মাস্টারপিস বললে অত্যুক্তি হয়ে যাবে, কিন্তু লাবনী চোখে এবং মনে শান্তি এনে দেয়ার মতো একটা কাজ। এই জনরাটা নিয়ে বাংলাদেশে এক্সপেরিমেন্ট হয় না বললেই চলে। সেই অস্পর্শী ঘরাণায় লাবনী দারুণ একটা সংযোজন হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে!

বঙ্গ বিডির 'বেজড অন বুক' প্রোজেক্টে যে কাজটা নিয়ে জিরো এক্সপেক্টেশন ছিল, সেটা হচ্ছে লাবনী। মারুফ রেহমানের লেখা 'লাবনী' উপন্যাসটা পড়িনি, কাজেই ধারণা ছিল না গল্পটা কেমন হবে। তার ওপর হরর ঘরানার কাজ শুনেই ভেবে বসেছিলাম, অতীতে যেমন অজস্রবার ভালো একটা বাংলাদেশী হরর প্রোডাকশন দেখতে গিয়ে আশাভঙ্গ হয়েছে, এবারও তেমন কিছু হতে পারে। তাই আশাই রাখিনি। 

অথচ পরিচালক গোলাম হায়দার কিসলু ভালো একটা চমক উপহার দিলেন। লাবনী মোটেও হরর ধাঁচের কোন টেলিফিল্ম নয়, এটাকে বরং সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার বলা যেতে পারে। মাস্টারপিস বললে অত্যুক্তি হয়ে যাবে, কিন্তু লাবনী চোখে এবং মনে শান্তি এনে দেয়ার মতো একটা কাজ। এই জনরাটা নিয়ে বাংলাদেশে এক্সপেরিমেন্ট হয় না বললেই চলে। সেই অস্পর্শী ঘরাণায় লাবনী দারুণ একটা সংযোজন হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে! 

লাবনীর গল্পটা একটা আধছেঁড়া বই, আর দুটো কেন্দ্রীয় চরিত্রকে ঘিরে। পুরনো বইয়ের দোকান থেকে পাওয়া নাম না জানা একটা মলাটছেঁড়া বই যে তানিমের জীবনের সঙ্গে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাবে, সেটা সে ভাবতেও পারেনি। উপন্যাসে যে ঘটনাগুলো সে পড়ছে, কয়েকদিন বাদে সেগুলোকেই সে ঘটতে দেখছে তার চারপাশে। কখনও সে সেই ঘটনাগুলোকে ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হচ্ছে, কখনও আবার হচ্ছে না। সেই উপন্যাসের মাঝের কিছু পাতা নেই, শেষটাও হারিয়ে গেছে। কিন্তু তানিমকে তো জানতে হবে সেই পরিণতিটা সম্পর্কে। নইলে সবকিছু জেনেশুনেও এই গল্পের ভিক্টিম হয়ে পড়বে সে। 

লাবনী টেলিফিল্মের একটি দৃশ্যে মনোজ

একটা পারফেক্ট ক্রাইম ঘটিয়ে ফেলার হাত থেকে নিজেকে কি বাঁচাতে পারবে তানিম? একদম শেষ অব্দি এই সাসপেন্সটুকু ধরে রাখার জন্য পরিচালক বাড়তি একটা ধন্যবাদ পাবেন। শেষের টুইস্টটা অনেকেই অনুমান করে ফেলতে পারবেন, যদি মন দিয়ে ঘটনাক্রম অনুসরণ করেন। কিন্তু সেই অনুমান মিলে যেতে দেখে বরং অদ্ভুত একটা ভালোলাগা কাজ করে। 

মনোজ প্রামাণিক পছন্দের একজন অভিনেতা। দুই শেডের দুটো রোলে দারুণ উপস্থিতি ছিল তার। নিজের রোলে মুমতাহিনা টয়াও জুতসই। পর্দায় শাহাদাত হোসেনের উপস্থিতি কম, কিন্তু যতক্ষণ ছিলেন, দারুণ করেছেন। বাকিদের অভিনয় কখনও চলার মতো, কখনও আবার বিলো এভারেজ। 

লাবনীর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক সম্ভবত দ্রুতগতির চিত্রনাট্য। একটার পর একটা ঘটনা ঘটে চলেছে, এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে জাম্প করছে গল্প- মনোযোগ দিয়ে না দেখলে অনেক কিছুই মিস করার সম্ভাবনা। দর্শককে ভাবার অবকাশ খুব কমই দিয়েছেন পরিচালক, ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছেন পঁয়ষট্টি মিনিট ধরেই। চাইলে গল্পটাকে আরও মিনিট দশেক হয়তো চওড়া করা যেতো, দেখে অন্তত এমনটাই মনে হয়েছে। তাতে আবার বাড়তি মেদ যুক্ত হবার সম্ভাবনাও ছিল অবশ্য। 

লাবনী টেলিফিল্মের একটি দৃশ্যে টয়া

অ্যান্টিক শপে কলের গানের রেকর্ডে জীবনানন্দের লেখা আট বছর আগে কবিতাটা বাজতে শোনাটা অন্যরকম একটা অনুষঙ্গ যোগ করেছে গোটা টেলিফিল্মে। খনখনে গলার ওই আবৃত্তিটা চমৎকার মানিয়েছে গল্পের সঙ্গে। সাসপেন্স ধরে রাখার জন্য ডার্ক শেডের একটা আলোকসজ্জা বজায় ছিল পুরোটা সময়জুড়ে, কিছু কিছু জায়গায় চড়া আলো থাকলেও বোধহয় খুব একটা ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না, বরং ভালোই লাগতো। 

এরকম দুয়েকটা ছোটখাটো ত্রুটি একপাশে সরিয়ে রাখলে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ঘরানায় লাবনী দুর্দান্ত একটা কাজ। অনেকদিন মনে রাখার মতো একটা প্রোজেক্ট হয়ে থাকবে লাবনী।  ভবিষ্যতে এই ঘরানার কোন শর্টফিল্ম, টেলিফিল্ম বা সিনেমা বানানো হলেও সেটাকে হয়তো লাবনীর সঙ্গেই তুলনা করা হবে। লাবনী তাই বাংলাদেশী সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার কন্টেন্টের লাইনআপে একটা বেঞ্চমার্ক হয়ে থাকবে আরও অনেকদিন...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা