স্ট্রিমিং সাইট 'হইচই' এ আশফাক নিপুনের 'মহানগর এসেছে, নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সেই কাজের প্রশংসা করলেন। ওপার বাংলার গুনী অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য 'মহানগর' এর অকৃপণ প্রশংসা করতেও কার্পণ্য করলেন না। কিন্তু, দেশের সংস্কৃতিজগতের যারা বড়সড় অবয়ব, তাদের অনেকেই মুখে এঁটে রইলেন কুলুপ...

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর এক বিখ্যাত চরিত্রের মুখ দিয়ে একবার বলিয়েছিলেন- অন্যের অপমান দেখার নেশা বড় কথা। অন্যের অপমান দেখার জন্যে, অন্যকে অপমান করার জন্যে মানুষ যেতে পারে ক্রোশের পর ক্রোশ দূরত্বে। কিন্তু, উল্টোটা, অর্থাৎ, প্রশংসাবাক্যের ক্ষেত্রে এলেই মুখে কুলুপ এঁটে যায় অধিকাংশের। প্রশংসা বাদই নাহয় দেয়া হলো, গঠনমূলক সমালোচনা করাতেও তীব্র আপত্তি অনেকের। সমালোচনা করতে গেলেও তা শেষমেশ চলে যায় ব্যক্তি আক্রমণের আদিম অভ্যাসে। আক্রমণের যে আক্রোশ থেকে রেহাই পাননি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মানিক বা পরবর্তীকালে হুমায়ূন, ছফা। রবীন্দ্রনাথের কাজগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যঙ্গবিদ্রুপ করার জন্যে তৎকালীন সময়ে তো 'শনিবারের চিঠি' নামক রম্য-পত্রিকা খোলাও হয়েছিলো। এতটাই প্রকট ছিলো অপমানের নেশা! 

বহু বছর ধরে চলে আসা অপমানের এই অপসংস্কৃতি দিনে দিনে কর্কট রোগের মতন বেড়েই চলে। কমে না। অপমানের অনলের জন্যে ভাঁড়ারের ঘি এর অভাব হয়নি কোনোদিনই। বিশেষ করে বাংলাদেশের সংস্কৃতিজগতে এই প্রাচীন অপসংস্কৃতির প্রকটতা লক্ষ্য করার মতন। বিগত ক'মাস ধরে বাংলাদেশে দারুণ দারুণ কিছু কাজ হচ্ছে। কিন্তু সে কাজের সেরকম প্রশংসা কই? সাধারণ মানুষের কথা নাহয় বাদই রইলো, সংস্কৃতিমাধ্যমে এত এত সৃজনশীল মানুষ, তারাও কেন যেন নিশ্চুপ। তারা পারতেন একে অন্যের কাজ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করতে। তারা পারতেন একে অন্যের 'সহযোগী' হতে। কিন্তু, তারা রূপান্তরিত হয়েছেন এবং ক্রমশ হচ্ছেন একে অন্যের 'প্রতিদ্বন্দ্বী'তে।

জানি, ব্যতিক্রম আছে। আবদুল্লাহ মোহম্মদ সাদ এর 'রেহানা মরিয়ম নূর' যখন 'কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল' এ সিলেক্টেড হলো, সে সংবাদ প্রথম দেখেছিলাম, আরেক খ্যাতিমান নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরীর টাইমলাইনে। স্ট্রিমিং সাইট 'হইচই' এ আশফাক নিপুনের 'মহানগর এলো, নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সেই কাজের প্রশংসা করলেন। ওপার বাংলার গুনী অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য 'মহানগর' এর অকৃপণ প্রশংসা করতে কার্পণ্য করলেন না। কিন্তু, আরো অনেকেই তো দেশের কাজ নিয়ে কথা বলতে পারতেন। প্রশংসা করতে না পারলেও গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারতেন৷ কিন্তু সেরকম কিছু হলো কই?

অনির্বাণ ভট্টাচার্য 'মহানগর' এর প্রশংসা করলেন অকুন্ঠচিত্তে! 

অথচ একটু পিছিয়ে যদি যাই, গতবছরে শিহাব শাহীন এর 'আগস্ট ১৪' মুক্তি পাওয়ার পরে অনেক প্রবীণ অভিনয়শিল্পীকে দেখেছি 'দেশের সংস্কৃতি গেলো গেলো' বলে রব তুলতে। একাট্টা হয়ে যে অমূলক আর্তনাদ তারা শুরু করেছিলেন, এরকমটি কেন হয়? অন্যকে অপমান করার এই তীব্র সুখের উৎস কী? এমনিতেই এদেশের সংস্কৃতি এখনো মুমূর্ষুপ্রায়। সেখান থেকে যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে, সেখানে কেন এই বিভাজনের সুর? কেন এই দ্বিখণ্ডিত অবয়ব? 

'রেহানা মারিয়ম নূর' নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন অমিতাভ রেজা চৌধুরী! 

সংশ্লিষ্ট গুনীজন, যারা এদেশের শিল্পসংস্কৃতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, তাদের উদ্দেশ্যে একটাই আবেদন, এদেশের নাটক-সিনেমা সময়ের নানা ফেরে নরকের বহু-বিচিত্র রূপ দেখেছে। ক্লেদাক্ত সব সময় পেরিয়ে এখন যতটুকু যা ভালো কাজ হচ্ছে, তা ছাইভস্মের মধ্য দিয়ে ওঠা এক ফিনিক্স পাখির অবয়ব৷ এই ফিনিক্স পাখি সর্বশৈলীতে পারদর্শী না। তা হওয়া সম্ভবও না। এই ফিনিক্স পাখির উড়তে গেলে অনুপ্রেরণা দরকার। দিকনির্দেশনা দরকার। প্রশংসার পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক মন্তব্য দরকার।

তাই মুখের অর্গল খুলে দিন৷ বলুন, যা বলা দরকার৷ যে লড়াইয়ে আপনারা সবাই সামিল, সেখানে দ্বৈরথের চোরাবালিতে কেউ না ডুবুক। সুস্থ সংস্কৃতির এক মহামিলনে পরিণত হোক সুকুমারবৃত্তির দেশীয় এই মাধ্যম। তাতে সবারই উপকার। তাতে সবারই মঙ্গল। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা