যদি ঝাড়া হাত-পা হয়ে দেখতে বসা যায়, তাহলে 'মিমি' ভালো লাগবে। সারোগেশন, অ্যাডাপ্টেশন, অরফানেজ... এগুলোর সোশ্যাল সিনারিও নিয়ে বেশ সম্যক ধারণা হবে। রাজস্থানের রঙিন প্রকৃতিরও এক ভিজ্যুয়াল এক্সপেরিয়েন্স হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, হিউমার এবং ইমোশনের প্রোপার ব্যালেন্স বলতে যা বোঝায়, তা পাওয়া যাবে...

মহামারীর এই বোতল-বদ্ধ গুমোট সময়ে 'মিমি' হতে পারে কারো মন ভালো করার ঔষধ। সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মানসিকতা দূরে রেখে, সমালোচনার আতশিকাঁচ নিয়ে  না বসে, যদি কেউ দুই ঘন্টা ধরে বাস্তব-অবাস্তবের মাঝামাঝি এক গল্পে নির্ভার হয়ে আটকে থাকতে চান, তাদের জন্যে 'মিমি' অবশ্য-দ্রষ্টব্য। 

আমেরিকার এক নিঃসন্তান দম্পতি এক বছর ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ভারতের পথে-প্রান্তরে৷ উদ্দেশ্য- সারোগেট পদ্ধতিতে নিজেদের সন্তান সৃষ্টি করবেন। অর্থাৎ গর্ভ হবে এখানের কোনো নারীর। সেই গর্ভে প্রতিস্থাপন করা হবে শুক্রাণু। সিনেমার এক চরিত্রের ভাষায়-

ক্ষেত একজনের। বীজ আরেকজনের। ফসল তিনি পাবেন, যিনি বীজ দিয়েছেন। 

অন্যের গর্ভ ভাড়া করে সন্তান জন্ম দেয়ার এই পদ্ধতিকেই বলা হচ্ছে সারোগেশন। যাই হোক, বিদেশি এই দম্পতি যখন এক সুস্থসবল নারীর গর্ভের জন্য সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছেন, ভানু(পঙ্কজ ত্রিপাঠী)'র গাড়ির যাত্রী হয়ে, তখন পাকেচক্রে তারা খোঁজ পান মিমি(কৃতী শ্যানন)'র। মিমি, রাজস্থানের ছোটখাটো এক মফস্বলের মেয়ে। যার স্বপ্ন, সে একদিন মুম্বাইয়ে যাবে, সিনেমায় অভিনয় করে সমসাময়িক অভিনেত্রীদের রোজগার বন্ধ করবে। অপ্রশস্ত কামরায় 'রনবীর সিং' এর সযত্নে এবং বলিউডের বাকি হিরোইনদের অযত্নে লালিত পোস্টার, সুখদুঃখের একমাত্র বান্ধবী শামা আর বাবা-মা'কে নিয়ে তার রঙিন সংসার। সে যদিও বলিউডে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সেখান যেতে যে অর্থকড়ি দরকার, তা তার নেই। এমনই এক সময়ে বিদেশি সেই দম্পতির সাথে তার পরিচয়। তারা প্রস্তাব দেয়, মিমিকে 'সারোগেট মাদার' হওয়ার জন্যে, বিনিময়ে তারা দেবে অঢেল টাকা। 

প্রক্রিয়া শুরু হয়। ক্রমশই গর্ভের ওমে লতানো গাছের মতন বেড়ে উঠছে এক নতুন প্রাণ। এমন সময়েই ছন্দপতন। বিদেশি এই দম্পতি জানিয়ে দেয়, তারা এ সন্তান নেবে না। দিশেহারা মিমি শরণাপন্ন হয় ডাক্তারের৷ ডাক্তার জানায়, তার হাতে এখন দুটি উপায়। এক- অ্যাবোরশান। দুই- সন্তান এর জন্মদান। কী করবে মিমি?

গল্প এরপর আরো খানিকটা ডালপালা ছড়ায়। সে দিকে আলোকপাত না করাই সমীচীন। মোদ্দা কথায়, গল্প এটুকুই৷ এই গল্পের মধ্যেই মানবিক কিছু টানাপোড়েন, প্রাণখোলা কিছু হাস্যরস এবং নাটকীয় কিছু ঘটনাপ্রবাহ... এটাই 'মিমি'র গল্প। 

প্রথমেই জানিয়েছি, মস্তিষ্ক থেকে সবকিছু ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে এই নির্মাণ দেখতে বসলে সময় খারাপ কাটবে না। যদিও বলা হয় 'সারকাজম ইজ দ্য লোয়েস্ট ফর্ম অব উইট, তবুও এই নির্মাণে হাস্যরস, সারকাজমের কাজগুলো ভালো। আরোপিত না মোটেও। আর যেখানে পঙ্কজ ত্রিপাঠী থাকেন, সেখানে হাস্যরসের ঘাটতি নিয়ে চিন্তিত না হলেও চলে। স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং নির্মাতা চেয়েছিলেন শুধু হাস্যরসই না, গল্পে ইমোশনাল রোলার-কোস্টারও থাকবে। সেটার মিশ্রণটাও ব্যালেন্সড। একপেশে হাসিঠাট্টা বা একঘেয়ে আবেগের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়নি দর্শককে৷ ওভার দ্য টপ, এ আর রহমানের মিউজিক কম্পোজিশন। সিনেমার গানগুলো সুন্দর। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর দারুণ৷ ডায়লগ গুলো মাপা। উইটি। 

সিচুয়েশনাল কমেডি, এই সিনেমার প্রাণ! 

অভিনয়ে পঙ্কজ ত্রিপাঠী বরাবরই অসাধারণ। সিনেমার ঝুলে যাওয়া জায়গাগুলোতে এই অভিনেতা যেভাবে ট্যাকল দিয়েছেন, তা অনবদ্য। পঙ্কজ ত্রিপাঠীর জায়গায় অন্য কেউ হলে এটা পারতো কী না, তা প্রশ্নবিদ্ধ। 'বারেলি কী বরফি'র পরে কৃতী শ্যাননের এখানে অভিনয় আবার ভালো লাগলো। নিঃসন্দেহে এখন পর্যন্ত এটাই তার ক্যারিয়ার বেস্ট পারফরম্যান্স৷ প্রোটাগনিস্ট কাস্টে ছিলেন, বার্ডেন ছিলো অনেকটাই। সেগুলো ভালো সামলেছেন। সাপোর্ট কাস্টে মনোজ পাহওয়া, সুপ্রিয়া পাঠকও ভালো হাল ধরেছেন। অভিনয়ে খুঁত ধরার জায়গা খুব একটা নেই। 

পঙ্কজ ত্রিপাঠী বরাবরের মতন দুর্দান্ত এখানেও! 

তবে 'মিমি'র সবচেয়ে দূর্বল দিক, মূল গল্প। ২০১০ সালের মারাঠা সিনেমা Mala Aai Vhhaychy থেকে অনুপ্রাণিত এ সিনেমার মূল উদ্দেশ্য যা ছিলো- অর্থাৎ সারোগেশন কে ফোকাসে রেখে সমাজের প্রচলিত সংস্কার, লিঙ্গবৈষম্য, গাত্রবর্ণ, ধনী-গরীব প্রেক্ষাপট...এসব বিষয়কে কটাক্ষ করা, এ কাজটি ঠিকঠাকভাবে করা সম্ভব হয় নি৷ যাপিত সংস্কারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যে স্ক্রিপ্ট যতটুকু শক্তপোক্ত এবং ন্যুয়ান্সগুলো ঠিক যেভাবে স্টাবলিশ করা দরকার ছিলো...সেটা খেই হারিয়েছে ক্রমশই। তাছাড়া বলিউডের যেমন কিছু টিপিক্যাল স্ট্রাটেজি আমরা বরাবরই দেখেছি, সেটা বহাল ছিলো এখানেও। যেমন- সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ প্লটগুলোতে অযাচিত গান এনে হুট করে সেসব জায়গার পরিণতি দেখিয়ে দেয়া। সেটা এখানেও হয়েছে। একটা দৃশ্য এমন- কৃতী শ্যানন প্রসববেদনায় দিশেহারা হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন। ক্লোজআপ শটে দেখা গেলো, এই যন্ত্রণাকাতর অবস্থাতেও তার ঠোঁটে লিপস্টিক! খুব কী দরকার ছিলো? এরকম ছোট ছোট লুপহোল আছে আরো। সিনেমা দেখলেই ধরতে পারা যাবে।

প্রোটাগনিস্ট 'মিমি' চরিত্রে অনবদ্য করেছেন কৃতী শ্যানন! 

 আগেই বলেছি, যদি ঝাড়া হাত-পা হয়ে দেখতে বসা যায়, তাহলে 'মিমি' ভালো লাগবে। সারোগেশন, অ্যাডাপ্টেশন, অরফানেজ... এগুলোর সোশ্যাল সিনারিও নিয়ে বেশ সম্যক ধারণা হবে। রাজস্থানের রঙিন প্রকৃতিরও এক ভিজ্যুয়াল এক্সপেরিয়েন্স হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, হিউমার এবং ইমোশনের প্রোপার ব্যালেন্স বলতে যা বোঝায়, তা পাওয়া যাবে। আজকাল বলিউডি ফিল্মগুলোতে 'হিউমার' বা 'কমেডি'র নামে যা অনর্থ হচ্ছে, সেটা থেকে পুরোপুরিই আলাদাভাবে হেঁটে 'মিমি' তাই মন ভালো করবে। কিছু চিন্তারও জন্ম দেবে।

সেদিক থেকে 'মিমি' সার্থক। প্রাসঙ্গিকও। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা