লাল এর জার্নিতে দাঙ্গা আছে, ইন্দিরা গান্ধীর আকস্মিক হত্যা আছে, কার্গিল যুদ্ধ আছে, ব্রাণ্ড 'রূপা'র আত্মপ্রকাশের গল্প আছে, গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড এর সাথে আন্ডারওয়ার্ল্ড এর সংযোগের আখ্যান আছে, আছে স্বচ্ছ ভারত অভিযানের দেয়াল-লিখনও। সে সাথে আছে দু'হাত প্রসারিত করা এক নায়কের নস্টালজিয়া। প্রেমের সুলুকসন্ধান। মূলত, ভারতের টাইমলাইনে এই আখ্যানের অবয়টাই এ সিনেমার প্রধান প্রাপ্তি...

কালজয়ী কোনো সিনেমার রিমেক বানানো বরাবরই একটা রিস্কি গেম। অনেকটা রাশিয়ান রুলেতের সামনে থরহরি কম্প হয়ে বসে থাকার মতন। কারণ, সেখানে যুক্তির বাইরেও আবেগ মেশে বিস্তর। আর, 'আবেগ' বস্তুটি যে যুক্তি-তর্কের মত বিষয়গুলোর জন্যে প্রচণ্ড হানিকারক, সর্বজনবিদিত সেটিও। এবং, সেটা বিবেচনায় বলা যায়, মাস্টারপিস 'ফরেস্ট গাম্প' এর রিমেক করতে গিয়ে 'লাল সিং চাড্ডা' সংশ্লিষ্ট মানুষেরা বেশ বড়সড় এক বাজিই ধরেছিলেন। তবে 'জেতা প্রায় অসম্ভব' এই বাজিতেও চাইলে তারা খানিকটা ভালো করতে পারতেন, যদি 'সিনেমা' নামক গল্পের শব্দগুলো ঠিকঠাক জোড়া হতো, আমির খান অভিনয়ে আরেকটু পরিমিতিবোধ দেখাতেন, এবং, আমির খান ও 'লাল সিং চাড্ডা'কে নিয়ে বেশুমার প্রোপাগান্ডা চালানো না হতো। এবং, আক্ষেপ এখানেই- গল্পের শব্দগুলো ঠিকঠাক বসেনি, আমির খানের অভিনয়ও থাকেনি স্থির, কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে 'হিন্দুপন্থী' এক্সট্রিমিস্টরা প্রোপ্রাগান্ডা চালিয়েছেও বিস্তর। ফলাফল- 'লাল সিং চাড্ডা' পপাত ধরণীতল। 

বিগত কিছু বছরে যেসব টিপিক্যাল বলিউডি সিনেমা দেখার সুযোগ হয়েছে, সেসবের সাপেক্ষে 'লাল সিং চাড্ডা'কে বেশ খানিকটা এগিয়েই রাখবো। এর পেছনে বড় কারণ- প্রোটাগনিস্টের জার্নি। আলাবামা'র ফরেস্ট গাম্প হোক কিংবা পাঠানকোটের লাল সিং চাড্ডা, এলভিস প্রিসলি কিংবা শাহরুখ খান, চকলেট বা গোলগাপ্পা... পলিটিক্যাল টাইমলাইনে 'লাল' এর এই উদ্ভ্রান্ত জীবন চোখের শান্তি তো বটেই, মনেরও শান্তি। পাশাপাশি, 'রূপা ডি'সুজা'র ছন্নছাড়া জীবন, লালের সাথে বালারাজু কিংবা মোহাম্মদ পাজি'র সাময়িক সঙ্গ... মন্দ লাগেনি সেসবও। যদিও 'রূপা' বাদে বাকি চরিত্রগুলোকে 'আন্ডারকুকড' মনে হয়েছে, কিছুক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে, তাড়াহুড়োও ছিলো, ছিলো শ্লথ হয়ে যাওয়াও৷ তবে, এসব সত্বেও 'লাল সিং চাড্ডা'র জার্নির আপেক্ষিকতা ও অভিনবত্বই মূলত গোটা পথকে রেখেছে সজীব।

লাল সিং চাড্ডার জার্নিটুকুই এই সিনেমার এক্স ফ্যাক্টর! 

আমরা ফরেস্ট গাম্পের যে জার্নি দেখেছি সিনেমার পর্দায়, যেসব ঘটনা ঘটতে দেখেছি পরপর, ইতিহাসের যেসব গলিঘুঁজির আরোপিত দৃশ্যায়নের সাক্ষী হয়েছি, তা অনেকটা সেকেলে। সে সাপেক্ষে, 'লাল' এর জার্নিটা অনেকটাই সেদিনকার। সেখানে ইন্দিরা গান্ধীর আকস্মিক হত্যা আছে, কার্গিল যুদ্ধ আছে, ব্রাণ্ড 'রূপা'র আত্মপ্রকাশের গল্প আছে, গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড এর সাথে আন্ডারওয়ার্ল্ড এর সংযোগের আখ্যান আছে, আছে স্বচ্ছ ভারত অভিযানের দেয়াল-লিখনও। সে সাথে আছে দু'হাত প্রসারিত করা এক নায়কের নস্টালজিয়া। প্রেমের সুলুকসন্ধান। মূলত, ভারতের টাইমলাইনে এই জার্নির চকমকে অবয়টাই এ সিনেমার প্রধান প্রাপ্তি। 

এ কথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই, অতুল কুলকার্নির লেখা কিংবা আদভাইত চন্দনের ডিরেকশনের অনেকটুকুতেই হস্তক্ষেপ ও লাল কালির আঁকিবুঁকি করেছেন 'লাল' ওরফে আমির। এবং, সেটুকু যদি তিনি না করতেন, গল্পের গোলকধাঁধাতেই যদি সঁপে দিতেন নিজেকে, বোধহয় ভালো হতো সেটিই। যদিও, সেটা হয়নি। এবং সেটুকুই গল্পের পিছুটান। বাদবাকিটুকু প্রাঞ্জল। মুখরোচক। অনেকটা গোলগাপ্পার মতই। উপরটা মুচমুচে। ভেতরে তেঁতুল জল। টক। ঝাল। এবং, যদিও রিমেক, তবুও এ সিনেমা পুরোপুরিই আঞ্চলিক, ভারতীয়। ভারতের জল-বায়ু-কাদা'কে ভেবেই লেখা। এটা তো ঠিক, প্রত্যেক ভূখণ্ডেরই বলার মত গল্প থাকে, থাকে ইতিহাসের লাল-নীল চিরকুটও। মূলত, 'লাল সিং চাড্ডা' সেই চিরকুটই প্রকাশ করে 'ফরেস্ট গাম্প' এর মলাটে। হ্যাঁ, প্রকাশভঙ্গীতে আরোপিত আবহ আছে। কিন্তু, বিষয়বস্তু? একদম দেশি! স্বকীয়। 

রসায়নগুলো জমতে গিয়েও খেই হারিয়েছে বারবার

তবে, এই স্বকীয়তার সৌকর্য বেমালুম উবে যায় আমির খানের অভিনয়ে। যারা 'ফরেস্ট গাম্প' সিনেমাকে ভালোবাসেন, তারা মূলত টম হ্যাঙ্কসের সারল্যে মুগ্ধ হয়েই এ সিনেমাকে ভালোবাসেন৷ ভেতরে অজস্র লেয়ার থাকলেও, সারল্য আর ভালোবাসাই এই সিনেমার এক্স ফ্যাক্টর। মোটা দাগে, এই সারল্যে বুঁদ হয়েই 'ফরেস্ট গাম্প' নিয়ে এত আলোচনা। এ সিনেমার অমরত্বের এটাই রেসিপি। এবং, এই রেসিপিই 'লাল সিং চাড্ডা'য় অনুপস্থিত। প্রকটভাবে অনুপস্থিত। 

তবে 'সারল্য' নিয়েও এত কচকচানি হতোনা, হয়তো আমরা ভেবেই নিতাম- ফরেস্টের ভারতীয় দোসর 'লাল' বোধহয় এতটাও সরল না, হয়তো আমরা আমির খানের যান্ত্রিক অভিনয়কেও মেনে নিতাম, যদি না 'শিশু লাল সিং চাড্ডা' চরিত্রে অভিনয় করা অভিনয়শিল্পী সারল্যের খুব দারুণ এক বেঞ্চমার্ক সেট করে দিতেন!  অবাক বিস্ময়, অপাপবিদ্ধ দৃষ্টি আর ঈষৎ শ্লথ আচরণে 'লাল' চরিত্রে 'আহমেদ ইবনে উমর' অভিনয়ের যে বেঞ্চমার্ক সেট করে গিয়েছেন, শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সত্যি এটাই- আমির খান সে বেঞ্চমার্ক টপকাতে পারেননি। সারল্যের সরলরেখাতেই হারিয়েছেন পথ। হয়েছেন বিপথের পথিক। তার চরিত্রের ডিমান্ড ছিলো এটুকুই- ইনোনেন্স। কিন্তু অদ্ভুতুড়ে মুখাবয়ব আর ক্লিশে অভিনয়ে অধিকাংশ জায়গাতেই সেটুকু যেভাবে অ্যাবসেন্স হয়েছে, ক্রমশ দীর্ঘশ্বাসই দীর্ঘ হয়েছে। পাশাপাশি, ভিএফএক্সের কারিকুরিতে বয়স কমানোর যে প্রয়াস, অসফল তাও, কৃত্রিমও। যেখানে সিনেমার অনেকটুকুই আমিরের হাতে, সেখানে এরকম অতি-অভিনয়ই মূলত সিনেমাকে আটকে দিয়েছে পাহাড়ের খাঁজে। উড়তে দেয়নি সে পালকটিকেও, যে পালককে দেখা গিয়েছিলো সিনেমার একেবারে শুরুতে।  

'লাল সিং চাড্ডা'র শুরুটা যেভাবে, যেভাবে 'শ্বেতশুভ্র পালক' আর 'লাল সিং চাড্ডা'র জীবনের সমান্তরালে গল্পের শুরু, যেখানে সিনেমা নিয়ে লড়াইটা বহুদিনের, যেখানে প্রতিক্রিয়াশীল মহলকে সিনেমার বরাতেই একহাত দেখে নেয়ার কথা, সেখানে যদি আসরের মধ্যমণিই হন কুপোকাত, হন ভরা মাঠে ধরাশায়ী, সেখানে বাকি কথা অর্থহীন৷ এবং, সে কারণেই এ সিনেমা অনেকটা হয়ে দাঁড়ায় সে উপন্যাসের মত, যে উপন্যাসের প্রত্যেকটা অধ্যায় সুন্দর, কিন্তু সবগুলো অধ্যায় মিলে যে গল্প, সে গল্প কোথাও গিয়ে জোড়া লাগেনা, দাগ কাটেনা। যে কারণে, 'ফরেস্ট গাম্প' এর সেই অদ্ভুত যাত্রাপথ মনে থাকলেও, টম হ্যাঙ্কসের অভিনয় দেখে অভিনয়ের মাত্রাজ্ঞান ভুলে গেলেও, 'লাল সিং চাড্ডা' দেখে বারবারই মনে হয়, আমির খান,আমির খান হয়েই আছেন। 'লাল'  হতে পারছেন না। মূলত, এই জায়গায় এসেই সিনেমা আটকে পড়ে সেখানে, যেখানে যুক্তির পাঁচিল টপকে আবেগ ঢোকে ব্যক্তিগত ত্রিসীমানায়। 

আমির খান হতাশ করেছেন বিস্তর

এটুকু আমরা জানি, যেখানে অভিনয়, সময়ের তালজ্ঞান নিয়ে ছেলেখেলা করতে পারেনা,  ঘোচাতে পারেনা ক্যামেরা আর হৃদয়ের ব্যবধান, করতে পারেনা স্থাণু, সে সিনেমা আর যাই হোক, সিনেমার গন্ডি ভেদ করে জীবনে ঢোকার আস্কারা পায় না। পায় না অমরত্বের আশ্বাস। মূলত সেখানেই পিছিয়ে পড়ে 'লাল সিং চাড্ডা। এখানেই  তার পরাজয়! ঠিক এই জংশনে এসেই রেসে এগিয়ে যায় আলাবামার ফরেস্ট গাম্প! চলে যায় নাগালের বাইরে। ক্রমশ। ক্রমশ। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা