অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তির খুচরো আলাপ দিয়ে মাইকেলা কোয়েল'কে মোটেও পূর্ণ-প্রকাশ করা যাবে না। মাইকেলা কোয়েলের সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি লড়াকু একজন যোদ্ধা। কেউ যদি এই মানুষটির জীবন-আখ্যান একেবারে প্রারম্ভ থেকে লক্ষ্য করেন, দেখবেন, বোধ হওয়ার পর থেকেই তাকে নিয়মিত নানা অসম-অন্যায় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে...

এমন গল্প লিখুন, যা আপনাকে ভীত করে। গল্পটা এমন হবে, যা আপনাকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলবে, যে গল্প  হজম করতে আপনার খুব কষ্ট হবে। 

আমরা এখন এমন এক পৃথিবীতে আছি, যেখানে অন্যের জীবনের অসুখ দেখে নিজেরা সুখ পাই। নিজেদের অস্তিত্ব জানান না দিলে আমরা মোটেও তৃপ্তি পাই না। আত্মপ্রচারই আজ সাফল্যের সমার্থক যেন। 

প্রচারসর্বস্ব এ পৃথিবী থেকে অন্ততপক্ষে কিছু সময়ের জন্যে অদৃশ্য হয়ে যান, দেখবেন নিঃশব্দে আপনার কাছে কিছু গল্প আসবে। সে সব গল্প লিখুন। সে সব গল্প আমাদের জানান। 

এই কথাগুলো কোনো বইয়ের লাইন না। কিংবা বড়সড় কোনো সাহিত্যিক কোনো আলোচনার আসরেও কথাগুলো বলেন নি। এই প্রাসঙ্গিক, রূঢ়-সুন্দর কথাগুলো যিনি বলছিলেন, সেই মানুষটির নাম- মাইকেলা কোয়েল। গতকাল থেকে যাকে নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। যিনি বিবিসি এবং এইচিবিও এর 'আই মে ডেস্ট্রয় ইউ' সিরিজের জন্যে 'বেস্ট রাইটিং' ক্যাটাগরিতে পেয়েছেন অ্যামি অ্যাওয়ার্ড৷ এবং এই ক্যাটাগরিতে তিনিই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ যিনি এ অ্যাওয়ার্ড জিতে ইতিহাস গড়েছেন।  

তবে অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তির খুচরো আলাপ দিয়ে মাইকেলা কোয়েল'কে মোটেও পূর্ণ-প্রকাশ করা যাবে না। মাইকেলা কোয়েলের সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি লড়াকু একজন যোদ্ধা। কেউ যদি মাইকেলা কোয়েলার জীবন-আখ্যান একেবারে প্রারম্ভ থেকে লক্ষ্য করেন, দেখবেন, বোধ হওয়ার পর থেকেই কোয়েলকে নানা সময়ে নানা অসম-অন্যায় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। জন্ম ও বেড়ে ওঠা লণ্ডনে হওয়ায় তীব্র বর্ণবৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। এমনও হয়েছে পুরো ক্লাসরুম 'অচ্ছ্যুৎ' করে রেখেছে তাকে। পাশাপাশি, মারাত্মক বুলি, ট্রোলের সাথেও যুঝতে হয়েছে তাকে। এসবের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেই হয়তো, খুব অল্প বয়সে মানসিক অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন কোয়েল। 

সেখান থেকে লড়াই করে একসময়ে ফিরেছেন। পড়াশোনা শেষ করেছেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে অজস্র কবিতা লিখেছেন। সেসব কবিতা জনপ্রিয় হয়েছে।কোয়েল স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছেন লণ্ডনের গুরুত্বপূর্ণ সব মঞ্চে। এভাবে যেতে যেতে একসময়ে তার নামই হয়ে গিয়েছিলো, মাইকেলা দ্য পোয়েট। যদিও পরবর্তীতে কবিতা ছেড়েছেন। লণ্ডনের বড় বড় প্রোডাকশন হাউজে কাজ করেছেন। নেটফ্লিক্স, এইচবিও, বিবিসি'র সিগনেচার প্রোগ্রামে কাজ করেছেন। জনপ্রিয় একাধিক টিভি সিরিজে অভিনয় এবং স্ক্রিপ্ট রাইটিং করেছেন। 'স্টার ওয়্যারস' ফ্রাঞ্চাইজির সিনেমা বা 'ব্ল্যাক প্যান্থার' এ অভিনয় করেছেন। 'টাইম ম্যাগাজিন' এর প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকাতেও নাম ছিলো তার। 

কোয়েলের জীবনের গল্প দেখতে পাই 'আই মে ডেস্ট্রয় ইউ' এ! 

এতসব কাজ, অর্জন, প্রশংসার পাশাপাশি তিনি আদ্যিকালের সেই বন্ধু 'বর্ণবাদ' এর সাথেও লড়াই করেছেন নিরন্তর। পাশাপাশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই যৌন  নির্যাতনের পরবর্তীতেই তিনি লিখেছেন 'আই মে ডেস্ট্রয় ইউ' এর চিত্রনাট্য। যে নির্মাণের জন্যই অ্যামি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করলেন তিনি। এছাড়াও কয়েকদিন আগে তার এক বই প্রকাশিত হয়েছে। 'মিসফিটসঃ আ পার্সোনাল ম্যানিফেস্টো' বইয়ে তিনি খুলে দিয়েছেন যাবজ্জীবন লড়াইয়ের ব্যক্তিগত সব অর্গল। নারীবিদ্বেষ ও বর্ণবৈষম্যের শিকার হিসেবে তার যে অভিজ্ঞতা, রাখঢাক না করেই তিনি তুলে এনেছেন এ বইয়ে। 

কোয়েল এরকমই। তিনি জানেন, স্রষ্টা তাকে এক বৈপরীত্যের পৃথিবীতে লড়াই করার জন্যেই পাঠিয়েছে। তিনি তাই নিজের মস্তিষ্ককেই বানিয়েছেন হাতিয়ার। নিজের যাপিত অভিজ্ঞতাকে ক্রমাগত তুলে এনেছেন পর্দায়; কখনো অভিনয়ে, কখনো কলমে। নানাবিধ অবতারে। এবং সেই মানুষটিই যখন পুরস্কারপ্রাপ্তির পর মঞ্চে এসেছেন, নির্ভয়ে লেখার, বলার আহ্বান জানিয়েছেন সবাইকে। যেন এটাই বলতে চেয়েছেন- সরব কণ্ঠে প্রতিবাদই হোক এখন সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। 

উপমহাদেশের বিখ্যাত লেখক- সাদাত হোসেন মান্টো'কে একবার এক পাঠক জিজ্ঞেস করেছিলেন- 

আপনি এরকম নিহিলিস্ট লেখা, বিষাদের গল্প কেন লেখেন?

 মান্টো তখন হেসে বলেছিলেন- 

আপনি দাঙ্গা, দেশভাগ, মানুষ জবাই দেখেছেন কী না, জানি না৷ কিন্তু আমি দেখেছি। আমি যা দেখেছি, আমার কলম তা-ই বলবে। এটাই আমার কলমের দায়। 

অ্যামি অ্যাওয়ার্ডের মঞ্চে মাইকেলা কোয়েলের পঞ্চান্ন সেকেন্ডের বক্তব্যটুকু যেন মনে করালো সাদাত হোসেন মান্টোকেই। মান্টোর মতন মাইকেলা কোয়েলও মনে করেন, কলমেরও দায় আছে বৈষম্যের প্রতিবাদ করার। যে প্রতিবাদ মান্টো করেছেন। কোয়েল করছেন। যে প্রতিবাদ আরো অজস্র লেখকের করা বাকি। 

অ্যামি অ্যাওয়ার্ডের মঞ্চে!  

মাইকেলা কোয়েল তার এই সংগ্রাম, এই চিন্তাবোধের কারণেই হয়ে গিয়েছেন বাদবাকি সবার থেকে পৃথক, নিজগুণে স্বকীয়। আপোষের এই সময়ে এসে এভাবেই তিনি রূপান্তরিত হয়েছেন বৈপরীত্যের তেজী বুনো 'বনফুল' এ। 

শ্রদ্ধা রইলো এ যোদ্ধার জন্যে! 

 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা