তরুণদের মধ্যে রবীন্দ্র সঙ্গীতের চর্চা যারা করে, তাদের কাছে মিতা হক তো মায়ের মতোই ছিলেন, ছিলেন বটবৃক্ষ, যিনি ছায়া দিয়ে আগলে রাখতেন সবাইকে। এমন একজনকে হারানোর শূন্যতা কি পূরণ হবে কখনও?

মিতা হকের সঙ্গে তোলা একটা ছবি আপলোড দিয়ে কলকাতার শিল্পী সাহানা বাজপেয়ী লিখেছেন- 'তুমি মায়ের মতোই ভালো...' মাত্র ৫৯ বছর বয়সে মিতা হকের অকালপ্রয়াণে আজ যারা তাকে স্মরণ করছেন, তাদের মধ্যে সাহানার সম্বোধনেই মনটা সবচেয়ে বেশি বিষণ্ণ হয়েছেন সত্যিই তো, তরুণদের মধ্যে রবীন্দ্র সঙ্গীতের চর্চা যারা করে, তাদের কাছে মিতা হক তো মায়ের মতোই ছিলেন, ছিলেন বটবৃক্ষ, যিনি ছায়া দিয়ে আগলে রাখতেন সবাইকে। 

সেই বটবৃক্ষটা আজ পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে। করোনা কেড়ে নিলো মিতা হককে। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর এই শিল্পীকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। কিন্তু, চার দিন আগে করোনার ফলাফল নেগেটিভ আসার পর তাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়। তার শরীরের অবস্থার অবনতি হলে আবারও তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ চলে গেলেন খ্যাতিমান এই সংগীতশিল্পী।

মিতা হকের জন্ম ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায়। তিনি প্রয়াত অভিনেতা খালেদ খানের স্ত্রী। তাঁর চাচা দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক ও রবীন্দ্র গবেষক ওয়াহিদুল হক। মেয়ে জয়িতাও একজন রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী। রবীন্দ্রসংগীত জগতে জনপ্রিয় এই শিল্পীর এককভাবে মুক্তি পাওয়া অ্যালবাম ২৪টি।

সাহানা বাজপেয়ী ও মিতা হক

মিতা হক প্রথমে তার চাচা ওয়াহিদুল হক এবং পরে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খান ও সন্‌জীদা খাতুনের কাছে গান শেখেন। ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি তবলাবাদক মোহাম্মদ হোসেন খানের কাছে গান শেখা শুরু করেন। তিনি বাংলাদেশ বেতারের সর্বোচ্চ গ্রেডের তালিকাভুক্ত শিল্পী। ১৯৯০ সালে বিউটি কর্নার থেকে প্রকাশিত হয় মিতা হকের প্রথম রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবাম ‘আমার মন মানে না’। সংগীতায়োজনে ছিলেন সুজেয় শ্যাম।

এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রায় ২০০টি রবীন্দ্রসংগীতে কণ্ঠ দিয়েছেন মিতা হক। তাঁর এককভাবে মুক্তি পাওয়া মোট ২৪টি অ্যালবাম আছে। এর মধ্যে ১৪টি ভারত থেকে ও ১০টি বাংলাদেশ থেকে। মিতা হক দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি কিডনির সমস্যার জন্য ডায়ালাইসিস করাচ্ছিলেন।

গুণী এই শিল্পী ২০১৬ সালে শিল্পকলা পদক লাভ করেন। সংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০২০ সালে একুশে পদক প্রদান করে।। ‘সুরতীর্থ’ নামে একটি গানের স্কুলও রয়েছে তাঁর। একসময় ছায়ানটের রবীন্দ্রসংগীত বিভাগের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন পরিষদের সহসভাপতিও ছিলেন।

মানুষ হিসেবে মিতা হক প্রচণ্ড জনপ্রিয় ছিলেন তার সমসাময়িক শিল্পীদের কাছে, এমনকি অনুজদের কাছেও। দম্ভ কিংবা অহঙ্কারের ছিটেফোঁটাও ছিল না তার মধ্যে। বয়সে যারা ছোট, তাদের সাধ্যমতো পরামর্শ দিতেন, ভুল শুধরে দিতেন, তারাও আগ্রহ নিয়ে ছুটে আসতো তার কাছে। মিতা হক বলতেন- ‘‘ আমার গুরু বলেছেন, নিজে যতটুকু জানবে অন্যদের শেখাবে। নিজে যতটুকু শিখবে, অন্যদের জানাবে। একা বড় হতে নেই। আমি এই কথাটি এখনও মেনে চলি। দল নিয়ে, সঙ্গীদের নিয়ে একসাথে পুরোটা ভাবি।’’

এমন সঙ্গীত অন্তঃপ্রান একজন মানুষের বিদায়ে মন বিষণ্ণ হওয়াটাই স্বাভাবিক... 

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা