক্রিপশন কিনলেও যে ভোগান্তির সম্মুখীন হয়, তা বর্ণনাতীত। 'কিস অব জুডাস' যেমন দেখতে বসেছিলাম স্ট্রিমিং সাইট 'বিঞ্জ' এ। দেখতে গিয়ে যে প্রহসন পোহালাম, তা নিয়ে হয়তো আরেকদিন লেখা যাবে। এভাবেই যদি উদাসীন স্ট্রাটেজিতে চলতে থাকে এই স্ট্রিমিং সাইটগুলোর কাজ, তাহলে হয়তো এমনও দিন আসবে দুর্দান্ত কন্টেন্ট থাকা সত্বেও মানুষ 'স্ট্রিমিং সাইট' জনিত ভীতিতে মুখ ফিরিয়ে নেবে এই কন্টেন্টগুলো থেকে। যেটা কারো জন্যেই সুখকর হবে না। 

'কিস অব জুডাস' এর পরিচালক হাবীব শাকিলের জন্যে শুভকামনা থাকবে। তিনি প্রতিভাবান নির্মাতা। আশা করি, এই নির্মানের ভুলগুলো শুধরে সামনের কোনো নির্মানে তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর আবারো রাখবেন। সেই প্রত্যাশাই রইলো। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা