তিনি নিজেই নিজের জীবন-সুর'কে 'মেসড আপ' করেছেন। আবার হেসে হেসে নিজেই নিজের ব্যর্থতাকে প্রচার করেছেন। আমরা বলছি, লাকি অনেককিছুই হতে পারতেন। আবার এটাও হয়তো ঠিক, লাকি নিজেই চেয়েছিলেন এরকম বোহেমিয়ান এক বাউন্ডুলে জীবন...

পৃথিবীতে কালে কালে, যুগে যুগে, ক্রিয়েটিভ আর্টিস্টরা নানারকম আর্ট ফর্ম নির্মাণ করে হকচকিয়ে দিয়েছে মর্ত্যের জনসাধারণকে।কিছু কিছু নির্মাণ এমন হয়েছে- কালের মর্মরধ্বনি উপেক্ষা করে এরা টিকে গিয়েছে সময়ের সর্পিল সব হাইওয়েতে। এদেরকেই কালজয়ী নির্মাণ বলে, মাস্টারপিস বলে। ধরা যেতে পারে- সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী'র কথা। ডেভিড অ্যাটেনব্যারোর 'প্লানেট আর্থ' টিভি শো এর কথা। স্ট্যানলি কুবরিকের '২০০১ঃ আ স্পেস অডিসি' সিনেমার কথা৷ এসব নির্মান আজও জ্বাজ্জল্যমান, দীর্ঘস্থায়ী, এত এত বছর পরে এসেও এরা এখনও স্বমহিমায় দীপ্যমান। নির্মাতার চমৎকারিত্ব ও নির্মাণের সৌকর্য এখানে। 

এই জাতিস্মর-নির্মাণের তালিকায় অনায়াসে রাখা যায় লাকী আলীর 'ও সনম' গানটিকেও। আমরা যারা নব্বই এর দশকে জন্মেছি, আমাদের শৈশবে সঙ্গ দিয়েছে ফিতের ক্যাসেট, টেপ-রেকর্ডার৷ ভিসিডি'র যুগ ততদিনে শুরু হলেও মধ্যবিত্ত আমাদের সাধ্যের বাইরে তা। কৈশোরে উঠতে না উঠতে একদিন আবিষ্কার করি ছিপছিপে এই গান। না, কথার মধ্যে উপমার ফুলঝুড়ি মোটেও নেই। কথাগুলো গড়পড়তাই। কিন্তু সুরের মধ্যে কী যেন একটা আছে। একটা হাহাকার৷ একটা সূচিভেদ্য আর্তনাদ৷ আমরা, নাকের নীচে সদ্য গোঁফের রেখায় চমকিত হয়ে যারা 'প্রেম' নামক অপার্থিব বিষয়টির সাথে ক্রমশ পরিচিত হচ্ছি, আমাদের জন্যে এ গান অনেকটা 'ভস্মে ঘি ঢালা' নামক বাগধারারই সার্থক রূপায়ণ ঘটিয়ে গেলো। 

লাকি আলীর প্রথম অ্যালবাম 'সুনো' থেকে নেয়া এই গানটি নির্মাণের পরেই উপমহাদেশকে গ্রাস করে পঙ্গপালের মত। টানা বহুবছর ধরে এশিয়াজুড়ে মাতামাতি করে গানটি। এরপর সময়ের ফেরে, নানা কিছুর ভীড়ে আমরা ভুলেও গিয়েছিলাম গানটিকে। তবুও মাঝেমধ্যে প্লেলিস্টে র‍্যান্ডমভাবে গানটি বেজে উঠলে, আমরা চমকে উঠতাম। এই গান যেন হুট করেই নিয়ে যেতো শৈশবের একেকটা পেলব গলিতে। 

বোহেমিয়ান জীবনযাপন করা লাকি আলীর 'ও সনম' তৈরীর গল্পটাও অদ্ভুত৷ ১৯৯৫ সালে এই গান সৃষ্টি হওয়ার সময়কার ভারতের শিল্পসংস্কৃতির প্রেক্ষাপট বোঝাটাও খুব জরুরি। যারা হিন্দি সিনেমার সচেতন দর্শক, তারা একমত হবেন, নব্বই এর দশকে ভারতীয় সিনেমায় ঘটেছে একের পর এক বিপ্লব। পেক্ষাগৃহগুলোতে নিয়মিত অসাধারণ সব সিনেমা আসতো। এসব সিনেমার গল্প- গান-অভিনয় বুঁদ করে রাখতো দর্শককে।  গানের ক্ষেত্রে অলিখিত নিয়ম হয়েই দাঁড়ায় এমন, ভারতের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি'র শতকরা আশি ভাগ গান আসতো হিন্দি সিনেমাগুলো থেকে। সে সময়টা এমন ছিলো, সঙ্গীতশিল্পীরা সিনেমার বাইরে আলাদা করে গানের অ্যালবাম বের করতে বেশ শঙ্কিত থাকতো। খুব একটা ব্যবসাও হতোনা এইসব অ্যালবামের। সোজা বাংলায়- সিনেমার বাইরে গান রিলিজ করলে, সে গান চলতো না। ফ্লপড হয়ে যেতো। 

তবে তাও 'ইন্ডি পপ' বা 'ইন্ডিয়ান পপ' নামে নন-ফিল্ম গানের একটা জনরা আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হওয়া শুরু করে। যে জনরাতেই একসময়ে আসে 'ও সনম' গানটি ৷ যে গানে কথার এবং বাদ্যযন্ত্রের অতটা বাড়াবাড়ি নেই৷ আছে শুধু অদ্ভুত এক গলা এবং সুর। লাকির গলাটাই এমন, খুব জোরালো কিছু না। কিন্তু ভেতরে গিয়ে ঠিকই আছড়ে পড়ে এবং আচ্ছন্ন করে অন্দরমহলের যাপিত প্রকোষ্ঠ। 

পঁচানব্বই সালের কথা৷ মিকি ম্যাকক্লারি, যিনি 'সুনো' অ্যালবামের প্রযোজক ছিলেন, তিনি লন্ডনের সোহো তে বিখ্যাত 'ট্রাইডেন্ট' স্টুডিও (যেখানে বিটলস, ডেভিড বোয়ি, কুইন এর অজস্র গান রেকর্ড করা হয়েছে) তে কাজ করছিলেন। সেখানে হুট করে চলে আসেন লাকি আলী। ম্যাকক্লারি জানতে পারেন, লাকি আলী বিয়ে করেছে ম্যাকক্লারির বোনকে! সে হিসেবে লাকি আলী এখন তার ভগ্নিপতি!  

লাকি আলী ম্যাকক্লারিকে জানান, তিনি লন্ডনে এসেছেন কিছু গান রেকর্ড করার জন্যে। কিন্তু যে স্টুডিওতে গান রেকর্ড করছিলেন, সেই স্টুডিও আগুন লেগে পুড়ে যায়৷ তাই কাজের অগ্রগতি খুব বেশি একটা হয়নি৷ সেজন্যেই উপায়ান্তর না দেখেই তিনি ম্যাকক্লারির শরণাপন্ন হয়েছেন৷ ম্যাকক্লারি বুঝলেন বিষয়টা। আলীকে সপ্তাহখানেক পর আসতে বললেন। এরমধ্যে তিনি ভেবে দেখবেন, কীভাবে কী করা যায়! 

যথারীতি পরের সপ্তাহে আলী আবার আসেন ট্রাইডেন্ট স্টুডিওতে, শ্যালকের কাছে। খালি গলায় গেয়ে শোনান অ্যালবামের 'ও সনম' এবং 'সুনো' গান৷ গান দুটির মেলোডি বেশ অন্যরকম ছিলো। গানের সাথে এক্সপেরিমেন্ট হিসেবে হালকা মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট এর ব্যবস্থাও করেন ম্যাকক্লারি৷ গিটার, কিবোর্ড এবং সামান্য টুকিটাকি৷ দেখলেন, সুর ভালোই আসছে৷ এক্সপেরিমেন্ট হিসেবে উদো পটস, মক্তব (আফ্রিকান ড্রামস), লগ ড্রামস, জেম্বে, বাঁশি ব্যবহার করলেন 'ও সনম' গানের সাথে। এক্সপেরিমেন্টের বাদ্যযন্ত্রগুলো মিলেমিশে বেশ অদ্ভুত একটা টিউনিং দাঁড়িয়ে যায়৷ 

লাকি আলী তখন অ্যালবাম বানানোর জন্যে এতটাই আগ্রাসী ছিলেন, তিনি রাতদিন এক করে গানগুলো নিয়ে খাটতে থাকেন। এর পেছনে কারণও আছে। তিনি তার বাবা-মা'কে বোঝাতে চাচ্ছিলেন, তিনি বেকার না৷ তিনি গান নিয়ে সামনে এগোতে চান৷ গানের মধ্যে থাকতে চান। সেজন্যে একটা অ্যালবামের খুবই দরকার তাঁর।

যাই হোক, এই দুটি গান রেকর্ড করার পরে লাকি আলী ভারতে ফিরলেন। স্টুডিওতে স্টুডিওতে, প্রোডাকশন হাউজগুলোতে ধর্না দিয়ে তিনি শোনাতে চাইলেন তার গানগুলোকে৷ কেউ পাত্তা দিলো। আবার কেউ দিলোনা। তিনি আবার লন্ডনে গেলেন। বাকি গানগুলো রেকর্ড করার জন্যে৷ ম্যাকক্লারি পুরো স্টুডিওটাই তাকে ছেড়ে দিলেন, বললেন- 

এক্সপেরিমেন্ট করো সবকিছু নিয়ে। ক্রিয়েটিভ লিবার্টি দেয়া হলো তোমাকে। 

সেই সুযোগের দারুণ সদ্ব্যবহার করলেন তিনি। ছয় মাস পরে যখন দেশে ফিরলেন তিনি, তার গানগুলো, বিশেষ করে 'ও সনম' ততদিনে সুর, তাল, লয় নিয়ে নানা এক্সপেরিমেন্ট এর কারণে হয়ে গিয়েছে অসাধারণ কিছু। 'ইন্ডি-পপ' ঘরানার হলেও গানটির মধ্যে এমন সব অনুষঙ্গের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিলো, যা বৈশ্বিক, অনবদ্য৷ ভারতের সঙ্গীত-জগত তখনও মিউজিকের এই অন্যরকম স্টাইলের সাথে পরিচিত হয়ে ওঠেনি, লেখাই বাহুল্য। গানের শুরুর সেই 'হুমম' টান আর লাকীর অদ্ভুত কন্ঠ আর মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট আর সুর... এই তিন মিলে এমন এক অদ্ভুত কম্পোজিশন, ভারত কে 'থ' করে দেয়ার জন্যে যা ছিলো যথেষ্ট৷ বাস্তবিকও হয়েছিলো তাই। টানা বহু বছর ধরে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির নানা রেকর্ড ভাংচুর করেছে এই গান! 

পরবর্তীতে এই গানের ভিডিও করা নিয়েও হয়েছিলো মজার ঘটনা। যা হয়তো পরবর্তীতে আরেকদিন বলা যাবে। লেখা শেষ করি, 'ও সনম' এর লাকি আলীর গল্প দিয়েই। তিনি যেভাবে শুরু করেছিলেন, যেতে পারতেন বহুদূর৷ কিন্তু রক্তে 'গান' এর পাশাপাশি তাঁর ছিলো একশো আটটি নীলপদ্ম আর দূরন্ত ষাঁড়ের চোখে লাল রুমাল বাঁধার নেশা। পায়ের তলায় সর্ষের রোখ আর গলায় সুরের মদিরা... তিনি সারাজীবন ধরেই এই দ্বৈরথে নাকানিচোবানি খেয়েছেন। বোহেমিয়ান এক জীবন কাটাতে গিয়ে নিজের জীবন, নিজের গান, নিজের সংসার সবকিছুকেই করে রেখেছেন অগোছালো, ছন্নছাড়া। নামের সাথে 'লাকি' থাকলেও 'লাক' বা ভাগ্যকে তিনি চলার পথের কোন মাঝরাস্তায় ছেড়ে এসেছিলেন, তিনিই ভালো বলতে পারবেন।

'রাস্তা ম্যান' নামের এক অ্যালবাম আছে লাকি আলীর। আক্ষরিক অর্থেও তিনি ছিলেন রাস্তারই মানুষ৷ ক্যারাভানে দৌড়াচ্ছেন, রাজপথে উড়িয়ে দিচ্ছেন সময়। এরইমধ্যে গতবছর যখন ইউটিউব এবং ফেসবুকে তার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, চেহারায় চিনতে পারি নি তাকে। চোখদুটি উজ্জ্বল। কিন্তু দেহপটে অজস্র বলিরেখা। গলাও ভেঙ্গে আসছে থেকে থেকে। তবুও কী দারুণ করেই না গাইলেন 'ও সনম।' গলায় চিনলাম শিল্পীকে।

বহু বছর পরে পর্দার সামনে এলেন লাকি আলী! 

আবার এই তো কয়েক মাস আগে, ভারতের গোয়ায় একগাদা তরুণ-তরুণীর সামনে গান গাইতে বসলেন। গাইলেনও। গিটার বাজাতে গিয়ে টিউনিং উল্টোপাল্টা করলেন৷ একগাল হেসে বললেন,

স্যরি, আই মেসড আপ।

গোয়ায়; একগাদা শ্রোতার মাঝখানে

এটাই এক লাইনে লাকির জীবনের গল্প। তিনি নিজেই নিজের জীবন-সুর'কে মেসড আপ করেছেন। আবার হেসে হেসে নিজেই নিজের ব্যর্থতাকে প্রচার করেছেন। আমরা বলছি, লাকি অনেককিছুই হতে পারতেন। আবার এটাও হয়তো ঠিক, লাকি নিজেই চেয়েছিলেন এরকম বাউন্ডুলে জীবন। কে জানে! হয়তো এই লাইনগুলোকেই বেদবাক্য বানিয়েছিলেন লাকিঃ

অনেকের তো অনেক কিছুই হলো
আমার নাহয় পান্তাভাতে নুন
অনেক কিছুই হওয়ার কথা ছিলো
আমার নাহয় আলসেমিটাই গুণ! 

হয়তো লাকির এ পথচলাতেই আনন্দ! হয়তো! কে জানে! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা