অসহিষ্ণু এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রতিক্রিয়াশীল জনগোষ্ঠীতে ভরপুর এই রাষ্ট্রে একটা মেইনস্ট্রিম সিনেমার সংলাপে জঙ্গীবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে শহীদ হবার ব্যাপারটাকে তুলে আনাটা ভীষণ চ্যালেঞ্জিং কাজ। এই সাহসের জন্যেই মিশন এক্সট্রিমের নির্মাতারা একটা হাততালি পেতে পারেন...

২০০৬ সালের কথা। রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা একটা সিনেমা বানিয়েছেন, নাম 'রঙ দে বাসন্তী'। কলেজ পড়ুয়া কয়েক বন্ধুর গল্পের সঙ্গে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘটনাকে ব্লেন্ড করেছেন তিনি। সিনেমার একটা দৃশ্যে সেই তরুণেরা ভারতের দুর্নীতিবাজ প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকে খুন করে। ভারতের সেন্সর বোর্ডের প্রধান তখন শর্মিলা ঠাকুর। তার মেয়ে সোহা আলী খান অভিনয় করেছেন এই সিনেমায়৷ অথচ সেন্সর বোর্ডের সদস্যরা ছবিটা আটকে দিলেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকে খুন করার দৃশ্যটা নিয়েই তাদের যত আপত্তি। 

পরিচালক রাকেশ এবং অভিনেতা আমির খান ছুটে গেলেন প্রণব মুখার্জীর কাছে। কংগ্রেসের প্রয়াত এই দাপুটে নেতা তখন ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঘটনা শুনে তিনি বললেন, আপনারা একটা স্পেশাল শো-য়ের আয়োজন করুন। আমরা সিনেমাটা দেখি। স্পেশাল শো আয়োজিত হলো। প্রণবের পাশাপাশি সেখানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের তিন বাহিনীর প্রধান এবং আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও সরকারী কর্মকর্তা। প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পর একটা গুঞ্জন উঠলো, একেকজন একেক রকমের মতামত জানাচ্ছেন। প্রণব মুখার্জী সেই স্রোতে ভাসলেন না৷ শুধু বললেন, ছবিটাতে কোন সমস্যা দেখছি না আমি। সেন্সর বোর্ডের উচিত ছাড়পত্র দিয়ে দেয়া৷ 

পরে প্রণবের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কেন সিনেমাটাকে ক্লিন চিট দিয়েছিলেন তিনি? প্রণব বলেছিলেন, 'ডিফেন্স মিনিস্টার হিসেবে আমার কাজ দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকা। একটা সিনেমা- তার গল্পে যাই থাকুক না কেন, সেটা আটকে দেয়া আমার কাজ নয়। সেটার জন্য আলাদা লোক আছেন, আলাদা সংগঠন আছেন।' 

আরেকটা রঙ দে বাসন্তী এখন আর বানানো সম্ভব নয়

রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা হয়তো প্রকাশ্যে স্বীকার করবেন না কথাটা। কিন্তু তাকে মানতেই হবে যে, এই ২০২১ সালে এসে রঙ দে বাসন্তীর মতো একটা সিনেমা তিনি বানাতে পারবেন না, কেউই পারবে না। সেন্সরই পার হতে পারবে না সিনেমাটা। ওয়েব প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেলেও দেখবেন সপ্তাখানেক পরেই বিভিন্ন সংগঠনের উৎপাতে বাধ্য হয়ে করজোড়ে ক্ষমা চাইতে হবে নির্মাতা এবং অভিনেতাদের। সরকারের মন্ত্রীকে খুন! হোক না সিনেমায়, উপমহাদেশের দর্শক এই দৃশ্য বরদাশত করার সময়টা থেকে পিছিয়ে এসেছে অনেক দূরে। 

আরেক বিড়ম্বনার মুখোমুখি আপনাকে হতে হবে, সিনেমায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কিছু দেখাতে গেলে। শাপলা মিডিয়ার সাথে কলকাতার নায়ক দেব একটা সিনেমা করছিলেন, নাম সম্ভবত কমান্ডো। সেটার পোস্টারে দেবের পেছনে আরবীতে কালেমা লেখা একটা পতাকা দেখানো হয়েছিল। তাতেই সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে সেই সময়। কেউ কেউ তো পারলে দেবের টুঁটি চেপে ধরেন, অনেকে আবার সিনেমা নিষিদ্ধের দাবী তুললেন৷ অথচ আফ্রিকান জঙ্গি সংগঠন আল শাবাব এমন পতাকা ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট যখন জিম্মিদের শিরচ্ছেদ করে, তখনও এমন পতাকা শোভা পায় ব্যাকগ্রাউন্ডে। কিন্তু সেই জিনিসটাই সিনেমায় দেখালে সমস্যা! 

সমস্যাটা আসলে পতাকায় নয়। সমস্যাটা মানসিকতায়৷ আমরা যে মুখে বলছি যে ধর্ম কোনোভাবেই জঙ্গীবাদকে সমর্থন করে না, সেই মুখেই আবার সিনেমায় জঙ্গীবাদ দেখানো হলে অথবা দাঁড়ি-টুপিধারী কাউকে খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হলে 'ধর্মকে হেয় করা হচ্ছে' টাইপের অপবাদ দিচ্ছি। দুটো মতামত যে পরস্পর বিরোধী, সেটা মাথায় রাখছি না। আপনাকে বুঝতে হবে, হোলি আর্টিজানের ঘটনা নিয়ে সিনেমা বানাতে গেলে জঙ্গীর মুখে 'আল্লাহু আকবর' শ্লোগানটাই শোভা পাবে, অন্য কিছু নয়। ধর্মকে যদি কেউ ছোট করে থাকে, ভুলভাবে উপস্থাপন করে থাকে, সেটা এই জঙ্গীরা করছে। সিনেমায় তাদের কাজকর্ম তুলে ধরার মধ্যে 'ধর্ম অবমাননা' খুঁজতে যাওয়াটা বোকামী। 

মিশন এক্সট্রিমের একটি দৃশ্যে আরিফিন শুভ

ধর্মের আফিম খাইয়ে কাউকে নেশায় বুঁদ করে স্বার্থ হাসিলের এই খেলাটা অনেক পুরনো। অপরাধী হিসেবে কাউকে সাব্যস্ত করতে হলে এই খেলার পরিকল্পনাকারী আর ক্রীড়নকদের করুন। নাটক-সিনেমায় জঙ্গীবাদের মতো ইস্যুর উঠে আসাটা বরং সচেতনতা তৈরিতে সাহায্য করে। যেটা তারেক মাসুদের 'রানওয়ে' করতে পেরেছিল। সেই সিনেমার বিরুদ্ধেও বিদ্বেষানল ছড়ানো হয়েছিল তখন। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এভেইলেবল ছিল না তখন, তাই হয়তো এখনকার প্রজন্ম সেই অস্থির সময়টার কথা মনে করতে পারবে না। হত্যার হুমকি থেকে দেশ ছাড়ার পরামর্শ- কোনটা পাননি তারেক-ক্যাথরিন দম্পতি? মিথ্যে অপবাদ দিয়ে এমন প্রচেষ্টাগুলোকে রুখে দেয়াটা বরং চক্রান্তকারীদের পরিকল্পনার পালেই বাতাস দেয়, সেটা না জেনেই হয়তো আমরা হুজুগে মেতে বিরোধিতা করি। 

মিশন এক্সট্রিমের ট্রেলার দেখলাম। একটা সংলাপ আছে সেখানে- 'বিজয়ী হয়েই ফিরব, আর নাহয় একসাথে শহীদ হবো!' এই ২০২১ সালে, যখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মোটামুটি তলানিতে, ধর্মীয় চেতনার চেয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা, উগ্রবাদ আর ধর্মান্ধতাই জেঁকে বসেছে শক্ত করে, যখন ফেসবুক স্ট্যাটাসের অজুহাত তুলে অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় আর বাসস্থানে হামলা চালানো হয়, লুটপাট করা হয়, সেই অস্থির সময়টায় এই সংলাপের সাহসিকতা নিয়ে আলাপ হওয়া দরকার বলে আমি অন্তত মনে করি। 'শহীদ' টার্মটা ইসলাম ধর্মে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আর এই শহীদি সুধার লোভ দেখিয়েই তরুণদের ব্রেইনওয়াশ করা হয়, জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করা হয়। মেধাবী ছেলেগুলো জোম্বির মতো আচরণ শুরু করে শহীদ হবার নেশাতেই। তারা বুঝতেই পারে না, ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতি ঘৃণার বিষবাস্প গুঁজে দেয়া হচ্ছে তাদের অন্তরে, তারা পরিচালিত হচ্ছে অন্য কারো চাহিদা অনুসারে, তারা ব্যবহৃত হচ্ছে বিশাল কোন মাস্টারপ্ল্যানের ছোট্ট গুটি হিসেবে। 

মিশন এক্সট্রিমের একটি দৃশ্যে তাসকীন রহমান

মিশন এক্সট্রিম সিনেমা হিসেবে কেমন হবে, সেটা কয়েক মুহূর্তের জন্য ভুলে যান। ভুলে যান অ্যাক্টিং, ডিরেকশন, স্ক্রিনপ্লে কিংবা অন্য সব টেকনিক্যাল দিকের কথাও। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করুন, অসহিষ্ণু এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রতিক্রিয়াশীল জনগোষ্ঠীতে ভরপুর এই রাষ্ট্রে একটা মেইনস্ট্রিম সিনেমার সংলাপে জঙ্গীবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে শহীদ হবার ব্যাপারটাকে তুলে আনাটা কতটা চ্যালেঞ্জিং কাজ। এই সাহসের জন্যেই মিশন এক্সট্রিমের নির্মাতারা একটা হাততালি পেতে পারেন।

চলচ্চিত্র পরিচালক খিজির হায়াত খান প্রায় এরকম একটা চেষ্টা করেছিলেন। তার সবশেষ সিনেমা 'মিস্টার বাংলাদেশ' এর গল্পেও জঙ্গিবাদের সরব উপস্থিতি ছিল। কিন্তু টেকনিক্যাল দিক থেকে সিনেমাটা এত বেশি দুর্বল ছিল যে, সেখানে আলাদা করে জঙ্গীবাদকে ইস্যু করার ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলার জো ছিল না। বিগ বাজেটের মিশন এক্সট্রিম যে সেই পথে হাঁটবে না- সেটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। সিনেমাকে মিডিয়াম বানিয়ে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার ব্যাপারটাতে মিশন এক্সট্রিম হয়তো 'হুইসেল ব্লোয়ার' নয়, কিন্তু জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে সেলুলয়েডে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বড় আওয়াজটা এই সিনেমাই তৈরি করুক, এমন প্রত্যাশা রইলো...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা