'টাইম পাস কন্টেন্ট' হিসেবে এই নির্মাণকে অনায়াসে গ্রহণ করা যাবে। ছিমছাম ন্যারেশনের এই নাটকের ব্যাপ্তি আরেকটু দীর্ঘ হলে, গল্পের ক্রমবিন্যাসে আরেকটু মালমশলা যুক্ত হলে... এই গল্পই হয়তো হয়ে উঠতো দারুণ কিছু...

ভিড়ভাট্টার এক বাস, যাচ্ছে ঢাকা থেকে বেশ দূরের এক গন্তব্যে। বাসের যাত্রীদের কারো হাতে বই। কেউ নিজের বাচ্চা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন৷ কেউ আবার কথার ঝাঁপি খুলে দিয়েছেন সহযাত্রীর সাথে। ঘটনাপ্রসঙ্গে জানা যায়, এ বাসের এক যাত্রীর নাম গফুর। যিনি তিন বছর টাকা জমিয়ে স্ত্রী'র জন্যে কিনেছেন এক লাল কাতান শাড়ি, যে শাড়ি নিয়ে তিনি ফিরছেন বাড়িতে। বাসের আচমকা, হুটহাট ঝাঁকুনিতেও পরম সাবধানে সবেধন নীলমনির মতন আগলে রাখছেন শাড়ির সে ব্যাগটিকে। 

সবেধন নীলমনি সে লাল কাতান! 

নিস্তরঙ্গ যাত্রাপথে হঠাৎ আসে উটকো বিপদ। বাসে ঢুকে পড়ে কুখ্যাত এক ডাকাত। নীলাঞ্জন ওরফে 'নীল ডাকাত।' লাল চোখ, গালে কাটা দাগ, কোমরে গামছা, হাতে আদ্যিকালের পিস্তল...ভয়ালদর্শন অবয়বের এ ডাকাত বাসের সবাইকে জিম্মি করে হাতিয়ে নিতে থাকেন যাবতীয় গয়নাগাটি, টাকাকড়ি। সবার নানাবিধ সঞ্চয় আত্মসাৎ এর এক পর্যায়ে নীল ডাকাতের চোখ পড়ে গফুরের কষ্টার্জিত লাল কাতান শাড়ির দিকে। নীল ডাকাত শাড়িটি কেড়ে নিতে চান, ওদিকে গফুরও একরোখা। প্রাণ যায় যাক, তবু এ শাড়ি সে হাতছাড়া করবে না। ঠিক এরপরেই গল্প মোড় নেয় অন্যদিকে।

লেখক নাজিম-ঊদ-দৌলা'র 'লাল কাতান নীল ডাকাত' গল্পটি খুব চমকপ্রদ, এমনটি বলা যাবে না। বরং বলা ভালো, খানিকটা গতানুগতিক গল্পই এটি। তবে এই গতানুগতিক গল্পের শেষেও ছোটখাটো চমক দিয়েছেন লেখক। সে চমক যদি কেউ আগে থেকে আঁচ করতে পারেন, তাহলে তো হলোই। তবে আগে থেকে ধরতে না পারলে, এই চমকের গুণে হলেও গল্প খানিকটা ভালো লেগে যেতে পারে অনেকের। তাছাড়া, গল্পের এক্সিকিউশনও বেশ ভালো। ভিকি জাহেদের নির্মাণ বরাবরই বেশ ছিমছাম হয়। বেশ পরিচ্ছন্ন এক আবহ তৈরী করে তিনি গল্প বলতে পছন্দ করেন, তার নির্মাণগুলোও সেটির সাক্ষ্য দেয়। সেদিক বিবেচনাতেও এ নির্মাণ উতরে যায়। মানবিক এক গল্পের মধ্যে কিছু সারকাজম, মেটাফোর, হিউমার ব্লেন্ড করার চেষ্টাও করেছেন পরিচালক। বেখাপ্পা লাগেনা সেগুলোও।

কিন্তু এতসব ভালোর পরেও নাটকের দৈর্ঘ্য নিয়ে খানিকটা অসন্তুষ্টি থেকেই যায়। যদিও খুব বড় ক্যানভাসের গল্প নয় এটি, তবুও কিছু জিনিস, কিছু চরিত্র স্টাবলিশ করার দায় নির্মাতার ছিলো। যেগুলো প্রতিস্থাপনের অভাবে মাত্র তেইশ মিনিটের এই নাটকে অনেককিছুই অযাচিতভাবে চলে আসে। ঘটনার টানাপোড়েন, দৃশ্য-পরম্পরার সাথে দর্শক তাই একাত্ম হতে গিয়েও, কোথাও গিয়ে যেন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। ফলশ্রুতিতে, অন্তিম পরিণতিতে পৌঁছে দর্শক তাই নির্মাণের মূল সুরের সাথে যুক্ত হতে পারেন না। আক্ষেপ সেখানেই। 

নাসির উদ্দিন খান অভিনয়ে মুগ্ধ করেই চলেছেন! 

বাদবাকি সবকিছু ভালো। অভিনেতাদের অভিনয় ভালো। মনোজ প্রামাণিক, নাসির উদ্দিন ভালো অভিনয় করেছেন। নাসির উদ্দিনের কথা আলাদাভাবে বলা উচিত। ন ডরাই, কিস অব জুডাস, মহানগর... নাসির উদ্দিন খান পর্দায় থাকা মানেই কিছু না কিছু ফান রিলিফ। এই অভিনেতা দিন দিন মুগ্ধ করছেন। বলতে বাধো বাধো ঠেকলেও বলে ফেলা ভালো, শক্তিমান অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবুকে কেন যেন ঠিকঠাকভাবে এখানে ব্যবহার করতে পারেন নি নির্মাতা। 'নীল ডাকাত' চরিত্রে তার অভিনয় যতটুকু ভীতি, ত্রাস সঞ্চার করবে বলে দর্শক আশা করতে পারে, ততটুকু ঠিকঠাক পর্দায় আসে নি। কিছু ক্ষেত্রে খানিকটা অতি-অভিনয়ও মনে হয়েছে।  যেটা খুবই আশ্চর্যজনক। আদি ও অকৃত্রিম 'ফজলুর রহমান বাবু'কে বারবার খুঁজেছি পর্দায়, পুরোটা পাইনি। 

'নীল ডাকাত' এর কাছ থেকে প্রত্যাশা বেশি ছিলো!

সবমিলিয়ে 'টাইম পাস কন্টেন্ট' হিসেবে এই নির্মাণকে অনায়াসে গ্রহণ করা যাবে। ছিমছাম নির্মাণের এই নাটকের ব্যপ্তি আরেকটু দীর্ঘ হলে, গল্পের ক্রমবিন্যাসে আরেকটু মালমশলা যুক্ত হলে... এই গল্পই হয়তো হয়ে উঠতো দারুণ কিছু। যেহেতু তা হয়নি, তাই এই নির্মাণ দেখার সময়ে মাথায় রাখতে হবে, চিন্তা-উদ্রেগ করার মতন অনুষঙ্গের উপস্থিতি এখানে অপ্রতুল। ভেতরে ক্ষত সৃষ্টি করার মতন কোনো চরিত্রও সেভাবে নেই এখানে। তাই নির্মাণ-জনিত প্রত্যাশার ফানুশ কে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখাই হবে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা