ভারতে মহামারী যখন তীব্র ছোবল দিচ্ছে, তখন মহেশ নারায়ণন 'সি ইউ সুন' বানিয়ে তুমুল চমকে দিলেন সবাইকে। তার নির্মিত 'মালিক' হয়ে রইলো এ বছরেরই অন্যতম শ্রেষ্ঠ মালায়ালাম নির্মাণ। সামনে তিনি আসবেন হিন্দি সিনেমা নিয়েও!

গত বছরে মহামারীর প্রকোপ শুরু হওয়ার ঠিক পরমুহুর্ত থেকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর যে একচেটিয়া রাজত্ব শুরু হয়েছে, তা প্রচণ্ড ইতিবাচক। ওটিটির এই বাড়বাড়ন্ত সময়ে এসে যেকোনো ইন্ডাস্ট্রির নির্মাণ মুক্তির পরপরেই তা পাওয়া যাচ্ছে হাতের নাগালে। ওটিটির এহেন অগ্রগতি নির্মাণগুলোর প্রচার-প্রসারে বিশেষ মাত্রা যোগ করার পাশাপাশি হয়েছে দুঃসময়ের বাতিঘরও! তাই সাম্প্রতিক সময়ে এসে এটা খুবই আকাঙ্ক্ষিত এক প্রত্যাশা, নির্মানগুলো যেন ওটিটিকেন্দ্রিক হয়, সহজলভ্য হয়। নির্মাতাদের সৃজনশীল নির্মানগুলো সবার স্পর্শের নাগালে এলে তা যেমন দর্শকের জন্যে ইতিবাচক, তা ইতিবাচক নির্মাতাদের জন্যেও, এবং সবমিলিয়ে তাবড় চলচ্চিত্র-ইন্ডাস্ট্রির জন্যেও।

এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে মালায়ালাম স্টার ফাহাদ ফাসিলের কথা। গত বছর থেকে এ পর্যন্ত তার চারটি সিনেমা এসেছে বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। সিনেমাগুলো ব্যবসাসফল হয়েছে। ফাহাদ ফাসিলেরও জনপ্রিয়তা ক্রমশ আঞ্চলিক গণ্ডি ছাড়িয়েছে। এখন তাকে ধরা হচ্ছে প্যান ইন্ডিয়ান সুপারস্টার হিসেবে। যদি প্রেক্ষাগৃহগুলোর স্বাভাবিক অবস্থা থাকতো, তাহলে এই বিশেষ বিশেষণ অর্জন করতে তাকে যে আরো বেশ কাঠখড় পোড়াতে হতো, তা বলাই বাহুল্য। এবং বলাবাহুল্য, দর্শকেরাও বঞ্চিত হতো দুর্দান্ত এই সিনেমাগুলো থেকে! 

এবার আরেকটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ফাহাদ ফাসিল এই সময়কালে যে চারটি সিনেমায় অভিনয় করলেন, তার মধ্যে দুটিরই পরিচালক বিশেষ একজন নির্মাতা। তিনি মহেশ নারায়ণন। গত বছরে ভারতে মহামারীর প্রকোপে সবকিছু যখন স্তব্ধ, সবাই যখন নিজেদের যাপিত রসদ সযত্নে তুলে রেখেছেন বাক্সে, ঠিক সে সময়ে মহেশ নারায়ণন এক সিনেমা দিয়ে চমকে দিলেন। সিনেমাটির নাম- সি ইউ সুন। আইফোন এবং ফাহাদ ফাসিলের ফ্ল্যাট...এই দুইয়ের মিশেলে বানানো যে সিনেমা ভারতের সিনেমাজগতের ইতিহাসে হয়ে রইলো বিরল এক ঘটনা। 'সি ইউ সুন' 'ল্যাপটপ' জনরার সিনেমা। এই জনরার সিনেমাগুলোর সবচেয়ে ভয়ের দিক, স্ক্রিপ্টের গতি একটুও যদি শ্লথ হয়, পুরো নির্মাণই মাঠে মারা যেতে পারে। কারণ, এখানে ডায়লগের অভিনবত্ব নেই। সিনেম্যাটোগ্রাফীর চমক নেই। আছে শুধু সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল এবং কম্পিউটারের স্ক্রিণ। গন্ডি সীমাবদ্ধ, তাই এক্সিকিউশনের মুন্সিয়ানাই এখানে মূল প্রোটাগনিস্ট। 

সি ইউ সুন! 

মহেশ নারায়ণন 'সি ইউ সুন' সিনেমার এক্সিকিউশনেই দেখালেন বিস্তর চমক। সিনেমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বজায় রইলো থ্রিল, সাসপেন্স। সে সাথে দর্শক পেলো এক মানবিক গল্পেরও আখ্যাণ। সবমিলিয়ে মনে রাখার মতনই এক কাজ পেলো দর্শক। মহেশ নারায়ণনও যেন সে সাথে আভাস দিয়ে রাখলেন, ওটিটিকেই করেছেন তিনি পাখির চোখ! 

অবশ্য যদি কেউ এই নির্মাতার সিনেমা-সংক্রান্ত বায়োগ্রাফি একটু খেয়াল করেন, দেখবেন, ইরাকে মালায়ালিদের উপর নিপীড়নের সত্য ঘটনা অবলম্বনে তার বানানো 'টেক অফ' ছিলো পরিমিতিবোধ, মাপা চিত্রনাট্য, ছিমছাম এক্সিকিউশনের দারুণ এক নির্মাণ। তিনি এডিটর হিসেবে শৈলী দেখিয়েছিলেন মালায়ালাম ক্লাসিক 'এননু নিনতে মইদিন' সিনেমাতেও। যুক্ত ছিলেন বিশ্বরূপম, বিশ্বরূপম টু, ট্রাফিক এর মতন দারুণ স্বকীয় সিনেমাগুলোতেও। এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রত্যেক নির্মাণেই মহেশ নারায়ণন তার কাজের যে দুর্দান্ত মান, বজায় রেখেছিলেন তাও। এই নির্মাতা নিজেও মনে করেন, একজন নির্মাতা তখনই দক্ষ হয়ে ওঠেন, যখন তিনি এডিটিং এবং স্ক্রিপ্ট রাইটিং দুটিতেই সিদ্ধহস্ত হন। এবং এই দুই ক্ষেত্রেই যে মহেশ নারায়ণনের সুনাম সর্বজনবিদিত, তা বোধহয় আলাদা করে না বললেও চলে। 

এননু নিনতে মইদিন! 

যাই হোক, আবার প্রসঙ্গে ফিরি। 'সি ইউ সুন' এর পরে মহেশ নারায়ণনের দ্বিতীয় যে সিনেমা মুক্তি পেলো ওটিটিতে, সে সিনেমার নাম- মালিক। মালায়ালাম ইন্ডাস্ট্রির এ বছরের শ্রেষ্ঠ সিনেমার নাম বলতে গেলে, 'মালিক' এর নাম হয়তো সবার আগেই থাকবে! এ সিনেমার প্রথমেই সাড়ে বারো মিনিটের সেই সিঙ্গেল টেক শট কিংবা পুরো সিনেমাজুড়ে পলিটিক্যাল রিয়্যালিজম এর দুর্দান্ত প্রেজেন্টেশন কিংবা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর-সিনেম্যাটোগ্রাফী কিংবা ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের অভিনবত্ব...সবমিলিয়ে, মনে রাখার মতন এক কাজ হয়ে রইলো 'মালিক'!  

মালিক! 

'সিইউ সুন' কিংবা 'মালিক' যারা দেখেছেন এবং যারা মহেশ নারায়ণন সম্পর্কেও খানিকটা পড়াশোনা করেছেন, তাদের বোধকরি এই নির্মাতার প্রতি বেশ খানিকটা প্রত্যাশা তৈরীও হয়েছে ভেতরে ভেতরে। মহেশ নারায়ণনও যেন বিষয়টি বুঝতে পেরে একের পর এক চমক দেখাচ্ছেন, নতুন নতুন সব প্রজেক্টে হাত দিচ্ছেন। সাউথের কিংবদন্তি অভিনেতা কমল হাসানের সাথে সিনেমা করার কথা আছে তার।

পাশাপাশি তাঁর অভিষেক হচ্ছে হিন্দি ভাষার সিনেমাতেও। নানা সময়ে বহু দর্শক তাকে মালায়ালাম সিনেমার হিন্দি অথবা তামিল অ্যাডাপ্টেশনের কথা বলেছেন। তবে রিমেকের সে পথে না হেঁটে তিনি সামনে বানাবেন অরিজিনাল কনসেপ্টেরই এক ফিল্ম! 'ফ্যান্টম হসপিটাল' নামের যে সিনেমার প্রেক্ষাপটে থাকবে ইন্ডিয়ান হেলথকেয়ারের নানা সঙ্গতি-অসঙ্গতি। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, এই হিন্দি সিনেমার প্রযোজক হিসেবে থাকবেন প্রীতি সাহানি, যিনি এর আগে তলওয়ার, রাজি কিংবা বাধাই হো...বলিউডের দুর্দান্ত এ সিনেমাগুলোতে অর্থলগ্নি করেছেন। তাই সবকিছু মিলিয়ে-মিশিয়ে মহেশ নারায়ণনের এই সিনেমা নিয়েও প্রত্যাশার পারদ ক্রমশই আকাশচুম্বি! 

সে সাথে আরেকটি বিষয়ও আলাদাভাবে বলা উচিত, মালায়ালি সিনেমা নির্মাতাদের মধ্যে প্রিয়দর্শন এবং সিদ্দিক যখন হিন্দি সিনেমা করেছিলেন, তখন তারা যে পরিমান সাড়া পেয়েছিলেন, মহেশ নারায়ণনকেও ঠিক সেরকমভাবেই সাদরে অকুন্ঠ সমর্থন জানাচ্ছে দর্শকেরা। বিগত বছরগুলোতে দারুণ সব নির্মাণ উপহার দিয়ে মহেশ নারায়ণন সে সমর্থন আদায় করেছেন, কিংবা, বলা ভালো, ছিনিয়ে নিয়েছেন। 

নির্মাতা মহেশ নারায়ণন! 

মহেশ নারায়ণনের এক বিশেষ চমৎকারিত্ব, তিনি জানেন, সংস্কৃতির প্রসারের মাধ্যমগুলোকে কিভাবে ব্যবহার করতে হয়। ফাহাদ ফাসিল যেমন এক বছরের টাইমফ্রেমে টানা চারটি সিনেমা মুক্তি দিয়ে ওটিটির সুপারস্টারে রূপান্তরিত হয়েছেন, তেমনি মহেশ নারায়ণনও এই মাধ্যমটিকে দিয়েছেন যথোপযুক্ত সম্মান। 'মালিক' সিনেমাহলে রিলিজ করলে সেটি হয়তো অনেক বেশি ব্যবসা করতো, কিন্তু যেহেতু বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রেক্ষাগৃহগুলো কখন পুরোপুরি চালু হবে, তা অনিশ্চিত, সেরকম সময়ে এই সিনেমাটিকে ওটিটি'তে মুক্তি দেয়াই ছিলো সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। এবং সেটিই করেছেন মহেশ নারায়ণন। তাতে করে তিনি যে পিছিয়ে পড়লেন, তা কিন্তু না। বরং বর্তমান সময়ে আলোচিত সিনেমা-নির্মাতাদের মধ্যে তিনি প্রথম সারিতেই স্থান করে নিলেন। আশা করা যায়, মহেশ নারায়ণনের এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির সমসাময়িক নির্মাতারাও এগিয়ে আসবেন। মুমূর্ষু এই সময়ে যে মাধ্যমে, যে পদ্ধতিতে শিল্পসংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো যায়, নির্মাতা-কলাকুশলীরা ঠিক সে মাধ্যম এবং সে পদ্ধতিতেই ধরে রাখবেন বিপর্যস্ত এ সময়ের সংস্কৃতি-মাস্তুলের হাল, প্রত্যাশা এটাই। 

 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা