অঞ্চলভিত্তিক গল্প নিয়ে নির্মিত নাটকে একের পর এক অভিনয় করে যে সাব্বির নিজেকে ক্লিশে বানিয়ে ফেলেছিলেন, তারই যেন পূনর্জন্ম হলো নিজের বানানো সিনেমায়৷ যেভাবে তিনি যত্ন নিয়ে রইস ক্যারেক্টারটাকে বিল্ড করেছেন, এবং অভিনেতা হিসেবে যেভাবে সেই চরিত্রটাকে টেনে নিয়ে গেছেন, সেটা এক কথায় দুর্দান্ত...

চ্যানেল আই অনলাইনে দেয়া সাক্ষাৎকারে মীর সাব্বির আক্ষেপ করে বলেছিলেন, প্রায় বাইশ বছরের ক্যারিয়ার তার, কিন্তু সিনেমায় তাকে নিয়ে কেউ ভাবেনি। কোনো পরিচালক ভাবেনি যে, সাব্বিরকে দিয়ে এই চরিত্রটি করানো যেতে পারে। সবাই ভাবে সব চরিত্র তিনি হয়তো পারবেন না। তাকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার চেষ্টাও কেউ করেননি। কথাগুলো শুনে একটু ধাক্কার মতো লাগলেও, পাশাপাশি এটাও মনে হয়েছিল, মীর সাব্বির তো উদীয়মান অভিনেতা নন, প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা। নাটক পরিচালনাতেও নিয়মিত, নাটকে কি মনে রাখার মতো, দর্শককে ধাক্কা দেয়ার মতো কাজ তিনি করেছেন? বছরের পর বছর ধরে আলোচনা করা যাবে, এমন কোন চরিত্রের জন্ম কি তিনি দিতে পেরেছেন?

‘রাত জাগা ফুল’, মীর সাব্বিরের প্ররিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। সিনেমাটি দেখার পর মনে হলো, হ্যাঁ, মীর সাব্বির পেরেছেন এবার। নাটকে যা তিনি করে দেখাতে পারেননি, সেটা সিনেমায় এসে করেছেন। সিনেমা হিসেবে 'রাত জাগা ফুল' কত ভালো হয়েছে, কী কী খুঁত ছিল- সেসব আলোচনা আরেকদিন করা যাবে। আজ বরং মীর সাব্বিরকে নিয়ে কথা বলা যাক। রইস নামের যে চরিত্রে এই অভিনেতা জীবন্ত হয়ে উঠেছেন, কথা বলা যাক তাকে নিয়েও।

রইস, পাগলাটে এক চরিত্র। কিন্তু তাকে পুরোপুরি পাগল বলা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় মা-বাবাকে হারিয়ে অনাথ হওয়া রইসের বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছর। গ্রামের এক প্রান্তে ঝুপড়িমতোন একটা ঘরে তার বাস। গ্রামের মানুষ তাকে এড়িয়ে চলে, সেও থাকে না কারো সাতে-পাঁচে। গ্রামের শিশুরা তার বন্ধু, সে বোঝে গাছপালা আর পশুপাখির ভাষা। আপনজন বলতে তিনকুলে কেউ নেই রইসের, শুধু জামাল নামের গ্রামের এক তরুণ তার খাবারের যোগান দেয়, রইস তাই জামালকে ভাইয়ের মতো ভালোবাসে। আচমকা একদিন জামালের লাশ উদ্ধার হয় নদীর পাড় থেকে, কেউ তাকে খুন করেছে। সেখান থেকেই শুরু হয় রইসের অন্যরকম এক সংগ্রাম। 

রইস হবার জন্য ওজন খানিকটা বাড়িয়েছেন সাব্বির, বছরখানেক ধরে চুল কাটেননি। সময় নিয়ে চরিত্রের ভেতরে ঢুকেছেন। নিজের পরিচালিত সিনেমা, সেখানে নিজেই প্রোটাগনিস্টের ক্যারেক্টারে হাজির হচ্ছেন- প্রস্তুতিতে তাই কমতি রাখেননি কোথাও। শুধু নিজের প্রস্তুতি নয়, গোটা সিনেমার আয়োজনেই বা কমতি ছিল কোথায়? সিনেমা বানানোর জন্য মীর সাব্বির সরকারী অনুদান পেয়েছিলেন ষাট লাখ টাকা। সরকারী অনুদানের সিনেমা অনুদানের টাকায় কখনোই শেষ হয় না পুরোপুরি। প্রযোজককে শেষমেশ নিজের পকেট থেকে কিছু না কিছু বের করতেই হয়। পরিচালনা আর অভিনয়ের পাশাপাশি মীর সাব্বির এই সিনেমার প্রযোজকও। তাকেও নিজের পকেটে হাত দিতে হয়েছে। দু-চার লাখ নয়, মীর সাব্বির প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকা লগ্নি করে ফেলেছেন রাত জাগা ফুল বানাতে গিয়ে, সব মিলিয়ে বাজেটটা তাই কোটির অঙ্ক পেরিয়ে গেছে। 

রইস চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ওজন বাড়িয়েছেন সাব্বির

রাত জাগা ফুলের কাস্টিংয়ে চমক রেখেছেন সাব্বির। নাট্যজগতের প্রতিভাবান অভিনেতা অভিনেত্রীদের বড় একটা অংশকে তিনি নিয়েছেন নিজের সিনেমায়। ফজলুর রহমান বাবু, আবুল হায়াত, রাশেদ মামুন অপু, এজাজুল ইসলাম, জয়রাজ, দিলারা জামান, শর্মিলি আহমেদ- এতসব দুর্দান্ত অভিনেতা-অভিনেত্রী এক সিনেমায় কাজ করছেন। ঐশী বা তানভীরের মতো তরুণ তুর্কীরাও আছেন অ্যাক্টর’স লিস্টে।

মীর সাব্বির সবচেয়ে বড় ছক্কাটা হাঁকিয়েছেন সিনেমার মিউজিকের জায়গাটায়। অভিনেতা মীর সাব্বিরকে চিনতাম। পরিচালক মীর সাব্বিরের কথাও শুনেছি। এই ভদ্রলোক যে দারুণ গানও লিখতে পারেন, সেটা জানা ছিল না। এই সিনেমার সবগুলো গান তার লেখা। এবং প্রত্যেকটা গানই শ্রুতিমধুর। বিশেষ করে মমতাজের গাওয়া টাইটেল ট্র্যাকের তুলনা নেই। এই গান জাতীয় পুরস্কার ডিজার্ভ করে। ইমন চৌধুরী মিউজিক কম্পোজার হিসেবে কাজ করেছেন রাত জাগা ফুলে। এই সিনেমায় হৃদয় খানের গান আছে, নচিকেতা গেয়েছেন, জলের গানের রাহুল আনন্দকে মীর সাব্বির নিয়ে এসেছেন সিনেমায় প্লেব্যাক করাতে। এস আই টুটুলও সম্ভবত অনেকদিন পর সিনেমায় গাইলেন। ভরপুর একটা প্যাকেজ, সন্দেহ নেই।

অভিনেতা মীর সাব্বিরের কাছে ফিরি আবার। একজন অভিনেতার শুরুটা যত ছোট পরিসরেই হোক না কেন, তার আল্টিমেট গোল থাকে সিনেমায় কাজ করা। বড় পর্দায় নিজেকে দেখতে চাওয়ার আদিম বাসনাটা মনের ভেতর কাজ করে প্রতিটি অভিনয়শিল্পীর। মীর সাব্বিরও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। নাটক তো অনেক করেছেন। সিনেমাতেও অভিষেক হয়েছে আগেই। কিন্তু ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কি জাদু করিলা’ কিংবা ২০১৭ সালের ‘ভালোবাসা এমনই হয়’- দুটির কোনোটিই আসলে সাব্বিরের সিনেমা নয়। সেখানে আলাদা করে নজর কাড়ার মতো কিছু করারই ছিল না তার। কাজেই ‘কেউ আমাকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার কথা ভাবেনি’- এই অভিযোগ সাব্বির করতেই পারেন।

রইস চরিত্রের জন্য নিজের সবটুকু ঢেলে দিয়েছেন সাব্বির

সেজন্যেই হয়তো মীর সাব্বির নিজেকে নিয়ে নিজেই একটা এক্সপেরিমেন্ট করলেন। সেই এক্সপেরিমেন্টের ফসল রাত জাগা ফুল। সেই এক্সপেরিমেন্টের ফলেই জন্ম 'রইস' নামের চরিত্রটির। অঞ্চলভিত্তিক গল্প নিয়ে নির্মিত নাটকে একের পর এক অভিনয় করে যে সাব্বির নিজেকে ক্লিশে বানিয়ে ফেলেছিলেন, তারই যেন পূনর্জন্ম হলো নিজের বানানো সিনেমায়৷ সিনেমা হিসেবে রাত জাগা ফুল কতটা ভালো, সেটার বিচার দর্শক করবেন। সিনেমা দেখতে গিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, সাব্বির নিজের সর্বস্বটা ঢেলে দিয়েছেন রাত জাগা ফুলে। সেটা রইস চরিত্রের ভেতরে ঢোকার বেলাতেও, গাঁটের পয়সা ঢেলে গোটা সিনেমার কাজ শেষ করার বেলাতেও।

এমন রূপে মীর সাব্বিরকে দেখব, সিনেমা দেখার আগে সেটা কল্পনা করিনি। সাব্বির এত ভালো পারফর্ম করবেন, এমনটাও ছিল না এক্সপেক্টেশনে। এজন্যেই অবাক হয়েছি, চমকে গিয়েছি। প্রায় টাইপকাস্ট হয়ে পড়া একজন অভিনেতাকে নিজেকে ভেঙেচুরে এভাবে কামব্যাক করতে দেখাটা দর্শক হিসেবে খুব এন্টারটেইনিং, কোন সন্দেহ নেই। রইস হয়ে মীর সাব্বির সেই অনুভূতিটা উপহার দিয়েছেন আমাকে। রাত জাগা ফুল কোন মাস্টারপিস নয়, সিনেমায় ভুলত্রুটি আছে, আছে সমালোচনার জায়গাও। কিন্তু মীর সাব্বিরের অভিনয় একটা টুপিখোলা অভিবাদন পাবে, সেখানে খুঁত ধরার জায়গা নেই। গল্পটা মীর সাব্বিরের লেখা, চিত্রনাট্যও তার। যেভাবে তিনি যত্ন নিয়ে রইস ক্যারেক্টারটাকে বিল্ড করেছেন, এবং অভিনেতা হিসেবে যেভাবে সেই চরিত্রটাকে টেনে নিয়ে গেছেন, সেটা এক কথায় দুর্দান্ত।

ভালো কাজ করলে তার কাছে এক্সপেক্টেশন তৈরি হবেই। রাত জাগা ফুলের পর মীর সাব্বিরের কাছেও সেই প্রত্যাশার জায়গাটা গড়ে উঠবে। এতদিন আমাদের কাছে মীর সাব্বির ছিলেন গড়পড়তা একজন অভিনেতা। রাত জাগা ফুল এবং রইস তাকে সেই জায়গাটা থেকে আলাদা করেছে। নতুন এক মীর সাব্বিরের জন্ম হয়েছে এই সিনেমা দিয়ে। মীর সাব্বির ভার্সন ২.০। সেই স্বত্বাটাকে জিইয়ে রাখার দায়িত্ব তারও। অভিনেতা বা নির্মাতা হিসেবে নিজের কাজের স্ট্যান্ডার্ড মেন্টেইনের একটা বাড়তি বোঝা তার ঘাড়ে চেপে বসবে এখন থেকে। সাব্বির সেটা উপভোগই করবেন সম্ভবত!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা