টানা তেতাল্লিশ বছর ধরে একটা ইন্ডাস্ট্রিতে থাকা, এবং শুধু থাকা না, বীরদর্পে সেই ইন্ডাস্ট্রিকে ইন্ডিয়ার অন্যতম ব্রিলিয়ান্ট ইন্ডাস্ট্রি'তে রূপান্তরিত করার অসাধ্যসাধন-যাত্রার রথের সারথি অনেকে হলেও চালক একজনই; মোহনলাল...

আঠারো বছর বয়সে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আসেন তিনি। অভিনয় করেন এক সিনেমায়। কিন্তু বিধিবাম, সে সিনেমা মুক্তি পেতে লেগে যায় দুই যুগ! টানা পঁচিশ বছর ধরে সেন্সরশীপ ইস্যুতে আটকে থাকে আঠারো বছর বয়সী এ  অভিনেতার সেই সিনেমা। কিছুটা বিলম্বিত হয় তাঁর পর্দায় আসা৷ খানিকটা উসাইন বোল্টের স্টার্টিং এর মতন হয়ে দাঁড়ায় বিষয়টি। উসাইন বোল্টের রেসের স্টার্টিং বরাবরই হতাশাজনক। তিনি পুষিয়ে দেন ফিনিশিং এ। আজকে যাকে নিয়ে কথার ফুলঝুরি, তিনি এখনো দৌড়াচ্ছেন। তাঁর ফিনিশিং উসাইন বোল্টের মতন হবে কী না, তা জানা নেই৷ তবে যে গতিতে তিনি দৌড়াচ্ছেন, আশেপাশে, ত্রিসীমানায় আসতে দিচ্ছেন না কাউকে। তাঁর কাছ থেকে ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে সবাই। তিনি কে? আরেকটা হিন্ট দিই। বলিউডের 'বিগ বি' অমিতাভ বচ্চন নিজেকে এই মানুষটির ফ্যান হিসেবে দাবী করে একসময় বলেছিলেন

ভারতের সবচেয়ে ন্যাচারাল অভিনেতা হয়তো তিনিই।

হ্যাঁ, ঠিকই আন্দাজ করেছেন। তিনিই পর্দার জর্জকুট্টি বা বাস্তবের মোহনলাল, মালয়লাম সিনেমার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন! 

আমরা জয়া আহসান কে নিয়ে বরাবরই অবাক হই। যতই দিন যাচ্ছে, ততই যেন বয়স কমে যাচ্ছে তার। সময়ের সাথে সাথে বয়সের এই ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক লক্ষ্য করি মোহনলালের ক্ষেত্রেও৷ ৬১ বছরে পা দিলেন তিনি আজ। অথচ দেখে বোঝার সাধ্য নেই মোটেও। তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট দেখলেও রীতিমতো চমকে উঠতে হয়। নিয়মিত জিমে যাচ্ছেন। জিম করছেন। বাড়তি ওজন ঝরাচ্ছেন৷ বিদেশের ডাক্তাররা আজকাল বয়সের ক্ষেত্রে বলেন- 'সিক্সটি ইজ দ্য নিউ ফর্টি।' এই বাক্যটিকেই বেদবাক্য মেনেই যেন এগোচ্ছেন তিনি৷ যে বয়সে মানুষ গুটোয়, সে বয়সে এসে তিনি উড়ছেন৷ গণ্ডির বাইরে। দূরে-বহুদূরে৷ 

এখানেই মোহনলালের ক্যারিশমা। নাহয় টানা তেতাল্লিশ বছর ধরে একটা ইন্ডাস্ট্রিতে থাকা, এবং শুধু থাকা না, বীরদর্পে থেকে সেই ইন্ডাস্ট্রিকে ইন্ডিয়ার অন্যতম ব্রিলিয়ান্ট ইন্ডাস্ট্রি'তে রূপান্তরিত করার অসাধ্যসাধন-যাত্রার রথের সারথি অনেকে হলেও চালক একজনই; মোহনলাল। এই চালক হওয়া কী কম ঝক্কির কাজ?

মোহনলালের বাবা বিশ্বনাথন নায়ার ছিলেন কেরালা সরকারের আইন সচিব৷ মোহনলাল ছিলেন পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান৷ ছোটবেলায় দুয়েকটা মঞ্চনাটকে অভিনয় করলেও, কখনো যে সিনেমায় আসবেন তা ভাবেননি মোটেও। কলেজে পড়াশোনা শেষ করে যোগ দিয়েছিলেন রেসলিং এ৷ হয়েছিলেন কেরালা রাজ্যের রেসলিং চ্যাম্পিয়নও। এরপর হুট করেই মাথায় কী ভূত চাপলো, বললেন, সিনেমা বানাবেন। উৎসাহী আরো কিছু বন্ধু জোগাড় করে বানালেন সেই সিনেমা, যার কথা আগেই একবার বলেছি। আঠারো বছর বয়সে বন্ধুদের নিয়ে যে সিনেমা বানালেন, তার নাম- থিরোনোট্টাম। সেটা মুক্তি পেলোনা তখন।

হতাশায় দিন কাটলো কিছুদিন। দুই বছর অপেক্ষার পর তিনি আবার এলেন ক্যামেরার সামনে; 'মাঞ্জিল ভিরিঞ্জা পুক্কাল' সিনেমা দিয়ে। হিট হলো সিনেমাটি। এই সিনেমায় তার রোল ছিলো ভিলেনের। এই সুপারস্টারকে পরবর্তী বেশ কিছু সিনেমাতেই ঋণাত্মক ভূমিকায় অভিনয় করতে হয় এরপর৷ টানা বেশ কয়েকটি সিনেমায় ভিলেন হিসেবে অভিয়ের পরে আস্তে আস্তে প্রোটাগনিস্ট রোলগুলো পাওয়া শুরু করেন তিনি। নায়ক মানেই ছিপছিপে, সুঠাম, সিক্সপ্যাক হতে হবে... এই স্টেরিওটাইপকেও ভাঙ্গলেন তখন।  দেখালেন- নায়ক হতে হলে অভিনয়ের চমৎকারিত্বই মূল, দৈহিক আকৃতি নয়। তাঁর অভিনয়ের চমৎকারিত্বে এতটাই মুগ্ধ হলো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি; শুধু মালয়লাম না, হিন্দি, তামিল, তেলেগু, কান্নাডা'র সিনেমাগুলোতেও ক্রমাগত অভিনয় করলেন তিনি। বললেন-

সিনেমার ক্ষেত্রে ভাষা কোনো বাধা হতে পারেনা। 

শুধু সিনেমায় অভিনয় করলেও হতো। তিনি হয়তো নিয়ত করেছিলেন অলরাউন্ডার হবেন৷ সে কারণেই অভিনয়ের পাশাপাশি সিনেমায় প্লেব্যাক করাও শুরু করলেন৷ অভিনয় চলছে, চলছে গানও। ছয় বছর অভিনয়ের পরেই তিনি পেয়ে গেলেন 'কেরালা স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট অ্যাক্টর।'সত্যম আন্তিকাদ' সিনেমার জন্যে পেলেন এই পুরস্কার। এরকম স্টেট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন আরো আটটি৷ সে সাথে পাঁচটি ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড, ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড সহ বহু অর্জনকেই নিজের বাড়ির ট্রফিকেসে বন্দী করেছেন তিনি৷ ভারত সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন 'পদ্মশ্রী' এবং 'পদ্মবিভূষণ' অ্যাওয়ার্ডও! ভারতের প্রথম অভিনেতা হিসেবে টেরিটোরিয়াল আর্মিতে সম্মানজনক 'লেফটেন্যান্ট কর্নেল' পদ পেয়েছেন। সম্মানজনক ডক্টরেট উপাধিও পেয়েছেন  একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। 

    শুরুটা করেছিলেন সেই ছোটবেলায়!

তিনি কেন 'মালয়লাম সিনেমা'র সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন, তা নিয়ে কিছু বলার আগে এটা বলা দরকার, 'মালয়লাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি' ভারতের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মেধাবী, এবং, সে সাথে, সবচেয়ে বেশি দরিদ্রও! টেকনিক্যাল, ফিনানশিয়াল সহ নানাবিধ বিষয়ে তাদের শত দৈন্যদশার মধ্যেও অসাধারণ গল্প এবং দুর্দান্ত অভিনয় দিয়ে এই ইন্ডাস্ট্রি ক্রমশ ভাঙ্গতে শুরু করেছিলো আড়মোড়া। দিনদিন মানুষের প্রশংসাবাক্য বাড়ছিলো, কিন্তু টাকার অবস্থা তথৈবচ। 

সেখানে প্রথম পরিবর্তন আনেন মোহনলাল। ২০১৩ সাল। একটি সিনেমা পালটে দেয় মালয়লাম সিনেমার গতিপ্রকৃতি। হ্যাঁ, দৃশ্যমের কথা বলছি। মাঝামাঝি বাজেটের সেই ছবি বক্স অফিসে তোলপাড় তোলে, পঞ্চাশ কোটি রূপি আয় করে। মালয়লাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্যে এ আয় ছিলো এক রেকর্ড!  এরপর ওপ্পাম। পঞ্চাশ কোটি রূপির মাইলফলক স্পর্শ করে আবার। ২০১৬ সালে আসে মোহনলালের পুলিমুরুগান, যে সিনেমা মালয়লাম ফিল্মের ইতিহাসে প্রথমবারের মতন বক্সঅফিসে একশো কোটি রূপি আয় করে৷ এই রেকর্ড আবার ভেঙ্গে দেয় তার নিজেরই সিনেমা 'লুসিফার।' দুইশো কোটির বিজনেস করে এই সুপারহিট মুভি৷ সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে 'দৃশ্যম-০২।' শুধু ভারত কেন, পুরো উপমহাদেশকেই ঘোল খাইয়ে ছেড়েছে এই সিনেমা৷ ঠিক এভাবেই একের পর এক বক্সঅফিস হিট সিনেমা নিয়ে এসে মলিউডকে খোলনলচেই বদলে ফেলেছেন 'দ্য গ্রেট মোহনলাল।' 

 দৃশ্যম-০২ তেও কাঁপিয়েছেন পর্দা!

মোহনলালকে নিয়ে চাইলে অজস্র কথা বলা যায়৷ ভারতের সিনেমা জগতের অন্যতম মহীরূহ এই মানুষটি ৩৪০টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করার পরেও থামতে চাচ্ছেন না। এখনও নবাগত কোনো অভিনেতার মতন গভীর মনোযোগে প্রস্তুতি নেন, নতুন কোনো সিনেমায় কাজ শুর করার আগে৷ এখনও নিয়মিত জিমে যান। সামাজিক নানা ইস্যুতে ব্লগে লেখেন। সোশ্যাল মিডিয়াতে সরব থাকেন৷ বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার কাজে যুক্ত থেকে মানুষের জন্যে যতটা পারেন, করেন৷

সে সাথে বয়সকেও ক্রমশ কমিয়ে নিজেকে প্রতিদিনই ভেঙ্গেচুরে একেকটা অবয়ব দিচ্ছেন এই শিল্পী। অবশ্য দেবেনও বা কেন, দুই কাঁধে দায়িত্বও কম নেই। একটা ইন্ডাস্ট্রিকে সামনে থেকে লিড দিচ্ছেন। নেটফ্লিক্স-অ্যামাজনের এই যুগে এসেও এখনো তার সিনেমা মুক্তি পেলে সিনেমাহলের সামনে রাত ৩টা থেকে ভীড় শুরু হয়। ভক্তদের প্রিয় 'লালেত্তান'কে নিয়ে ফেমাস তামিল ডিরেক্টর মনিরত্নম বলেন- 

এই মানুষটিকে নিয়ে কাজ করা ঝামেলা। এতটাই অসাধারণ অভিনয় করেন, ক্যামেরার পেছনে থেকে 'কাট' বলতে হচ্ছে করেনা।

এত মানুষের কাছ থেকে এত এত ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান পাচ্ছেন, তার বিনিময়ে তিনি নিজেকে বিলিয়ে দেবেন; এটাই হয়তো নিয়তির বিধান। তাছাড়া গ্রেটরা তো এরকমই হয়৷ অদম্য প্রাণশক্তি আর অফুরন্ত ইচ্ছেশক্তি নিয়ে আমৃত্যুই থেকে যান তারা কর্মযজ্ঞের একনিষ্ঠ সাধনায়৷ তাদের এই পথ চলাতেই আনন্দ। তাদের এই ছুটে চলাতেই সন্তুষ্টি৷ 

মোহনলাল বিশ্বনাথন আয়ারও বা সেখানে ব্যতিক্রম হবেন কেন?


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা