'আরআরআর' কিংবা 'কেজিএফ' এর মতই আলোচনা হচ্ছিলো 'লাল সিং চাড্ডা'কে নিয়ে। ফরেস্ট গাম্পের রিমেক, আমির খানকে নিয়ে কন্ট্রোভার্সি, বয়কট ক্যাম্পেইন- সব মিলিয়ে এই সিনেমা মুক্তির আগের পুরোটা সময়ে ময়দানও রেখেছিলো গরম। কিন্তু তবুও লাভ হয়নি। 'লাল সিং চাড্ডা'র বক্স অফিসে হয়েছে তুমুল ভরাডুবি। কিন্তু কেন? 'লাল সিং চাড্ডা'র এমন ব্যর্থতার কারণই বা কী?

রাজামৌলির 'আরআরআর', প্রশান্ত নীলের 'কেজিএফ' এর মতই শোরগোল ফেলে দিয়েছিলো আমির খানের 'লাল সিং চাড্ডা।' ফরেস্ট গাম্পের রিমেক, আমির খানকে নিয়ে কন্ট্রোভার্সি, বয়কট ক্যাম্পেইন... সব মিলিয়ে এই সিনেমা মুক্তির আগের পুরোটা সময়ে ময়দানও রেখেছিলো গরম। যদিও, শেষপর্যন্ত আখেরে তাতে লাভ হয়নি। 'লাল সিং চাড্ডা' বক্স অফিসে শোচনীয় পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মুখোমুখি করেছে অন্য বাস্তবতারও। যে বাস্তবতার মোদ্দাকথা- অনলাইন ক্যাম্পেইনের জেরে জেরবার করা যায় যে কোনো সিনেমার বাস্তব ফলাফলকেও। সুতরাং, যদি কেউ মনে করে থাকেন, 'লাল সিং চাড্ডা' ব্যর্থ হয়েছে সিনেমা ভালো না হওয়ার কারণে, তাহলে খানিকটা ভুলই ভাবছেন তারা। এ সিনেমার বিপর্যয়ের পেছনে অনেকগুলো কারণ৷ অনেক চলকের লুকোচুরি। পাশাপাশি বলিউডের প্রচণ্ড কনফিউজিং সিনারিওর খানিকটা গ্লিম্পসও।

'লাল সিং চাড্ডা' মুক্তির আগে আগে আমির খানের বিগত কিছু সিনেমার চুম্বক-দৃশ্য টেনে এনে কন্ট্রোভার্সি তৈরী করা, তাকে 'অ্যান্টি-ন্যাশনাল' আখ্যা দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্যাম্পেইন করা, বিভিন্ন সময়ে আমির খানের দেয়া ন্যাশনাল ইস্যু-রিলেটেড স্টেটমেন্টকে মিম বানিয়ে ছড়িয়ে দেয়া, হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইন চালু করা, মানুষকে সিনেমা না দেখতে বলা... ওয়েল আর্টিকুলেটেড এ ক্যাম্পেইন মূলত মহামারীর মতই ছড়িয়ে পড়েছে বলিউডে। বিগ বাজেটের কোনো সিনেমাকে ডাউন করতে চাইলে মুক্তির আগে সে সিনেমার কোনো দিক নিয়ে কন্ট্রোভার্সি তৈরী করা, সে সিনেমার কোনো তারকার সাথে রিলিজিয়াস বা সোশিও-পলিটিক্যাল ডটস জুড়ে দিয়ে বিতর্ক উসকে দেয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো... 'লাল সিং চাড্ডা'র সাথে যেটা হয়েছে, একই সময়ে মুক্তি পাওয়া 'রক্ষা বন্ধন' এর ক্ষেত্রে হয়েছে তা। ধারণা করা যায়, বলিউডের সামনের দিনগুলোতেও এই মারাত্মক অস্ত্র বরাবরই থাকবে সরব।

যদিও 'লাল সিং চাড্ডা'র পতনের পেছনে এই ক্যাম্পেইন অনেক বড় একটা কারণ, তাও এই কারণই যে একমাত্র পালের গোদা, তাও বলা যায় না। অনলাইনে বিদ্বেষ ছড়ালেই যে মানুষ সিনেমা থেকে দূরে থাকবে, এমনটা হয় খুব কম ক্ষেত্রেই। তবে, সিনারিওটা যদি এমন হয়, অনলাইন হেট্রেড এর পাশাপাশি সিনেমাও তথৈবচ, একমাত্র সেক্ষেত্রেই ইমপ্যাক্টটা হয় জোরদার, সিনেমা'কে ডাউন করার মিশনও তখনই সাকসেসফুল করা যায়। যেটা হয়েছে 'লাল সিং চাড্ডা'র ক্ষেত্রে। এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে অর্গানাইজড 'বয়কট ক্যাম্পেইন' যেমন চলেছে, পাশাপাশি সাধারণ দর্শককে স্যাটিসফাই করতেও ব্যর্থ হয়েছে 'লাল সিং চাড্ডা।' যেটার শুরুটা ট্রেলারের পর থেকেই। 

ট্রেলারের পর থেকেই শুরু হয় সমালোচনা 

এটুকু সবারই জানা, যেকোনো সিনেমার ইনিশিয়াল হাইপ জেনারেট করতে ট্রেলার বরাবরই থাকে ফ্রন্টলাইনে। এবং প্রাথমিক সে হাইপ তৈরীতেই খুব শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয় 'লাল সিং চাড্ডা।' ট্রেলারে আমির খানের ওভার-ড্রামাটিক অভিনয় আর টেকনিক্যাল নানা বিষয় নিয়ে সমালোচনা-ট্রল হয় বেশুমার। পাশাপাশি চলতে থাকা 'হেট ক্যাম্পেইন'ও ক্রমশ হয় জোরদার। যেসবের মিলিত ফলাফলে- সিনেমা মুক্তির প্রথম সপ্তাহে প্রেক্ষাগৃহের অর্ধেক আসন খালি৷ একের পর এক হলের শো ক্যান্সেল হওয়া। বক্স-অফিসে হোঁচট। এ সিনেমা নিয়ে আলোচনা হুট করেই যেন বন্ধ হয়ে যায় সিনেমা মুক্তির অব্যবহিত পরে। যেন বিপক্ষ দলের প্রোপাগান্ডা মেনেই ফুরিয়ে যায় সিনেমা-কেন্দ্রিক সমস্ত আয়োজন!

প্যান্ডেমিকের পর থেকে বলিউডের অবস্থা এমনিতেই শোচনীয়। এ বছরেও হাতেগোনা কয়েকটা সিনেমা ছাড়া অধিকাংশ সিনেমাই হয়েছে ফ্লপ। ব্যতিক্রম ছিলো যারা, তাদের মধ্যে অন্যতম- ভুল ভুলাইয়া টু। এ সিনেমা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে দেখা গেলো- সিনেমার ট্রেলারে তারা দিয়েছিলো বিশেষ নজর। ট্রেলারের স্পেশাল কাট করা হয়েছিলো, সে কাটের পরে কম্প্যাক্ট এডিট করে এরপর ট্রেলার ছাড়া হয়েছিলো অনলাইনে। ফলাফল- ট্রেলারের কারণেই ওয়ার্ড অফ মাউথ ছড়িয়েছে। হাইপ উঠেছে৷ গানগুলোতেও এক্সট্রা এফোর্ট দেয়া হয়েছে। ক্যাম্পেইনও ছিলো জোরদার। আল্টিমেটলি, অডিয়েন্স হলে এসেছে। সিনেমাও অডিয়েন্সকে স্যাটিসফাই করেছে। ফলাফল- বক্স অফিসে 'হিট' ভারডিক্ট। অর্থাৎ, পরিষ্কার এটাই, ট্রেলারের অভিনবত্বে দর্শককে হুক করা, গান নিয়ে স্পেশাল প্রমোশন করে হাইপ তৈরী করা... সিনেমা মুক্তির আগে এই গ্রাউন্ড ওয়ার্কগুলো বেশ ভালোভাবেই করেছে 'ভুল ভুলাইয়া টু।' এবং, বলাই বাহুল্য, এখানটাতেই পিছিয়ে পড়েছিলো 'লাল সিং চাড্ডা।' যদিও 'লাল সিং চাড্ডা'র গানগুলো ভালো ছিলো। কিন্তু ট্রেলারের ক্রিটিসিজম আর নেগেটিভ প্রমোশনে জেরবার সিনেমার ইমেজকে রি-কনস্ট্রাক্ট করবে, এতটাও জবরদস্ত ছিলোনা তারা। 

প্রমোশনে চমক দেখিয়েছিলো 'ভুল ভুলাইয়া টু' 

'নেগেটিভ প্রমোশন' বলতে গেলে আরেকটা বিষয় চলে আসে। খুব বেশিদিন আগের কথা না, কোনো সিনেমা নিয়ে 'নেগেটিভ প্রমোশন' কিংবা 'হেট স্পিচ' ছড়ালে সে সিনেমা বক্স অফিস কাঁপাতো। যার স্বপক্ষে উজ্বল উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- 'পদ্মাবত' এর কথা। 'পদ্মাবত' মুক্তির আগে সঞ্জয় লীলা বানসালীর উপরে আক্রমণ, কন্ট্রোভার্সি, হুমকিধামকি, সিনেমার নাম পালটানো... বহু কিছু হয়েছে। এবং এসব টপকে সিনেমা যখন মুক্তি পেয়েছে, সিনেমাটা হয়েছে বানসালীর ব্যবসাসফল সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম। সবমিলিয়ে আয় হয়েছে ৫৭০ কোটি রূপিও! ক'দিন আগে মুক্তি পাওয়া 'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি' নিয়েও ছড়ানো হয়েছে হেট স্পিচ। যদিও সিনেমা ভালো হওয়াতে এসব ক্যাম্পেইন সিনেমার ফেভারেই এসেছে। অর্থাৎ, এও দ্রষ্টব্য, কন্টেন্ট ভালো হলে, প্রোপাগাণ্ডা কিংবা হেট স্পিচ সিনেমার পক্ষেই আসে বরাবর। 'লাল সিং চাড্ডা' পিছিয়ে পড়ে এখানটাতে এসেও।

অর্থাৎ স্পষ্ট এটুকুই, 'লাল সিং চাড্ডা'র মানগত দূর্বলতা, নেগেটিভ প্রমোশনের সাথে মিশেই মূলত ইমপ্যাক্ট ফেলেছে সিনেমাহলে। তবে গুণগত দূর্বলতার সবটুকু জুড়েই যে আমির খান, মোটাদাগে এটাও বলা যায় না। বরং বলা যেতে পারে, সিনেমার গোটা স্ট্রাকচারেই সমস্যা। প্রথমত- 'ফরেস্ট গাম্প' এর রিমেক বিষয়টাতেই কেউ সেরকম আগ্রহী ছিলো না। দ্বিতীয়ত, স্টার-ড্রিভেন মুভি স্ট্রাকচার বলিউডে এখন অনেকটাই অচল। সাউথ ইন্ডিয়ার কোনো একজন তারকার যে স্টারডম, তার ছিঁটেফোঁটাও যে এখন বলিউডি স্টারদের নেই, তা সর্বজনবিদিত। ফলে, একজন স্টারের কাঁধে সওয়ার হয়ে যে কোনো এক হিন্দি সিনেমা বক্স-অফিসের বৈতরণী পার হবে, এটাও খানিকটা দুরূহ কাজ। তৃতীয়ত- অতি অভিনয়। চতুর্থত, গল্পের ডটসগুলো কানেক্ট না করা। এবং এই চার দূর্বলতার ফলাফলে অডিয়েন্সের 'সেন্টার অব অ্যাট্রাকশন' হারানো৷ সাথে প্রোপাগাণ্ডার মকশো তো আছেই! 

'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি'ও তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিলো

চার বছর পরে আমির খানের সিনেমা, যে সিনেমা নিয়ে আমির খানের স্ট্রাগল চৌদ্দ বছরের... এ সিনেমা এমনভাবে হতাশ করবে, তা আশা করেনি কেউই। কিন্তু তা হয়েছে। বলিউডের 'খান'দের 'খান'দানি পতন হয়েছে৷ অক্ষয় কুমারের মত তুমুল জনপ্রিয় অভিনেতার ইমেজও এখন মলিন৷ কমার্শিয়াল সিনেমাগুলো চলছে না। তারকা-নির্ভর কন্টেন্ট মেয়াদোত্তীর্ণ। বলিউড যেসব ক্ষেত্রে ছিলো অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেসব ক্ষেত্রেই এখন তাদেরকে টেক্কা দিচ্ছে বাকিরা। যে বলিউডই ছিলো ভারতীয় সিনেমার অবিসংবাদিত মোড়ল, সেই বলিউড এখন যেভাবে মূদ্রার উল্টোপিঠে ন্যুব্জ, তাতে খানিকটা সহানুভূতিই জাগে। যদিও কারোরই ঠিক জানা নেই, বলিউডের এ ক্রাইসিস কতদিন চলবে। তবে আশা এটাই, শীঘ্রই কাটুক এ অচলায়তন। যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েই ফিরুক তারা। ইন্ডিয়ান মুভির হেলদি কম্পিটিশনের জন্যে হলেও তাদের স্বগর্বে ফিরে আসাটা জরুরি।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা