অভিনয়শিল্পীদের দুর্দান্ত অভিনয়, সাহসী সংলাপ এবং আটপৌরে ছিমছাম গল্প...তিন ক্ষেত্রই ঠিকঠাক, দারুণ। কিন্তু তবুও এই ওয়েব কন্টেন্ট নিয়ে শতভাগ প্রশংসা করা গেলো না। আক্ষেপটা সেখানেই। পড়ুন 'লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন' নিয়ে শুভ সরকারের রিভিউ...

'লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন' এর ট্রেলার থেকে স্পষ্ট ছিলো, এই ওয়েব কন্টেন্টে দুর্দান্ত কাস্টিং, নির্মেদ ডায়লগ এবং ছিমছাম গল্প থাকবে মূল ভূমিকায়। ওয়েব সিরিজ দেখার পরও একই কথা প্রযোজ্য। একঝাঁক তারায় ভরা নির্মানে অধিকাংশ তারকাই তাদের চরিত্রের সাথে সুবিচার করছেন। ওয়েব সিরিজের সংলাপগুলো নিয়েই চাইলে আলাদা করে বিস্তর লেখা সম্ভব। কিছু কিছু সংলাপ এতই প্রাসঙ্গিক ও সাহসী, যেগুলো নিয়ে এর আগে কোনো নির্মাতাই কথা বলেননি। ভ্যারাইটিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছিলেন- কর্মজীবী নারীর উপর সমাজের নানাবিধ বৈষম্য ও অবিচারের বিষাদগ্রস্ত এক আখ্যানই দেখাবেন তিনি তার প্রথম ওয়েব সিরিজে। সেটিই তিনি দেখিয়েছেন। সেখানেও আক্ষেপ নেই। চরিত্র, সংলাপ এবং গল্প...তিন ক্ষেত্রই ঠিকঠাক। কিন্তু তবুও এই ওয়েব কন্টেন্ট নিয়ে শতভাগ প্রশংসা করা গেলো না। আক্ষেপ সেখানেই। 

'লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন' মোটা দাগে হতে পারতো গল্পের প্রোটাগনিস্ট 'সাবিলা'র গল্প। সিরিজের প্রথমাংশে 'সাবিলা'র গল্পকে যেভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নির্মাতা, তা অনবদ্য। সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ডিটেইলসকেও তিনি ছাড়েন নি। আমরা ক্রমশ জেনেছি সাবিলা এক কর্মজীবী মহিলা। ঘরে তার বৃদ্ধ বাবা আছেন, যে বাবা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। এ ছাড়া আছে স্বামী। যে স্বামীর একার বেতন সংসার চালানোর জন্যে প্রতুল না। সাবিলা তাই নিজেও চাকরী করেন। নিজের একটা ছোটখাটো ব্যবসা আছে, সেটা সামলান। যাপিত জীবনের নানাবিধ সমস্যায় আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা থেকেও স্বপ্ন দেখেন সচ্ছল এক জীবনের। 

কিন্তু জন লেনন যেমন বলেছিলেন- Life is what happens to you while you’re busy making other plans. তেমনটি ঘটে সাবিলার সাথেও। কর্মক্ষেত্রে একদিন তিনি যৌন হেনস্থার স্বীকার হন। বিচার চাওয়ার জন্যে শুরু হয় তার ক্লান্তিকর যাত্রা। কিন্তু বিচার চাওয়ার এই ভ্রমণপথে সাবিলা গভীর বিস্ময়ে লক্ষ্য করেন, মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই ঘটনার পেছনে তার ভূমিকাকেই করছে মূখ্য। 'পুরুষতন্ত্র' নামক দানবের সাথে সাবিলার এই অসম লড়াইয়ে ক্রমশ মিশতে থাকে ধর্ম-অধর্ম, আস্তিক-নাস্তিক, রাজনীতি-অর্থনীতি, বিশ্বাস-অবিশ্বাস। 

'সাবিলা' নামক চরিত্রের যাপিত গল্প এই ওয়েব সিরিজের উপজীব্য! 

হ্যাঁ, এ গল্প গতানুগতিক। গল্পে চমক আছে, সে দাবী করাও যাবে না। কিন্তু খুব সাদাসিধে গল্পকেও চাইলে নির্মানের জোরে পৌঁছে নিয়ে যাওয়া যায় অন্য উচ্চতায়। যেটা এখানে হয়েছেও৷ কর্মক্ষেত্রে নারীর উপর যৌন নিপীড়নকে কেন্দ্র করে যেভাবে 'সামাজিক' বৃক্ষের শেকড় ও শাখাপ্রশাখা ধরে নাড়া দিয়েছেন ফারুকী, তা প্রশংসার যোগ্য। সমসাময়িক সব বিষয়কে এভাবে এক সুতোয় গেঁথে নিয়ে আসতে যে মুন্সিয়ানা থাকা দরকার, ফারুকীর তা আছে। এবং তিনি তাঁর ক্ষমতার যথার্থ ব্যবহারই করেছেন এখানে।

এভাবে একসুতোয় গাঁথা গল্প যখন নিয়মিত বিরতিতে ডালপালা ছড়াচ্ছে, 'সাবিলা' নামক মানুষটিকে কেন্দ্র করে গল্প নানা আবর্তে ঢুকে পড়ছে, মুগ্ধ হচ্ছিলাম। এবং ভেতরে ভেতরে এই নির্মানকে 'এখন পর্যন্ত দেখা সেরা ওটিটি কন্টেন্ট' বলার জন্যেও প্রস্তুত হচ্ছিলাম। ঠিক তক্ষুনি এক চমক। যে চমক এতটাই অপ্রত্যাশিত, এবং যে চমকের পরবর্তী বিষয়গুলো এতটাই উলটোপথে নিয়ে গেলো মূল গল্পকে, আমি সরে যেতে বাধ্য হলাম আমার প্রাথমিক মুগ্ধতা থেকে। ওয়েব সিরিজের প্রাথমিক 'ড্রামা' জনরা ক্রমশই রূপান্তরিত হলো 'ক্রাইম' জনরায়। সেটাও হয়তো সমস্যা হতো না। সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। 

আমরা যদি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের দুটি অসাধারণ নির্মানের দিকে তাকাই- তাকদীর এবং মহানগর, তারা ঘুরেফিরে 'ক্রাইম থ্রিলার' জনরারই নির্মান৷ এবং নির্মানগুলো সফলও৷ সেই প্যাটার্ন অনুসরন না করে স্বকীয় ভঙ্গিতে শুরু হওয়ায় 'লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন' এর শুরুর 'সামাজিক টানাপোড়েনের গল্প' বেশ আশাবাদী করছিলো। এবং এরকম গল্প বলায় মোস্তফা সর‍য়ার ফারুকী'র মুন্সিয়ানা সর্বজনবিদিত। তিনি নিজের সে শৈলী দেখাচ্ছিলেনও দারুণভাবে। কিন্তু আচমকাই সেখান থেকে হুট করে গল্প যখন 'ক্রাইম থ্রিলার' এর বহুপরিচিত প্যাটার্নে ঢুকে পড়ে, আশাহত হই। পরবর্তীতে সিআইডি'সহ যাবতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধান, ধর-পাকড়, চোর-পুলিশ ডামাডোলে আমাদের প্রাথমিক মুগ্ধতার 'সাবিলা' চরিত্রটি আড়ালে ঢেকে যায়, প্রত্যাশার মুড়িমুড়কিও অনেকটাই মিইয়ে যায় তখন। কাহিনীও ক্রমশ স্বাভাবিক গতি হারিয়ে শ্লথ হতে থাকে। 

ড্রামা দিয়ে শুরু হওয়া গল্প ক্রাইম থ্রিলারে গিয়ে শেষ হওয়ার এই প্যাটার্ন নতুন না। দেশ-বিদেশের অজস্র সিনেমা আছে এই জনরার। কিন্তু সেসব নির্মানে দুই জনরার মধ্যে বেশ সূক্ষ্ম এক ভারসাম্য বজায় রাখা হয়, যাতে এক জনরা আরেকটিকে ছাপিয়ে না যেতে পারে। 'লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন' এ সেই ভারসাম্যে খানিকটা খামতি বেশ ভালোভাবেই লক্ষ্যনীয়। ভারসাম্যের সে অভাবেই উচ্ছ্বাস প্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসে। একটি চরিত্রকে উপজীব্য করে সামাজিক বিষবৃক্ষের মূলোৎপাটনের যে অভিনবত্ব, তা ক্রমশই ফিকে হয়ে আসে খুন-রক্তপাত-আটক-জেরার একঘেয়ে প্যাটার্নে।

এই যে মধ্যবর্তী ছন্দপতন, এটুকুকে উপেক্ষা করে নির্মানটিকে শুরুর সাথে নিটোল সামঞ্জস্যে রাখা গেলে, প্রোটাগনিস্ট সাবিলাকে পুরো নির্মানেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখলে 'সাবিলা'র যাপিত টানাপোড়েনের সাথে দর্শক আত্মিকভাবে আরো বেশি যুক্ত হতে পারতো। 'লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন' আরো খানিকটা গভীরভাবে দাগ কাটতে পারতো ভেতরে। আক্ষেপ সেখানেই। গুণী নির্মাতা ফারুকী যে 'অসাধারনত্ব'র ইঙ্গিত দিয়ে শুরু করেছিলেন এই নির্মানটি, তিনি নিজেই যেন অনেকটা খেয়ালখুশির বশে সরে এসেছেন সে পথ থেকে। 

'লরা' চরিত্রে মুগ্ধ করেছেন মারিয়া নূর! 

ফিরি অন্য প্রসঙ্গে। মুগ্ধ হয়েছি অভিনয়-শিল্পীদের অভিনয়ে। খুবই নির্মেদ, প্রাসঙ্গিক অভিনয়। আফজাল হোসেন, তাসনিয়া ফারিন, মোস্তফা মনোয়ার, মামুনুর রশিদ, পার্থ বড়ুয়া, ইরেশ জাকের দারুণ অভিনয় করেছেন। মারিয়া নূরের অভিনয়ে বিশেষভাবে মুগ্ধ হয়েছি৷ কিছু কিছু দৃশ্যে কোনো কথা না বলেও শুধুমাত্র চোখের ভাষায় বা অবয়বের রূপান্তরে যে পরিণত অভিনয় তিনি দেখিয়েছেন, তা প্রশংসার যোগ্য। তবে সবাইকে ছাপিয়ে মন কেড়েছেন হাসান মাসুদ। অনেকদিন পরে অভিনয়ে ফিরেই প্রথম ওয়েব কন্টেন্টে যে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তিনি দেখালেন, মনে থাকবে বহুদিন। বাকিদের অভিনয় নিয়ে খারাপ বলার সুযোগ মোটেও নেই। এমনকি যারা পাসিং শটও দিলেন, তারাও তাদের অংশে সেরাটাই দিয়েছেন। 

হাসান মাসুদ অভিনয়ে ফিরেই মুগ্ধ করেছেন আবার! 

ক্যামেরার কাজে মুগ্ধ হয়েছি। ফারুকীর কাজের আলাদা একটা গন্ধ আছে, যেটা এই নির্মানেও তীব্রভাবে উপস্থিত। বিদেশি চিত্রগ্রাহক অ্যালেক্সি কসোরুকভ এর ক্যামেরার কারসাজিও ভালো লেগেছে। কালার প্যালেটও সন্তুষ্টির৷ সংলাপের পরিমিতিবোধও মনে রাখার মতন। শুধু ন্যারেশন স্টাইলের এই খামতিটুকুই না থাকলে বর্তে যেতো পুরো কাজ। 

সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলির পারস্পরিক সহাবস্থান, অভিনেতাদের দারুণ শৈলী, কালার স্কিম-সিনেম্যাটোগ্রাফী-ডায়লগের যুগপৎ সহাবস্থানে 'লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন' বেশ ছিমছাম এবং গুরুত্বপূর্ণ এক নির্মান। নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর যে ধরণের কাজগুলো আমরা বিগত সময়গুলোতে দেখেছি, সেগুলোর সাথে তুলনা করলে খানিকটা পার্থক্যও আত্মপ্রকাশিত এই নির্মানে। নিজের চিরপরিচিত ঘরানার পাশাপাশি কিছুটা এক্সপেরিমেন্টাল কাজ যে তিনি এখানে করেছেন, তা স্পষ্টভাবেই লক্ষ্যনীয়। বহুরকম বিভিন্ন-বিচিত্র উপকরণের একীভূত মিশ্রনে রান্না করা এ তরকারির স্বাদ তাই কেমন হলো, তা নির্ধারণ করার গুরুভার পুরোপুরি দর্শকের উপরেই ন্যস্ত। এবং 'লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন' এর মূল আখ্যানের সুর কতটুকু ধারণ করতে পারলো দর্শক, আগ্রহ থাকলো সেখানেও। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা