স্বর্ণপদক জয়ী তুখোড় ছাত্রী, ভালো অভিনেত্রী, ভালো নাচতে পারেন, দারুণ কণ্ঠশিল্পী, চমৎকার আঁকিয়ে, ব্র‍্যাকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা- সবকিছু ছাপিয়ে মিথিলা আমাদের কাছে শুধুই ট্রলের বস্তু! কিন্তু আমাদের এই আচরণ কি মিথিলা ডিজার্ভ করেন?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাফিয়াথ রশীদ মিথিলাকে যে পরিমাণ ব্যক্তি আক্রমণ এবং ভব্যতার সীমা ছাড়ানো সাইবার বুলিংয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, এই পরিমাণের নোংরামি বোধহয় বাংলাদেশের আর কোন সেলিব্রেটিকে সইতে হয়নি। রূপে, গুণে, মেধায় অনন্যা এই তরুণী তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে অজস্র মানুষের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছেন, যেখানে তার কোন দোষ ছিল না, দায় ছিল না। মিথিলার আজ জন্মদিন। তাই এই ট্রলের সীমা ছাড়িয়ে, 'অভিনেত্রী' বা 'তাহসানের সাবেক স্ত্রী' পরিচয়ের বাইরে থাকা আরেকজন মিথিলাকে নিয়ে দুটো লাইন লিখতে ইচ্ছে হলো। 

ছোটবেলা থেকে তিনি তুখোড় ছাত্রী। যে পরিবারে তার বেড়ে ওঠা, সেখানে সংস্কৃতির চর্চাটা আছে, কিন্তু পড়াশোনায় ভালো হওয়াটা প্রথম শর্ত। মিথিলাও সেই সূত্র মেনেই এগিয়েছেন। ঢাকার ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি এবং এইচএসসি পাশ করার পর মেধা তালিকায় সুযোগ পেয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি, রেজাল্ট ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট। 

ততদিনে মিথিলা মিডিয়াতে পরিচিত মুখ, জনিপ্রিয়ও। নাটক করছেন, মডেলিং করছেন, লাখ লাখ মানুষ তার ভক্ত। কখনও তিনি তাহসানের সঙ্গে জুটি বাঁধেন, তো কখনও মোশাররফ করিমের সঙ্গে। দর্শক প্রতিবার তাকে লুফে নেয়। মধুরেণসমাপয়েৎ থেকে ল্যান্ডফোনের দিনগুলিতে প্রেম, হি এন্ড শি থেকে দেনমোহর- মিথিলার ক্যারিয়ার গ্রাফ তখন ওপরের দিকেই উঠছে। 

রাফিয়াথ রশীদ মিথিলা

চাইলেই মিথিলা তার পড়াশোনায় দাড়ি টেনে দিতে পারতেন সেখানে, পুরোপুরি মন দিতে পারতেন মিডিয়াতে। কিংবা সংসারে, তিনি তখন আয়রার মা-ও। কিন্তু মিথিলা নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটলেন। একাডেমীক ক্যারিয়ারের এভারেস্ট চূড়ায় ওঠার টার্গেটটা যে অনেক আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন তিনি। পাড়ি জমালেন আমেরিকায়। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের 'কলেজ অফ এডুকেশন এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট, মিনিয়াপোলিস' থেকে 'কন্টেম্পোরারি এপ্রোচেস টু কারিকুলাম এন্ড ইন্সট্রাকশন' বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিলেন তিনি। 

তাতেও মিথিলা ক্ষান্ত হলেন না। দেশে ফিরে ব্র‍্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার মাস্টার্সে ভর্তি হলেন, এবারের বিষয় আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট। সেখানে চারের স্ট্যান্ডার্ডে মিথিলার সিজিপি ছিল বরাবর চার! এই ফলাফলকে অবিশ্বাস্য বললেও কম বলা হয়। আর এমন দুর্দান্ত রেজাল্টের কারণে ২০১৭ সালে চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল অর্জন করেন তিনি। 

আপনি যদি মিথিলাকে শুধু একজন অভিনেত্রী ভেবে থাকেন, তাহসানের স্ত্রী হিসেবেই চিনে থাকেন, তাহলে আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। এই ভদ্রমহিলা নিজের প্রতিভায় সূর্যের মতো জ্বলছেন শুরু থেকেই। তাহসানের সঙ্গে পরিচয়েরও অনেক আগে থেকেই মিথিলা মডেলিং করতেন। বিবিসি বাংলার ইংরেজী ভাষায় দক্ষতা বাড়ানোর প্রোগ্রাম বিবিসি জানালার ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন তিনি। এখন ব্র‍্যাকের আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের প্রধান হিসেবেও নিযুক্ত আছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি মিথিলা দারুণ গান করেন, ভালো নাচেন, তার ছবি আঁকার হাতও চমৎকার। তার আঁকা ছবি নিয়ে দৃক গ্যালারিতে প্রদর্শনীও আয়োজিত হয়েছে। শিশুদের জন্য তিনি বইও লিখেছেন বেশ কয়েকটি। 

মিথিলা: শাড়িতে বাঙালী নারী

এক অঙ্গে এত গুণ- মিথিলাকে ব্যাখ্যা করার জন্য সবচেয়ে ভালো লাইন বোধহয় এটাই হতে পারে। অথচ আমাদের দেশের সিংহভাগ মানুষের কাছে মিথিলা নামটা যেন গালির মতোই। একদল মানুষ ঘরেত খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো করে মিথিলাকে ট্রল করে যান, সেসব ট্রল নোংরামির সীমা ছাড়ায় প্রায়শই। সেসব নিয়ে কথা বলতে হয় মিথিলার সাবেক স্বামী তাহসানকেও। ডিভোর্সকে যে আমাদের সমাজে 'অপরাধ' হিসেবে দেখা হয়, এবং ডিভোর্সের দায় যে এখনও এই সমাজ নারীর ঘাড়েই চাপায়, সেটারই চমৎকার একটা কেস স্টাডি মিথিলার ঘটনাটা।

একটা মানুষ পড়াশোনায় এমিন অভূতপূর্ব কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, যে কাজটাই করেছেন সেখানে সোনা ফলিয়েছেন, তবুও এতসব এড়িয়ে যদি আপনার চোখে যদি মিথিলার ডিভোর্সটাই চোখে ভাসে- তাহলে বলতেই হচ্ছে, আপনি মানসিকভাবে অসুস্থ। ব্যক্তিগত জীবনে যারা চরমভাবে হতাশ, প্রফেশনাল লাইফে যাদের বলার মতো কোন অর্জন নেই, হাতে কাজ নেই, আছে মাথাভর্তি উটকো চিন্তা আর মোবাইল ভর্তি ডাটা- তাদের পক্ষেই সম্ভব অকারণে একজন নারীকে এভাবে নোংরাভাবে ব্যক্তি আক্রমণ করা। 

একটা মানুষ কাকে বিয়ে করবেন, কার সঙ্গে সম্পর্কে জড়াবেন, সেসব কি ভোটাভুটি করে জনগনের সিদ্ধান্ত নিয়ে করতে হবে? তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যেভাবে চর্চা সবাই করেছে, এই অসভ্যতাটা মিথিলা ডিজার্ভ করেন না, কোনোভাবেই না। মানুষ মিথিলাকে আপনি সম্মান করতে না পারেন, তাকে আপনার পছন্দ না-ও হতে পারে। কিন্তু তাকে অকারণে অসম্মান করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? তাকে নিয়ে নোংরামি করার অধিকারটাই বা আপনারা কোথায় পেয়েছেন? 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা