'মনিকা, ও মাই ডার্লিং' এ ভাসান বালা এগিয়েছেন বিচিত্র এক পথে। একগাদা সিনেমাকে হোমেজ দিয়েছেন, ওয়ার্ল্ড সিনেমার টুকরো টুকরো অতীতকে নানাভাবে এনেছেন পর্দায়, সে সাথে এমন এক গল্প বলেছেন, যে গল্পে টের পেয়েছি আগাথা ক্রিস্টির 'মার্ডার অন দ্য অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' এর মিহি দ্যোতনাও...

এ গল্প হতে পারতো পরিশ্রমী এক যুবকের। যে যুবক কায়ক্লেশে খেটে ক্রমশ হয়েছে সমাজের কেষ্টবিষ্টুদের একজন। অথবা, এ গল্প হতে পারতো এমন একজন নারীর, যে নারী প্রচণ্ড সুযোগসন্ধানী। দেহসৌষ্ঠবে পুরুষকুল'কে বিচলিত ও বিড়ম্বিত করেই এগোয় যার ছলাকলা, প্রসার। আবার, এ গল্প হতে পারতো এমন এক রূপকের সাপলুডুর, যে সাপলুডুর মইগুলো যত লম্বা, সাপগুলোও তত বিষাক্ত। আবার, এসব ছাপিয়েও, এ গল্প হতে পারতো এমন এক খুনীর, যে একের পর এক করেছে একগাদা খুন। 'হু ডান ইট' এর থমথমে অবয়বের খোঁজেই হয়তো এগোতে পারতো গল্প। কিন্তু এসব কিছুই না করে 'মনিকা, ও মাই ডার্লিং' এ ভাসান বালা এগোলেন বিচিত্র এক পথে। একগাদা সিনেমাকে হোমেজ দিলেন, ওয়ার্ল্ড সিনেমার টুকরো টুকরো অতীতকে নানাভাবে আনলেন পর্দায়, সে সাথে এমন এক গল্প বললেন, যে গল্পে মিশে রইলো আগাথা ক্রিস্টির 'মার্ডার অন দ্য অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' এর মিহি দ্যোতনাও। পুরোপুরি মিলেই হলো বেশ অন্যরকম এক সিনেম্যাটিক এক্সপেরিয়েন্স। 

নানা লেয়ারের অন্যরকম এক গল্প! 

জাপানের বিখ্যাত থ্রিলার লেখক কেইগো হিগাশিনোর 'দ্য ডিভোশন অফ সাসপেক্ট এক্স' বই বিশ্বব্যাপী বেশ সমাদৃত। বইটি পড়েছিও। কিন্তু তার আরেকটি থ্রিলার- 'Burutasu No Shizou', যেটা আগে পড়া হয়নি এবং তুলনামূলক বিশ্লেষণে যেটা অতটা জনপ্রিয়ও না, সে থ্রিলার অবলম্বনেই হলো 'মনিকা, ও মাই ডার্লিং'র ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং। যদিও মূল থ্রিলার খুব যে দুর্দান্ত, এমন না৷ সেটা ভাসান বালাও জানতেন৷ সেজন্যেই হয়তো গল্পের চেয়ে বেশি দখল রাখলেন গল্প কিভাবে বলা হবে, সে জায়গায়। ডেভিড ফিঞ্চার যেমন বলতেন- নিজের সিনেমায় নিজের আগ্রহের বিষয়বস্তুকে না আনার সাহস কোনো ডিরেক্টরই করবেন না, সেটা মেনেই 'ফিল্ম বাফ' ভাসান বালার সিনেমায় দেখা গেলো একগাদা সিনেমার রেফারেন্স, প্রচুর ইস্টার এগস আর ডার্ক হিউমার। এমনকি যে চরিত্রগুলোকে পাওয়া গেলো পর্দায়, সে চরিত্রেরাও ক্ষণেক্ষণে মনে করালো বিভিন্ন কালজয়ী সিনেমার একাধিক চরিত্রকে।

চরিত্র-বিশ্লেষণে পরে আসা যাবে। এর আগে গল্পের সার্সিটা উঠিয়ে দেয়া যাক বরং। যে গল্পের শুরুটা এভাবে- একটা বহুজাতিক সংস্থার অফিসে অনেক প্রতিদ্বন্দ্বীকে হটিয়ে বেশ লোভনীয় এক পদে আসীন হন একেবারে 'শূন্য থেকে উঠে আসা' এক তরুণ। স্বাভাবিকভাবেই কিছু মানুষের চক্ষুশূল হন তিনি৷ গল্প এগোতে এগোতে জানা যায়- এই তরুণ নিজেও ধোয়া তুলসীপাতা নন। তিনি নিজে অফিসের এক নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িত। যে সম্পর্কের বদান্যতায় ঐ তরুনের কাছে নিয়মিত আসতে থাকে নানারকম ব্ল্যাকমেইল। ক্রমশ জানা যায়, এই তরুণ যে মানুষদের শত্রু, সে মানুষেরাও এই নারীর সঙ্গসুধা থেকে বঞ্চিত হননি৷ তারাও এই নারীর ফাঁদে পড়ে ক্রমশ হচ্ছেন দেউলিয়া। অগত্যা, এই বিষম পরিস্থিতি শত্রুদের আনে এক টেবিলে। তারা হন মিত্র। সিদ্ধান্ত হয়- তারা সবাই মিলে খুন করবে এই নারীকে৷ যে নারীর নাম মনিকা মাচাডো (হুমা কুরেশি)। গল্প এরপরই হাইওয়ে থেকে নেমে পড়ে ভিন্ন এক সড়কে। সোজা পথে না, সর্পিল সব বাঁকে। ঠিক তখনই নড়েচড়ে বসার পালা শুরু। বাকিটুকু আর খোলাসা না করি। সিনেমাতেই দ্রষ্টব্য। 

সিনেমার এই যে উচ্চাভিলাষী তরুণ, যার নাম জয়ন্ত (রাজকুমার রাও), তিনি ক্ষণেক্ষণে 'বাজিগর' এর নকল 'ভিকি মালহোত্রা'কেই মনে করালেন৷ নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে ভিকি মালহোত্রা (শাহরুখ খান) গিয়েছিলেন বহুদূর, জয়ন্তও তেমনি৷ গুম, খুন, দুর্নীতি... অরুচি নেই কিছুতেই। সিনেমার এক দৃশ্য এরকম, যেখানে খুব প্রয়োজনীয় এক দলিল হাতে পাবার পর সেটিকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে জয়ন্ত। কিছু কি মনে পড়ছে? 'বাজিগর' এ শাহরুখ খানের ছবি চিবিয়ে খাবার সেই আইকনিক সীন? 

রাজকুমার রাও (জয়ন্ত) মনে করালেন 'বাজিগর' এর ভিকি মালহোত্রাকে 

এরকম রেফারেন্স অজস্র এ সিনেমায়। অমিতাভ বচ্চনের 'হাম' সিনেমার 'ক্যাপ্টেন জাটাক' এর রেফারেন্স, 'সাইকো' মুভির রেফারেন্স, শ্রীরাম রাঘবনের থ্রিলার সিনেমার কুইর্কি ট্রিটমেন্ট অনুসরণ, সিচুয়েশন অনুযায়ী ভিন্টেজ গান, নিজের সিনেমা 'মর্দ কো দর্দ নেহি হোতা'র প্রোটাগনিস্টদের ক্যামিও, হাউজ-বোর্ডে প্রিয় ডিরেক্টরদের ট্রিবিউট... ভাসান বালা এক সিনেমায় আনলেন সবকিছুকেই। কিন্তু ফোর্সফুলি না কিছুই। ক্রেডিটটাও সেখানেই। অর্গানিক্যালিই স্টোরির সাথে ব্লেন্ড হলো তারা। যদিও কিছু বিষয় আরোপিত ছিলো, সাপ দিয়ে যে ট্রিটমেন্টগুলো করা হলো তা ঠিক জুতের লাগলো না, 'স্যাভেজ করাপ্টেড কপ' রোলে রাধিকা আপ্তেকে খাপসুরৎ মনে হলোনা। কিছু সিচুয়েশন 'ক্রাইম পেট্রোল' এর মত জুড়ে দেওয়াও চোখে আটকালো। 

তবে এও ঠিক, 'মনিকা, ও মাই ডার্লিং' এর মূল গল্প সাপেক্ষে এসব বিচ্যুতি খুব একটা দৃষ্টিকটুও না। মূল গল্পটা এত বিজারে, ফিল্ম-লাভারদের জন্যে এত ইন্টারেস্টিং, অন্যসব দিকে চোখ না পড়লেও তাতে দোষের কিছু থাকা উচিত না। তাছাড়া- পাওয়ার স্ট্রাগল, লাভ, লাস্ট, জেলাসি, থ্রিলার‍, ডার্ক হিউমার, করাপশন...  এত এত সাবপ্লট নিয়ে এ সিনেমার এগোনো, এবং ভজঘট না পাকানো, সেটাই বরং হয়ে থাকলো বলার মত এক বিষয়। আহমেদ ছফার 'যদ্যপি আমার গুরু'তে যেমন একগাদা বইয়ের রেফারেন্স, তেমনি করেই এ সিনেমাও যাত্রা শেষ করলো নষ্টালজিয়ার নানা সিনেমার মুমূর্ষু স্মৃতিকে উসকে দিয়ে। বোধহয় সে কারণেই, শেষবেলায় এসে তাই এ সিনেমা আর 'সিনেমা'র অপরিসর সংজ্ঞাতেই আটকে রইলোনা। সিনেমাকে ভালোবেসে এক নির্মাতার দেওয়া নৈবেদ্যতেই পরিণত গেলো 'মনিকা, ও মাই ডার্লিং।' যে নৈবেদ্য ভাবালো, মুগ্ধ করলো এবং আফসোসেও ফেললো।

আফসোস শুধু এই অর্থে-  এরকম যত্ন নিয়ে সিনেমা বানানোর চল কেন উঠে গেলো হঠাৎ? কেন দুই মিনিটের 'ম্যাগি'র মতই ঝটপট হয়ে গেলো সিনেমা, যে সিনেমায় পেট হয়তো ভরলো, কিন্তু মন রইলো বুভুক্ষু? যদিও উত্তরটা জানা, তবু কেন যেন আফসোসকেও উপেক্ষা করা গেল না! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা