জন্মের পরেই দারিদ্র্যের পাশাপাশি দেখেছেন বর্ণবাদ। হতে চেয়েছিলেন যুদ্ধবিমানের পাইলট। দূর্ঘটনা তাকে বানিয়েছে অভিনেতা। সিনেমায় ভালো কোনো চরিত্রের জন্যে সংগ্রাম করেছেন বহু বছর। লড়াই বজায় রেখেছেন, হার মানেননি কখনোই...

'ইনভিকটাস' নামের বিখ্যাত সিনেমায় 'নেলসন ম্যান্ডেলা' চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যে ভদ্রলোক, তার অভিনয় দেখে নেলসন ম্যান্ডেলার ব্যক্তিগত সচিব পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছিলেন-

মনে হলো, পর্দায় মাদিবা(নেলসন ম্যান্ডেলা)কেই দেখছি।   অভিনয় এত নিখুঁত হয় কী করে? 

যে মানুষকে নিয়ে লিখছি, বিশ্ব-সিনেমার যারা ভক্ত,  তাদের প্রত্যেকেরই পছন্দের মানুষ তিনি। তিনি মরগান ফ্রিম্যান। দূর্ঘটনাক্রমে অভিনয়ে আসা যার এবং  ভালোবেসে খুব অল্পবয়সেই যিনি আঁকড়ে ধরেছিলেন অভিনয়ের এই রঙিন মঞ্চকে! 

আর্থিক অনটনের পরিবারে জন্ম। জন্মের পরে দারিদ্র্যের সাথে কাঁধ মিলিয়ে ঘুরতে দেখেছেন বর্ণবাদের বিষাক্ত বাতাসকেও। আশেপাশের ঘৃণার বাতাবরণের বাইরে খুব বেশি ঘোরা হতো না, ঘুরতে পারতেন না। কখনো কিছু টাকাপয়সা হাতে পেলে সেগুলো খরচ করে সারাদিন পরে থাকতেন সিনেমা নিয়ে। না, সিনেমায় অভিনয় করা নিয়ে না। সিনেমা দেখতেন তিনি গ্রোগ্রাসে। মাত্র ছয় বছর বয়সেই সিনেমা দেখা শুরু হয় তার। সিনেমা দেখতেই দেখতেই ভাবতেন, এরকম একটা সিনেমায় অভিনয় করলে মন্দ হতোনা।

স্কুলেও যেতেন। খুব যে একটা মন বসতো সেখানে, তা বলা যাবে না। অমনোযোগী থাকার কারণে একদিন শিক্ষক দিলেন শাস্তি। শাস্তিটাও অভিনব!  এক ড্রামা কম্পিটিশনে ফ্রিম্যানকে পাঠিয়ে দিলেন সেই শিক্ষক। ফ্রিম্যানও কম যান না। 'বিজয়ী'র ট্রফি জিতেই ফিরেছিলেন তিনি! এই ট্রফি জেতার পরে অভিনয় নিয়েও আগ্রহ আরেকটুখানি পোক্ত হয় ফ্রিম্যানের। নিয়মিত স্কুলে যাওয়াও শুরু হয় এরপর। যতটা না পড়ার আগ্রহে, তার চেয়েও বেশি স্কুলের মিউজিক এবং থিয়েটার ক্লাবের আকর্ষণে। 

অবশ্য স্কুলের গণ্ডি পেরোতে পেরোতে অভিনেতা হওয়ার আগ্রহে ছেদ পড়লো তাঁর। ফ্রিম্যান হতে চাইলেন যুদ্ধ বিমানের পাইলট। সে আগ্রহ এতটাই জোরালো ছিলো, নাটকের একটা বৃত্তিও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি৷ মঞ্চের বদলে পা রেখেছিলেন ইউএস আর্মির ঘাঁটিতে৷ কিন্তু  বিধাতার গল্প পাল্টাবে এমন সাধ্য কার? তাঁর যুদ্ধবিমানের পাইলট হওয়া হয়না শেষতক। ইউএস আর্মির ক্যাম্পে তাকে কাজ দেওয়া হতো মেকানিকের অথবা রাডার টেকনিশিয়ানের। একদিন তাই তিতিবিরক্ত হয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে তিনি চলে আসেন যন্ত্র-যুদ্ধ-যান্ত্রিকতা ছেড়ে।

পরবর্তী গন্তব্য- লস অ্যাঞ্জেলস। অভিনয়ের খোঁজে চষে ফেললেন গোট শহর। কিন্তু নতুন কাউকে কাজ দেবে কে? দীর্ঘদিনের সংগ্রামেও ভালো কোনো কাজ না পেয়ে চলে এলেন নিউ ইয়র্কে। সেখানেও কয়েক বছরের কায়ক্লেশের পরে পেলেন প্রথম টিভি শো'র ডাক। 'হ্যালো, ডলি' নামের এই নাটকে সেরকম আহামরি কোনো কাজ হলো না তার। তবে আত্মবিশ্বাস পেলেন বেশ৷ 

যুবক মরগান ফ্রিম্যান! 

এরপরে এলো তাঁর প্রথম সিনেমা- ব্রুবেকার। আবারও তথৈবচ কাজ। তবে দ্বিতীয় সিনেমাতে দেখালেন চমক। 'স্ট্রিট স্মার্ট' নামের এ সিনেমায় অসাধারণ অভিনয়ের জন্যে 'বেস্ট সাপোর্টিং অ্যাক্টর' এর জন্যে অস্কার নমিনেশনও পেলেন। এরপরই বানের জলের মতন কাজের সুযোগ আসতে লাগলো। বুঝি ভাগ্যদেবতা প্রসন্ন হলেন এই মানুষটির ওপরে। আস্তে আস্তে এই মানুষটির সাথে যুক্ত হতে লাগলো- আনফরগিভেন, শশাঙ্ক রিডেম্পশন, সেভেন, অ্যামিস্টাড, মিলিয়ন ডলার বেবি... সিনেমাগুলোর নাম। আস্তে আস্তে মানুষ চিনলো এক জাদুকরকে, যার নাম- মরগান ফ্রিম্যান৷ বাকিটা আমরা জানি। পাঁচ দশকের এক অসাধারণ ক্যারিয়ারে ফ্রিম্যান মুগ্ধ করে রেখেছেন এখনও আমাদের। 

পর্দার 'রেড!' 

তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনা করেছেন বেশকিছু নির্মানের। প্রযোজকও ছিলেন দারুণ কিছু কাজের। জলবায়ু ও আবহাওয়া পরিবর্তনের সুফল কুফল নিয়ে নিয়মিত জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্যে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। রাজনৈতিক নানা বিষয়েও তিনি সরব। বর্ণবাদের বিশাল দেবদারু উপড়ে ফেলার কথা তিনি বরাবরই বলেন। করোনোর এই ক্রান্তিকালেও তিনি মানুষকে মানসিক শক্তি ধরে রাখতে বলেন নিয়মিত।  সামাজিক নানা কাজে তিনি মানুষকে সচেতনও করেও যাচ্ছেন এই মহামারীর বিরুদ্ধে৷ 

পুরো ক্যারিয়ারে 'সেভেন' এর মতন অজস্র দুর্দান্ত সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি! 

পুরো পৃথিবীর অভিনেতাদের মধ্যে সম্মান ও ভালোবাসা প্রাপ্তির দিক থেকে তিনি উপরের কাতারেই থাকবেন।  এত এত কাজ, এত এত পুরস্কার ও সম্মানের ভীড়েও পা মাটিতেই রাখতে জানেন পর্দার 'রেড।' জীবনের ভয়াল অবয়ব খুব অল্প বয়সেই দেখতে হয়েছিলো তাকে। তাই তিনি জানেন, অহঙ্কার-অহমিকা-হামবড়া ভাবের বাইরেও জীবনের মূল্য কতটা তাৎপর্যময়, কতটা বিশাল তার ব্যাপ্তি। সেজন্যেই তিনি তাঁর পুরো ক্যারিয়ারের মধ্যে দিয়েই মানুষকে প্রতিনিয়ত দিচ্ছেন ত্যাগ-তিতিক্ষা-লড়াই করার প্রেরণা। মরগান ফ্রিম্যান এভাবেই তাই সিনেমার পর্দার মতন, পর্দার বাইরেও হয়ে উঠছেন নায়ক। একগাল হেসে হেসেই বলছেন- 

Was I always going to be here? No, I was not. I was going to be homeless at one time, a taxi driver, truck driver, or any kind of job that would get me a crust of bread. You never know, what's going to happen. 

জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে এরকম স্পষ্ট ধারণা এবং সেই অনিশ্চয়তায় নিজেকে সঁপে দেয়ার জন্যেই তিনি ক্রমাগত হয়ে উঠেছেন এক প্রকৃত মানুষ। যে মানু্ষে আমরা মুগ্ধ হই ক্রমাগত। পাই লড়াই করার প্রেরণাও! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা