ঈদের আগে পত্রিকার পাতাজুড়ে বিশাল বিজ্ঞাপন দেয়া হয় তার একক সঙ্গীতানুষ্ঠানের, ‘উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী’ তকমা লাগিয়ে দেয়া হয় তার নামের অগ্রভাগে; মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে এখন তেলের অভাব, সব তেল এসে জড়ো হয়েছে কারওয়ান বাজারে এটিএন বাংলার কার্যালয়ে...

তার অন্যান্য ব্যবসা বা আয়-রোজগারের উৎস সম্পর্কে সেভাবে জানি না। আটবার জাতীয় রপ্তানী ট্রফি জিতেছেন বলে দাবী করা হয়েছে তার ফেসবুক পেজে, সেখানে তাকে তুলনা করা হয়েছে মার্ক জাকারবার্গ আর বিল গেটসের সঙ্গে। দুইখানা টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক তিনি, এদের মধ্যে একটা আবার দেশের সবচেয়ে পুরাতন স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর একটি। সেই সূত্রেই তিনি বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। 

শোনা যায় তার একাধিক পাজেরো গাড়ি আছে, ফোর সিটার সেডান আছে গোটাকয়েক, বাড়ী বা বাংলোর হিসেব জানা নেই। স্ত্রীকে গায়িকা বানানোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন তিনি অনেক বছর ধরে। আবার এমনও হতে পারে স্ত্রীর স্বপ্ন পূরণে সচেষ্ট থেকেছেন বরাবরই। নিজের চ্যানেলে সময়ে অসময়ে বেসময়ে স্ত্রীর অসাধারণ সব গান প্রচার করতেন তিনি, বের করেছেন সংখ্য সিডি, ভিসিডি, ডিভিডি। সেসব কে বিক্রি করেছে, কারা কিনেছে, কারা শুনেছে এই তথ্য স্বয়ং এনএসআই খুঁজে বের করতে পারবে কিনা তাতে আছে ঘোর সন্দেহ। 

এমনকি রবীন্দ্রনাথকেও ছেড়ে কথা বলেননি রহমান দম্পতি, ইভা রহমানকে দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবামও বের করিয়ে ছেড়েছিলেন। সম্ভবত গানের প্রতি তার একটা আলাদা ফ্যাসিনেশন আছে। তাই একটা পর্যায়ে নিজেই নেমে গেলেন! হাতে গিটার নেই, আঙুলে নেই ঝংকার। তবে বুনো মাদকতা আছে কণ্ঠে, যে মাদকতা কাটিয়ে দেয় ইয়াবার নেশা। গলায় গানের গ নেই, সুর-তাল-লয়ের আগা-গোড়া নেই, মাঝামাঝিতেও নেই কিছু, কিন্ত ঈদের আগে পত্রিকার পাতাজুড়ে বিশাল বিজ্ঞাপন দেয়া হয় তার একক সঙ্গীতানুষ্ঠানের, ‘উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী’ তকমা লাগিয়ে দেয়া হয় তার নামের অগ্রভাগে; মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে এখন তেলের অভাব, সব তেল এসে জড়ো হয়েছে কারওয়ান বাজারে এটিএন বাংলার কার্যালয়ে। 

সেই মানুষটাকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে, যিনি মাহফুজুর রহমানের নামের আগে এই বিশেষণ যোগ করেছেন। জানতে ইচ্ছে করে, এই তিন শব্দের ব্যবহার ঘটিয়ে বাড়তি কোন প্রমোশন কি তিনি বাগিয়ে নিতে পেরেছিলেন? কুরবানীর ঈদে কি একটা বোনাস বেশী দেয়া হয়েছিল তাকে? এত যে তৈলমর্দন, সেই তেলের দামটা কি উঠেছিল ঠিকঠাক? 

তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট উপাধি দেয়া হয়েছে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অবদানের জন্য। সাধারণত সম্মানসূচক ডক্টরেট হলে নামের আগে ডক্টর ব্যবহার করার রীতি নেই। কিন্তু তিনি সেটা ব্যবহার করেন। টাকাপয়সা আয়ের দিক থেকে কিংবা সমাজে তার অবস্থান, এদেশে তাকে এলিট সোসাইটির মানুষ বলাই যায়। শিক্ষা, অর্থ এসব নাকি মানুষের রূচি বদলে দেয়, কথাটা মুরুব্বীদের কাছে শুনেছিলাম। মুরুব্বীদের মুখে শোনা কথা বেশীরভাগ সত্যিই হয়। কিন্ত এই কথাটা সত্যি হয়নি। এটাকে মিথ্যে প্রমাণ করেছেন মাহফুজুর রহমান। 

হতে পারে, গানের প্রতি তার আলাদা একটা টান আছে, তিনি গান ভালোবাসেন, হয়তো হৃদয়ে ধারণও করেন। তাতে সমস্যা নেই। তিনি টুকটাক গান গাইবার চেষ্টাও করেন, সেটা কমবেশী সবাই করে। জীবনে বাথরুমের শাওয়ার ছেড়ে গলা মেলে ধরেনি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না আমাদের দেশে, হয়তো পুরো বিশ্বেও দুর্লভ। কিন্ত সঙ্গীতকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি, সেখানেই তিনি এক ও অদ্বিতীয়! 

মাহফুজুর রহমান

কয়েক বছর আগের এক ঈদ থেকেই শুরু হয়েছে যন্ত্রণার। নিজের একক সঙ্গীতানুষ্ঠান আয়োজন করছেন তিনি নিজের চ্যানেলে, ঈদ, পূজা, চ্যানেলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কিংবা অন্য কোন উপলক্ষ্যে এটিএন বাংলায় বিভিন্ন টক শোতে হাজির হয়ে দুই লাইনের জায়গায় জোর করে দুই মিনিট গান শুনিয়ে দিচ্ছেন, উপস্থাপকেরাও নিজেদের স্বার্থে স্তুতিতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন তাকে। তিনিও সম্ভবত এসব প্রশংসাকে সিরিয়াসলি আমলে নিচ্ছেন, থামাথামির কোন লক্ষণ তো নেই-ই, বরং আরো জোরগতিতে ছুটে চলেছেন তিনি, তার গান নিয়ে! 

আগে গানের মধ্যে শুধু তাকেই দেখা যেত, এরপর ব্যতিক্রম দেখা গেল, মাহফুজুর রহমান ছাড়াও জনাকয়েক মডেল হাজির হলেন গানে! একবার ‘স্মৃতির আলপনা আঁকি’ শীর্ষক গালভরা নামের অনুষ্ঠানে মাহফুজ সাহেব একেকবার একেক রঙের পাঞ্জাবী পরে, স্যুট গায়ে চড়িয়ে, সবুজ/গোলাপি রঙের টাইটফিট গেঞ্জিতে নিজেকে জড়িয়ে হাজির হচ্ছিলেন ক্যামেরার সামনে। সিঁড়ির গোড়ায়, সোফার কোণায়, পাহাড়ের উপরিভাগে কিংবা সাগরের ঢেউয়ের ফেনায়- কোথায় নেই মাহফুজুর রহমান! জাদুকরী কণ্ঠ নিয়ে দেশের আনাচেকানাচে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি! 

এমন 'দুর্দান্ত' অনুষ্ঠান আবার উপস্থাপনা করেন অপূর্ব, গানের মডেল হিসেবে কাজ করেন শখ, মেহজাবিন, নিলয়ের মতো মানুষেরা! টাকার ক্ষমতায় আরো একবার বিশ্বাস চলে এসেছিলো সেবার, কাগজের টুকরোগুলো পারে না এমন কোন কাজ নেই! 

সোশ্যাল সাইটগুলোতে অনন্ত জলিলকে পঁচানোটা ট্রেন্ড হয়ে গিয়েছিল। তাতে জলিলের কোন ক্ষতি হয়নি। তিনি নাম কামানোর জন্যে ফিল্মে এসেছিলেন, সেটা কামিয়েছেন, লোক হাসিয়ে হোক আর যেভাবেই হোক, তারপর দাঁড়ি রেখে জোব্বা পরে এখন ধার্মিক হয়েছেন। সেটা যদিও তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্ত মাহফুজুর রহমান তার শিল্পচর্চা ব্যপারটাকে মোটেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখেননি। 

প্রতিবার ঈদের সময় বাংলাদেশে ফেসবুকের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রে পরিণত হন তিনি। নির্ধারিত দিনে রাত সাড়ে দশটা বাজতে না বাজতেই টিভির সামনে বসে যায় লোকে, ছবিটবি তুলে একাকার অবস্থা, অতি উৎসাহী কেউ কেউ তো টিভির সামনে বসে ফেসবুক লাইভেই চলে আসেন! তাদের সূত্র সম্ভবত- 'সেধে সেধে আমি যন্ত্রণা ভোগ করছি, আমার বন্ধুরাও করুক!' অন্তত একটা রাতের জন্যে ফেসবুক যেন মাহফুজবুকে পরিণত হয়ে যায়! 

তার স্ত্রী ইভা রহমানের গায়কী নিয়ে এককালে বহু মন্দকথা বলেছি, গলায় সুরের অভাব নিয়ে মজা করেছি। এখন মাহফুজুর রহমানের বেসুরো অত্যাচার সইতে না পেরে মনে হচ্ছে, ইভা রহমানই তো ভালো ছিলেন। সেই সময়ে অন্তত টিভির সাউন্ড অফ করে পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা যেত। এখন তো সেই উপায়ও নেই! এজন্যেই কবি বলেছিলেন, “আমাদের যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ!” 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা