এ বছরে যে কয়টি বাংলা নির্মাণ দেখেছে সবাই, তার মধ্যে 'মন্দার' গুনগতমানে উপরের দিকেই থাকবে। এক্সপেরিমেন্টাল নানা বিষয়-আশয় এনে অনির্বাণ ভট্টাচার্য যেভাবে 'ম্যাকবেথ' কে ট্রিবিউট দিয়েছেন, তা নির্মাতা হিসেবে তার প্রতি প্রত্যাশা আরো খানিকটা বাড়িয়েই দিয়েছে যেন...

'মন্দার' এর ট্রেলারই এতটা চমকপ্রদ ছিলো, এই ওয়েব সিরিজ নিয়ে বেশ বড়সড় এক প্রত্যাশা তৈরী হয়েছিলো ট্রেলার দেখার পরমুহূর্ত থেকেই। অভিনেতা কিংবা গায়ক হিসেবে অনির্বাণ ভট্টাচার্য এমনিতেই অনবদ্য, নির্মাতা হিসেবে তিনি কী করবেন, তা নিয়েও  খানিকটা উশখুশ ছিলো। এবং 'মন্দার' শেষে এটা বলাই যায়, নির্মাতা হিসেবেও তিনি অনবদ্য! কিছু অপ্রাপ্তি, কিছু প্রাপ্তি... সব মিলিয়ে-মিশিয়ে, নির্মাতা হিসেবে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের অভিষেকটা যে বেশ দারুণই হলো, তাতেও সন্দেহ নেই মোটেও।

যদিও শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত ট্রাজেডি 'ম্যাকবেথ' অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে 'মন্দার', কিন্তু এই নির্মাণ যে যাত্রাপথের পুরোটাতেই 'ম্যাকবেথ'কে অনুসরণ করেছে, এমনটিও বলা যাবে না মোটেও। 'মন্দার' এর শেষাংশের ক্লাইম্যাক্সে কিছু দারুণ স্বকীয়তা ছিলো, ন্যারেশন স্টাইলে চমক ছিলো এবং অসাধারণ কাজ ছিলো সিনেম্যাটোগ্রাফীতে। মেটাফোরে। সাউন্ড এর কাজে। সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ট্রিবিউটে। সেসব নিয়ে পরবর্তীতে খোলাসা করে বলছি। 

'লাইলী' চরিত্রে সোহিনী সরকার ছিলেন অনবদ্য! 

'মন্দার' দেখা শুরু করার সময়ে প্রাথমিক আগ্রহ ছিলো, 'ম্যাকবেথ'কে কিভাবে মডিফাই করছেন অনির্বাণ, তা নিয়ে। সবাই-ই জানেন, সময়ের নানা ফেরে 'ম্যাকবেথ'কে আদর্শ মেনে দুর্দান্ত সব নির্মাণই হয়েছে। আকিরা কুরোসাওয়ার 'থ্রোন অব ব্লাড', বিশাল ভরদ্বাজের 'মকবুল' কিংবা দিলীশ পোঠানের 'জোজি'র জন্মও 'ম্যাকবেথ' এর রূঢ় রসের গল্পকে উপজীব্য করে। এবং বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির এই নির্মাণগুলো রূপে-রসে-গন্ধে এতটাই অনবদ্য, নতুন কেউ ঠিক একই ধাঁচের গল্প নিয়ে কাজ করতে চাইলে, খানিকটা বাড়তি প্রত্যাশার চাপ বোধহয় চলেই আসে। এবং ঠিক সেই চাপের মুখে দাঁড়িয়েই 'মন্দার' এর আখ্যান শুরু হয় গেইলপুর নামের এক গ্রামকে সম্মুখে রেখে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর 'পদ্মা নদীর মাঝি' উপন্যাসের এক বিখ্যাত লাইন ছিলো- ঈশ্বর থাকেন ঐ গ্রামে, ভদ্র পল্লীতে- এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’ ঈশ্বরকে যেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না, সেরকম এক জায়গাই গেইলপুর। যেখানে বাতাসে মাছের আঁশটে গন্ধের সাথে মিশে থাকে কামনার টকটকে গন্ধও। শঠতা ও ভয়াবহতা এখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতন চলে মৃত্যু ও জীবন৷ নানা চলকের মানুষের আনাগোনা এখানে৷ এখানে আছে শক্তসমর্থ খুনে মন্দার, আছে তার কামুক স্ত্রী লাইলী, আছে স্থানীয় গডফাদার ডাবলু ভাই, আছে তার সাগরেদ মদন হালদার, এছাড়াও আছে বঙ্কা, ফন্টুস, লাকুমনি, মজনু, পেদো। 

মন্দার, গডফাদার ডাবলু ভাইয়ের পোষা গুণ্ডা৷ কখনো কারো লাশ নামানোর প্রয়োজন পড়লে ডাক আসে মন্দারের এবং তার বন্ধু বঙ্কার। সেরকমই উপরমহলের ডাকমাফিক একবার একজনকে হত্যার পরে মন্দারের সাথে মনোমালিন্য হয় ডাবলু ভাইয়ের। এবং শেক্সপিয়ারের নির্মাণগুলোর যে ধরণ, খুব ছোট জায়গা থেকে শুরু হয়ে সে মনোমালিন্য পৌঁছে যায় জীবন-মৃত্যুর সমীকরণে। যত সময় যায়, গল্প স্পষ্ট থেকে ক্রমশই হতে থাকে জটিল, কুটিল ও অন্ধকার। 

'মন্দার' এর প্রথমেই যে জিনিসটি নিয়ে কথা বলতে হবে, তা এই নির্মাণের সিনেম্যাটোগ্রাফী। বাংলা কোনো নির্মাণে এরকম তুখোড় সিনেম্যাটোগ্রাফী শেষ কবে দেখেছি, তা ভাবতে গেলে বেগ পেতে হবে। ক্যামেরার সামনে কী আসবে, কী আসবে না, কোন জিনিসটি এলে মূল গল্পের সাথে সামঞ্জস্য বিধান হবে, এসব নিয়ে যে খেলা অনির্বাণ দেখিয়েছে, শুরু থেকেই একদম স্থানু করে রেখেছে পর্দার সাথে। গল্পের সাথে মিলিয়ে মেটাফোরিক্যালি কিছু সিন এতটাই দুর্দান্ত, তা আলাদা আলোচনারও দাবী রাখে। একটা দৃশ্য ছিলো এরকম-  সৃজিত মুখার্জীর 'জুলফিকার' এর একটা দৃশ্য দেখানো হচ্ছে মোবাইলে, যেখানে জুলফিকারকে সবাই মিলে খুন করছে। মজার বিষয় হচ্ছে, সেই দৃশ্যের সাথে মিলিয়ে আরেকটি ঘটনাও তখন ঘটছে সরাসরি, 'মন্দার' এর মূল গল্পে। এবং খুব দারুণভাবেই সেখানে মিলে যাচ্ছিলো দুই গল্পের পরিণতি। 

এই নির্মাণের এমন কিছু দৃশ্য এরকম, ব্যাকগ্রাউন্ডে বেশ ঢিমেতালে রোমান্টিক গান বাজছে, কিন্তু পর্দায় দেখতে পাচ্ছি রক্ত, থ্রিল, সাসপেন্স। এই বৈপরীত্যের কাজটি বরাবরই তারান্টিনো করেন। যারা তারান্টিনোর 'কিল বিল' দেখেছেন, তারা জানেন, বিজিএম এবং ফ্রেমিং এর মধ্যে ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক নিশ্চিতকরণে তিনি ঠিক কতটা পটু। সেই বিষয় লক্ষ্য করি এখানেও। তাছাড়া কথাবার্তাতেও খুব সাবলীলভাবে আনা হয়েছে সাটল সব বার্তা। মনোযোগ দিয়ে না দেখলে যেসব বার্তার অন্তর্নিহিত গূঢ় তাৎপর্য ধরতে পারা যাবে না মোটেও। এতটাই সূক্ষ্ম ট্রিটমেন্টে আনা হয়েছে কথোপকথনগুলো 

'মন্দার' এর সিনেম্যাটোগ্রাফীতে ছিলো বিস্তর চমক...

অভিনয়েও সবাই দারুণ। 'লাইলি' চরিত্রে সোহিনী সরকার অনবদ্য। 'মন্দার' চরিত্রে দেবাশীষ মণ্ডলও ভালো। যদিও আরেকটু ভালো করার সুযোগ ছিলো তার। মুগ্ধ করেছেন প্রবীণ অভিনেতা দেবেশ রায় চৌধুরী। 'ডাবলু ভাই' চরিত্রটির যে ঠাটবাট, পুরোটাই রেখেছেন অক্ষুণ্ণ। ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার ছিলো অনির্বাণ ভট্টাচার্যেরও। মিনমিন করে কথা বলা, দুর্নীতিপরায়ণ এক পুলিশ অফিসারের স্বকীয় অবতারে এসে নিজের ক্ষমতা আরেকবার দেখিয়ে যাওয়ার সুযোগ মোটেও হাতছাড়া করেননি তিনি। বাদবাকি যারাই ছিলেন, কথাবার্তা, চালচলন সব কিছুতে মেছোপল্লীর ভাবটা সবার মধ্যেই ছিলো ধ্রুবক। 

প্রোটাগনিস্ট 'মন্দার' চরিত্রে দেবাশীষ মন্ডল আরেকটু ভালো করলে মন্দ হতোনা! 

তবে এতসব ভালোর ভীড়ে খানিকটা আক্ষেপও আছে।সত্যজিৎ রায় সবসময়ই বলতেন-

নির্মাণে পরিমিতিবোধ থাকাটা খুব জরুরি৷ ধরা যাক, সিনেমার শুটিং এর সময়ে খুব অসাধারণ কিছু সিন আমি তুলে ফেললাম। পরে সম্পাদনার সময়ে দেখলাম, এই সিনগুলো গল্পের সাথে খুব একটা যাচ্ছে না। তখন আমি নির্ঘাতভাবেই সেই সিনগুলোকে ফেলে দেবো। মায়া করবো না।

ঠিক এই জায়গাটিতেই খানিকটা ঘাটতি দেখেছি 'মন্দার' এ। এই নির্মাণের সিনেম্যাটোগ্রাফী অসাধারণ সুন্দর, কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু কিছুক্ষেত্রে সেগুলো এতটাই বেশি, গল্পের গতিই খানিকটা শ্লথ হয়ে গিয়েছে সময়ে সময়ে। বেশ কিছু জায়গা এমন ছিলো, যেখানে চাইলে কাটছাঁট করে গল্পকে আরেকটু টানটান করা যেতো। সেসব জায়গায় গল্প হুমড়ি খেয়েছে শুধুমাত্র অতিরিক্ত মেটাফোরিক্যাল অ্যাসথেটিজম এর কারণে। 

দ্বিতীয় সমস্যা, ক্যারেক্টার স্টাবলিশমেন্ট। আমরা যারা ম্যাকবেথ পড়েছি, তারা জানি, ম্যাকবেথে চরিত্রগুলোর মধ্যবর্তী রসায়নগুলোই এই ট্রাজেডির অন্যতম প্রধান রসদ। আশা ছিলো, 'মন্দার'এও সেই একই বিষয় পাবো। পাইনি। এমন দুটি চরিত্র পাইনি, যাদের মধ্যবর্তী রসায়ন নিয়ে আলাদা করে কথা বলা যায়। সবাই যার যার দিক থেকে ভালো অভিনয় করেছেন, সন্দেহ নেই। কিন্তু চরিত্রগুলোর মধ্যবর্তী মিথস্ক্রিয়া আরেকটু জমাটি হলে দর্শক আরেকটু ভালোভাবে যুক্ত হতে পারতো গল্পের সাথে। এখানে খানিকটা আক্ষেপ রয়ে গিয়েছে। 

এই সিনেমার ডাইনি মজনু ও তার ছেলে পেদো... এই দুই চরিত্রকে আরেকটু পরিশীলিত করা যেতো। এদেরকে কিভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে আরেকটু ভাবনাচিন্তা করা যেতে পারতো। ক্লাইম্যাক্সের অ্যাকশন সিন আরেকটু বাস্তব হতে পারতো, আরেকটু খোলতাই হতে পারতো আধিভৌতিক বিষয়গুলোও। তাহলেই 'মন্দার' নিয়ে খানিকটা মন খারাপেরও অবকাশ থাকতো না।

'মজনু' চরিত্রটি আরেকটু তুখোড় হতে পারতো! 

তবে এটা মানতে হবে, এ বছরে যে কয়টি বাংলা নির্মাণ দেখেছে সবাই, তার মধ্যে 'মন্দার' গুনগতমানে উপরের দিকেই থাকবে। এক্সপেরিমেন্টাল নানা বিষয়আশয় এনে অনির্বাণ ভট্টাচার্য যেভাবে 'ম্যাকবেথ' কে ট্রিবিউট দিয়েছেন, তা নির্মাতা হিসেবে তার প্রতি প্রত্যাশা আরো খানিকটা বাড়িয়েই দেয় যেন। ঠিক সে কারণেই তাই আশা থাকবে, অভিনেতা কিংবা গায়ক অনির্বাণের পাশাপাশি নির্মাতা অনির্বাণও এখন থেকে নিয়মিত হবেন হাজির। গতানুগতিক কাজের বাইরে এরকম দুর্দান্ত কাজের স্বাদ যদি দর্শক পেতে চায়, তাহলে ক্যামেরার পেছনে এই নির্মাতার নিয়মিত উপস্থিতির যে বিকল্প নেই, তা বলাই বাহুল্য।

​​


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা