'কুম্বালাঙ্গি নাইটস'কে কেন যেন সিনেমা, ফিল্ম বা চলচ্চিত্র বলতে ইচ্ছে করে না। কোনো এক অসংজ্ঞায়িত বিন্দুতে গিয়ে যেন এই সিনেমা হয়ে যায় জীবনেরই অংশ। পর্দার চরিত্রগুলোর সাথে গুলিয়ে যায় নিজের যাপিত বহুকিছু। গল্প যখন ভাষা, সময়, মানচিত্র কিংবা ক্যামেরা ভেদ করে ঢুকে পড়ে ভীষণ ব্যক্তিগত অভয়ারণ্যে, তখন তাকে 'সিনেমা' বলে দূরে ঠেলে দেইও বা কিভাবে?

স্বচ্ছ জল, শীতল মাটি, সার দেয়া নারকেল গাছ, তার মধ্যিখানে স্থানু এক অসমাপ্ত ঘর। এই অসমাপ্ত ঘরটিকে ধরা যেতে পারে আমাদের জীবনের রূপক হিসেবেও। আমাদের জীবনও এরকমই অসমাপ্ত আত্মজীবনী। যে গল্প পুরো জীবনজুড়েই আমরা বলতে চাই, সে গল্পের শেষটা টানার ক্ষমতা কোনোদিনই হয়না আমাদের। তবু এই বিক্ষিপ্ত, ইতস্তত বিভ্রান্ত জীবন নিয়েই আমরা সন্তুষ্ট হই, সাধ্য আর সাধের মধ্যে টানি নরম সুতোর সেতু। ওদিকে অসমাপ্ত সেই মুখব্যাদান করা ঘর আমাদের দাঁড় করায় টলটলে এক আয়নার সামনে। যে আয়নার প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে ফুটে ওঠে আমাদেরই ছবি, ছায়া, বিম্ব। বুঝি, এটাই জীবন। এভাবেই জীবন। 

হাসি-খুশি-খুনসুটি! 

'কুম্বালাঙ্গি নাইটস' দেখতে বসেছিলাম বহুদিন পর। কেন যেন এরকম নির্মাণকে সিনেমা, ফিল্ম বা চলচ্চিত্র বলতে ইচ্ছে করে না। কোনো এক অসংজ্ঞায়িত বিন্দুতে গিয়ে যেন এরা হয়ে যায় জীবনেরই অংশ। পর্দার চরিত্রগুলোর সাথে গুলিয়ে যায় নিজের যাপিত বহুকিছু। গল্প যখন ভাষা, সময়, মানচিত্র কিংবা ক্যামেরা ভেদ করে ঢুকে পড়ে ভীষণ ব্যক্তিগত অভয়ারণ্যে, তখন তাকে 'সিনেমা' বলে দূরে ঠেলে দেইও বা কিভাবে? ঠিক সে সেকারণেই 'কুম্বালাঙ্গি নাইটস'কে সিনেমার দৃষ্টিতে দেখার দুঃসাহস হয়না। নির্মাণের একেবারে শুরুতেই জলমগ্ন জলাধারের সাথে লতায়-পাতায় মিশে থাকা একখণ্ড ঘর দেখে নিজের জীবনের কথা মনে পড়ে, আটকে পড়ি গল্পের জল-মাটি-কাব্যে। রুদ্ধ হই জীবন-রসের ছিমছাম আস্তরণে। 

এই যে একখণ্ড আলুথালু ঘর, এখানে বসবাস চার ভাইয়ের। এই চার ভাইয়ের নিজেদের মধ্যে সংশ্রব খুব যে পোক্ত, প্রথম প্রথম দেখে এমনটা বলার ধৃষ্টতা কারোরই হবে না। ভাইয়ে ভাইয়ে বনিবনা তো দূরের কথা, কথায় কথায় ধস্তাধস্তি, তাদের কাছে ডাল-ভাত মাখিয়ে খাওয়ার মতই খুব গড়পড়তা এক ব্যাপার। তবুও ক্রমশ সময় গড়ায়, আর সময়ের বাহনে স্থির হয়ে আমরা বুঝতে পারি, উপরের এই দ্বন্দ্ব ভীষণই ভ্রম। খুব গভীরে এদের সম্পর্কের যে মায়া, সে মায়া ক্রমশই চোখ বাষ্পীয় করে। বোঝায়- সম্পর্কের নানামাত্রিক গভীরতা। বিশেষ করে চোখ আটকে যায় বড় ভাই 'সাজি' চরিত্রের উপরে। নারকেল দিয়ে গুড় খেতে খেতে বাসি পত্রিকা পড়ে যে বিশ্বজয়ের তৃপ্তি পায়, সে মানুষটিই ছোট ভাইয়ের আঘাতে অভিমানী হয়ে কাপুরুষের মত চলে যায় আত্মহত্যা করতে। আবার সে কাপুরুষ মানুষটিই প্রচণ্ড সাহসী হয়ে সমাজ-সংসারের বিধিনিষেধ ত্যাগ করে মৃত বন্ধুর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে স্থান দেয় নিজের অপ্রস্তুত ঘরে। সে অপমানিত হয়, তিরস্কৃত হয়, কিন্তু পরিবারের মায়া ছাড়তে পারে না। বটগাছের মত ঠিক আগলে রাখে পরিবারের শাখাপ্রশাখাকে। 

'সাজি'র মত বাস্তবেও যদি আমাদের কেউ থাকতো! 

'কুম্বালাঙ্গি' নামের এই গ্রামের জমাট ধূলোমাখা পথ পেরিয়ে যত সামনে যাওয়া যায়, এই চার ভাই ছাড়াও সেখানে দেখা মেলে আরো কিছু মানুষের। চোখ আটকায় 'শাম্মি' নামের প্রচণ্ড স্বকামী মানুষের উপরেও। ভীষণ জটিল এ চরিত্র ক্রমশই ধন্দে ফেলতে চায়। চোখের কোণে ক্রুর চাহনি, ঠোটে ঝুলিয়ে রাখা মিথ্যে হাসির এই 'ধূসর' চরিত্র ক্রমশই কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে। সোজাসাপ্টা ছিমছাম 'কুম্বালাঙ্গি'তে 'শাম্মি' আনে যাপিত বৈপরীত্যও। এবং খুব দারুণভাবেই সে মিশে যায় মিঠেকড়া সমীকরণের সাথে। 'শাম্মি'কে তার সেলুনের সামনের ধূসর গল্পে ক্রমশ স্থির রেখে আরেকটু সামনে এগোলে দেখতে পাওয়া যায় বেবি-বাবুর খুনসুটির প্রেম, নায়লা-বনির অসম সম্পর্কের প্রগাঢ় চালচিত্র। এসব দেখতে দেখতে বুঁদ হয়ে যেতে যেতে একসময় ফুরিয়ে যায় পথ। 'কোচি' র ছোটখাট জনপদ 'কুম্বালাঙ্গি'র শেষ সীমানার মুখোমুখি তখন। সামনে অতলান্ত জলরাশি। ঘাটে বাঁধা একটিমাত্র নৌকা। উঠে বসি সে নৌকায়। স্থলের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ হয়৷ ভীষণ কোমল, মায়াবী 'কুম্বালাঙ্গি' ছেড়ে ফিরতে হয় স্থলের পথে। 

'শাম্মি' চরিত্রটি ভীষণ ধূসর! 

ভেজা আকাশ, হিম বাতাস, একটু আগেই বৃষ্টি হলো বোধহয়, তিরতির করে জল কেটে যাওয়া নৌকায় বসে রীতিমতো কাঁপতে থাকি আর ভাবি ক্রমশ ক্ষুদ্র হয়ে আসা 'কুম্বালাঙ্গি'র কথা। ভাবার প্রসঙ্গও আছে ঢের। চার প্রজন্মের চার ভাইয়ের যে সম্পর্ক এখানে, সে সম্পর্কে যে পারস্পরিক বিশ্বাস, একজনের সংঘাতে আরেকজনের একবস্ত্রে ছুটে যাওয়া...সেসব কি আজকাল খুব একটা ঘটে? জানি না। 'কুম্বালাঙ্গি'র সে ঘর, যে ঘরে দারিদ্র্যের ছাপ ভীষণভাবে প্রকট, যে ঘরকে অনায়াসেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত সে লাইন- ঈশ্বর থাকেন ঐ গ্রামে, ভদ্র পল্লীতে- এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’ বলে চালিয়ে দেয়া যায়, সে ঘরেও যেভাবে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে ফুটে ওঠে জীবনের গান, সে ঘর কী আমাদের এই জনারণ্যে একটিও খুঁজে পাবো? জানি না। সম্পর্কের সুতোগুলো যেভাবে যাপিত জটিলতাতেও মিশে থাকে একে অন্যের নিবিড় সাহচর্যে, সে কি আমাদের এই তথাকথিত নিপাট-পরিপাটি সমাজে খুঁজে পাওয়া যাবে? নিশ্চিত নই। যে প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রিক 'শাম্মি'কে আমরা অপছন্দ করি, সে কি রূপকের আড়ালে আমাদেরই প্রতিনিধিত্ব করেনা?

এসব ভাবতে ভাবতে কতদূর চলে গিয়েছি, জানা নেই। মৃদু ধাক্কায় সম্বিৎ ফেরে। নৌকা তীরে ঠেকেছে। পেছনে 'কুম্বালাঙ্গি' অদৃশ্য। সেখানে শুধু ঝিঁঝিঁপোকার প্রচ্ছন্ন কোরাস, জলরাশির মৃদু কলতান। নৌকা থেকে নামি। সামনে টিমটিমে আলো। বাহন। জনারণ্য। এই মিথ্যে-কপট শহরে 'কুম্বালাঙ্গি'র স্মৃতি কতক্ষন সজাগ থাকবে, জানি না। তবে বুকভরে নিঃশ্বাস আর নিজের মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্যে এই 'কুম্বালাঙ্গি'র জনপদে যে ফিরতে হবে আবারও, তা নিশ্চিত জানি। সে আশায় বুক বেঁধে এগোই নাগরিক জটিলতার গলিঘুঁজিতে। মিশে যাই জনস্রোতে। নিশ্চিন্তে।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা