একজন সিনেমাপ্রেমী হিসেবে অবশ্যই চাইবো ঢাকা অ্যাটাকের দর্শকপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে যাক মিশন এক্সট্রিম। কারণ, যতটা না মিশন এক্সট্রিমের দরকার মিশন এক্সট্রিম সফল হওয়া, তার চেয়ে বেশি দরকার বাংলা সিনেমার জন্য, সিনেমা হলের সার্ভাইভ করার জন্য...

টাইটেল দেখে একটু অবাক হতেই হবে। কারণ, শেষে আবার একটি বিস্ময়বোধক চিহ্নও দিয়ে রেখেছি। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় মিশন এক্সট্রিম এই দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা হতে যাচ্ছে। এর কারণ আসলে বেশ কিছু, সেগুলো বলেই এক্সট্রিমের ট্রেইলার নিয়ে কিছু হতাশার কথা বলবো।

কারণ- ১

কমার্শিয়াল পটবয়েলার সিনেমার প্রয়োজনীয়তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে- করোনা আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির কঙ্কালসার দেহকে একদম স্পষ্ট করে দিয়ে গেছে। সিঙ্গেল স্ক্রিন বন্ধ হয়েছে মফস্বলগুলোতে। সিনেপ্লেক্সের মতো জনবহুল জায়গাগুলোতেও মানুষ এখন যাবার আগে দুবার ভাবছে। তাই ইন্ডিপেন্ডেন্ট সিনেমার কথা তো বাদই দেই। একটু কমার্শিয়াল ধাঁচের সিনেমাও মুক্তি দেবার আগে প্রযোজকরা দুই তিনবার করে ভাবছেন। কারণ, এখন সিনেমা রিলিজ দেয়া মানেই লস প্রজেক্ট। 

পাশের দেশ ভারতেও অক্ষয় কুমার, সালমান খানদের মতো বক্স অফিস জায়ান্টরা রিস্ক নিয়ে লসের সম্মুখীন হয়েছে। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতে হতোই। তাই তারাই সে দায়িত্বটা নিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে সে দায়িত্ব কে নেবে? 

ট্রেইলারের একটি দৃশ্যে আরিফিন শুভ ও ঐশী

ঢাকা অ্যাটাক টিম এখানেই ‘ফার্স্ট মুভার’ হলেন, এক্সাম্পল ক্রিয়েট করলেন। একে তো ঢাকা অ্যাটাকের সফলতার বিশাল ব্যাগেজ, তার ওপর রিলিজের ঘোষণা দিয়েও বারবার করোনার কারণে পিছিয়ে যাওয়া। ওদিকে হল বন্ধ হচ্ছে আর এদিকে সিনেপ্লেক্সে মন্দার বাতাস। কোন প্রযোজকই সাহস করবেন না বিগ বাজেটের একটি সিনেমা এমন সময়ে রিলিজ দিতে। কিন্তু মিশন এক্সট্রিম সে সাহসটা করলো। সেজন্য তাদের সাধুবাদ জানাই। একটা কমার্শিয়াল পটবয়েলার সিনেমাই এখন হলে প্রাণ ফেরাতে পারে। হলগুলোতে দর্শক নিয়ে আসতে পারে। 

কারণ-২

প্রাসঙ্গিক ঘটনাকে সাহস করে সামনে নিয়ে আসা- শিল্প-সংস্কৃতির কাজ কী? আমার মতে সময়কে ধারণ করাই শিল্প-সংস্কৃতির মূল কাজ। অথচ আমাদের রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা কেন যেন সিনেমায় উঠে আসে না আর বর্তমানে। একসময় রাজ্জাকরা যুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনকে রুপালী পর্দায় নিয়ে এসেছেন, সালমান শাহ-শাবনূর ছাত্র রাজনীতি নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন, মান্নারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ভয়াল রূপ তুলে ধরেছেন কিন্তু এরপরই কেমন যেন স্থবিরতা! 

ঢাকা অ্যাটাক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে টাচ করে গিয়েছিল কিন্তু গভীরে যায় নি তেমন। মিশন এক্সট্রিম সেখানে জঙ্গিবাদের উত্থানকে তুলে নিয়ে আসছে, এবং তা অবশ্যই সাহসী সিদ্ধান্ত। কেননা, বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে ও কখনো কখনো প্রকাশ্যে জঙ্গিবাদের মোকাবেলা করে যাচ্ছে, সে গল্পগুলোর পর্দায় আসা প্রয়োজন ছিল। সময়ের দাবি মিটিয়ে যে মিশন এক্সট্রিম সেরকমই এক গল্প সামনে নিয়ে আসছেন তা অবশ্যই সাধুবাদ পাবার যোগ্য।

এবার আসি ট্রেইলার প্রসঙ্গে। প্রথমেই ভিএফএক্স নিয়ে একটু হতাশার কথা বলি। মিশন এক্সট্রিম নিয়ে যে পরিমাণ প্রত্যাশা আমাদের সে তুলনায় ভিএফেক্সের কাজ কিছুটা দুর্বলই আমি বলবো। কিন্তু অনেকেই যেমন বলছেন বাইরে থেকে ভিএফেক্সের কাজ করিয়ে নিয়ে আসা যেত, সেটার আমি বিপক্ষে। কারণ দেশের গল্প বলা দেশের ছবির কাজ দেশীয় কলাকুশলীদের দ্বারা করালেই একসময় তারা উন্নতি করবে। মিশন এক্সট্রিম টিম যে দেশীয় আর্টিস্টদের এমপাওয়ার করেছে এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সিনেমার স্কেল অনুযায়ী ভিএফএক্স কিছুটা দুর্বলই বটে। তবে, আমাকে মুগ্ধ করেছে বেশ কিছু ডিটেইলিং।

মিশন এক্সট্রিমে তাসকিন রহমান

যেমন, ক্যামেরার কাজ খুব দারুণ লেগেছে। বাংলাদেশকে দেখানোর জন্য জনপ্রিয় স্থাপনার শ্যুট থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু শট, মরুভূমিতে গানের দৃশ্যায়নগুলো দারুণ ছিল। তারপর বাইক চেজে হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরার কাজ নতুনত্ব এনেছে। আর একশন তো দারুণ কিছুর আভাস দিচ্ছেই তবে নতুন লাগলো কিছু পারকোর সিন আর বম্ব ডিফিউজ করার টেকনোলজি দেখে। শেষমেশ আমাদের একশনেও নতুন কিছু আসছে। 

মূল চরিত্রে শুভকে ঢাকা অ্যাটাকের চেয়ে বেশ মারমুখী লেগেছে। তাঁর লীন বডি খুবই আকর্ষণীয় ছিল, সবচেয়ে ভালো লেগেছে তাঁর বডি না দেখানোয়। যদি সিনেমাতেও বডি না দেখায় তাহলেও বেশ খুশি হবো। কারণ, বডি শো করা এরকম সিরিয়াস ফিল্মে বাড়াবাড়িই লাগে। আর যার আছে তাঁর দেখানোর কিছু নেই। যেমন ওয়ার সিনেমায় ঋত্বিক বাইসেপই দেখিয়েছে শুধু, বডি রিভিল করে নি। কারণ, তাঁর ক্যারেক্টারের টোনের সাথে সেটা যায় না। শুভর ক্যারেক্টার তাই বডি রিভিল না করলেই খুশি হবো আর যদি করেই দর্শকচাহিদা মাথায় রেখে তাহলে সিচুয়েশনটাও সেরকম দারুণ হোক সেটাই চাইবো। 

আর যার কথা না বললেই নয় তিনি হচ্ছেন তাসকীন। খুবই খুশি হয়েছি তাকে কোন ডায়লগ না দেয়ায়, রিভিল না করায়। কারণ, সে ই ছিল ঢাকা অ্যাটাকের সারপ্রাইজ প্যাকেজ। এখানেও যে তাকে আগলে রাখা হয়েছে, সিনেমায় রিভিল করার জন্য এটা দারুণ ট্রিক্স। 
সবমিলিয়ে মিশন এক্সট্রিম বেশ আশার আলো দেখাচ্ছে। একজন সিনেমাপ্রেমী হিসেবে অবশ্যই চাইবো ঢাকা অ্যাটাকের দর্শকপ্রিয়তা ছাড়িয়ে যাক মিশন এক্সট্রিম। কারণ, যতটা না মিশন এক্সট্রিমের দরকার মিশন এক্সট্রিম সফল হওয়া, তার চেয়ে বেশি দরকার বাংলা সিনেমার জন্য, সিনেমা হলের সার্ভাইভ করার জন্য।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা