মা দিবসে এই ছয় সিনেমা থাকা উচিত ওয়াচলিস্টে। এবং এ সিনেমাগুলো দেখার সময় পাশে রাখতে হবে মাকেও। মায়ের সাথে একসাথে বসলেই দেখার তৃপ্তি বাড়বে বহুগুণ... 

যেকোনো দিবসেরই আলাদা, স্বকীয় দ্যোতনা আছে। এরমধ্যে দিনটি যদি হয় আবার 'মা দিবস', তাহলে তো কথাই নেই। ঘরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকে নিয়ে আলাদা দিবস, আলাদা উৎসব হওয়া দারুণ সুন্দর একটি বিষয়। এবং এই দিনটিকে উদযাপন করা যেতে পারে, অসাধারণ কনসেপ্টের ছয়টি সিনেমা দেখে, যে সিনেমাগুলোতে সবকিছু ছাপিয়ে উঠে এসেছে মায়ের সাথে সন্তানের স্নিগ্ধ অপার্থিব সম্পর্কের গল্প। এক নজরে সিনেমাগুলোর সুলুকসন্ধানে চোখ বুলানো যাক। 

১. দ্য ব্লাইন্ড সাইড

প্রফেশনাল আমেরিকান ফুটবল খেলোয়াড় মাইকেল ওহারের জীবনের সত্যঘটনা অবলম্বনে এ সিনেমা নির্মিত হয়েছে৷ মাইকেল ওহারের প্রথম জীবন কেটেছে খুব দুরবস্থার মধ্যে। মাদকাসক্ত বাবা-মা'র সন্তান হিসেবে বড় হয়ে ওঠাটা খুব সুখকর হয়নি তার। কৈশোরের টালমাটাল সময়ে তার পরিচয় হয় লেই অ্যান নামক এক মহিলার সাথে এবং লেই অ্যান তাকে দত্তক নিয়ে চলে আসে নিজের বাড়িতে 

এই লেই অ্যান রূপান্তরিত হন ওহারের দ্বিতীয় মা'তে। এই মায়ের ত্যাগ, শ্রম আর ঐকান্তিক ইচ্ছেয় মাইকেল ওহার একসময়ে পরিনত হন আমেরিকার অন্যতম কিংবদন্তি ফুটবল খেলোয়াড়ে৷ 

বায়োলজিক্যাল মা না হলেও যে মাতৃত্বের অপত্যস্নেহে একটা মানুষের জীবন পুরোপুরি বদলে দেয়া সম্ভব, তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত- দ্য ব্লাইন্ড সাইড। সাথে স্যান্ড্রা বুলকের 'অস্কার-উইনিং' পারফরম্যান্স তো রইলোই৷ 

গোটা সিনেমাই সুন্দর। এবং সিনেমার বার্তাটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রিয় সিনেমাগুলোর তালিকায় আমি তাই বরাবরই রেখেছি 'দ্য ব্লাইড সাইড' কে। 

দ্য ব্লাইন্ড সাইড!

২. লেডি বার্ড 

সন্তান লালন-পালন করার সবচেয়ে কষ্টকর পর্যায় সম্ভবত কৈশোরকাল। এ সময়ে সন্তানেরা থাকে সবচেয়ে বেশি রহস্যময়, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, ছটফটে। আবেগগত নানারকম দূর্ঘটনাও ঘটে এ সময়ে। বাবা-মা'কে তাই এই পর্যায়ে থাকতে হয় সবচেয়ে সচেতন। কারণ একটু অসাবধানেই হয়ে যেতে পারে বড় কোনো ক্ষতি। 

'লেডি বার্ড' এরকম এক মেয়ে, যে সদ্য বয়ঃসন্ধিতে পা দিয়েছে। যার কাছে মাঝেমধ্যেই পৃথিবী অসহ্য মনে হয়, মানুষজনকে বিরক্তিকর মনে হয়, খানিকটা স্বাধীনতা পাওয়ার জন্যে যার বিচলিত হয় হৃদয়। এই অস্থিতিশীল 'লেডি বার্ড'কে সামলাতে হিমশিম খান তার মা ম্যারিয়ন। মেয়ের সাথে খিটিমিটি লেগেই থাকে। হুলস্থুল ঘাত-প্রতিঘাতে এগোতে থাকে 'লেডি বার্ড।' 

পুরো সিনেমায় নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার মিশেলে উঠে এসেছে মা-মেয়ের নিবিড় রসায়নের গল্পই। অর্থোডক্স সুগারকোটিং ন্যারেশনের বাইরে গিয়ে বেশ অন্যরকম একটি কমেডি ফিল্ম৷ ন্যারেশন স্টাইলেও ছিলো কিছুটা ভিন্নতা। সবমিলিয়ে উপভোগ্য। 

লেডি বার্ড! 

৩. ব্রেভ

ডিজনি-পিক্সারের কম্বিনেশন তো বরাবরই অসাধারণ। অন্যথা হয়নি 'ব্রেভ' এর বেলাতেও। 'ফিল গুড ফ্যামিলি মুভি' দেখতে চাইলে এই অ্যানিমেটেড মুভি 'বাকেট লিস্ট' এ থাকা উচিত। 

এ সিনেমায় বৈচিত্র্যময় অনুষঙ্গ অজস্র। তবে সবকিছুকে ফিকে করে প্রিন্সেস মেরিডা আর তার মা, এলিনরের, ভালোবাসার গল্পই উঠে আসে এখানে৷ প্রিন্সেস মেরিডা চায় স্বাধীন, উচ্ছ্বল এক জীবন। কিন্তু, এলিনর চায়, মেয়ের স্থিতিশীল বোধবুদ্ধি। দুই পক্ষই তাদের যুক্তিতে অটল। কিন্তু হুট করেই বিপাক। মা এলিনর এক অশুভ-চক্রের ষড়যন্ত্রে পরিনত হন ভালুকে। 

মেরিডা তার 'ভালুকরূপী' মাকে নিয়ে বের হয় অভিযানে। উদ্দেশ্য- মা কে দুষ্টচক্রের বলয় থেকে মুক্ত করে ফিরিয়ে আনবে আগের চেহারায়। যাত্রাপথে তারা নতুন করে আবিষ্কার করে নিজেদের৷ আস্তে আস্তে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যে পূর্ণ হয় তাদের যাপিত সত্তা। 

যারা অ্যানিমেশন-লাভার, সাথে দেখতে চান, মা-মেয়ের ছিমছাম রসায়নের এক সিনেমা, তাদের 'ব্রেভ' অবশ্যই দেখা উচিত। 

ব্রেভ! 

৪. মম

শ্রীদেবী কাপুরের তিনশোতম সিনেমা 'মম।' রিলিজ হয়েছিলো মালয়লাম, তামিল, তেলেগু এবং হিন্দি ভাষায়। সিনেমার প্রযোজনা, সরবরাহ, তৈরী নিয়ে যতটা জাঁকজমক ছিলো, সিনেমাটা বাস্তবিকও হয়েছে বেশ সুন্দর। 

আচ্ছা, নিজের সন্তানের জন্যে একজন মা কতদূর যেতে পারে? কতটা বিধ্বংসী হতে পারে নিজের সন্তানের স্বার্থে? নিজের সাজানো সংসার তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে যেতে থাকলে, একজন গড়পড়তা মা, কতটা আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে 'মম' সিনেমাতে৷ যেখানে দেবকী'র (শ্রীদেবী) মেয়েকে এক পার্টিতে শারিরীকভাবে উত্ত্যক্ত করে কয়েকজন৷ পরবর্তীতে দেবকী, একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ এর সাহায্য নিয়ে শুরু করে এই অসভ্যদের শায়েস্তা করার মিশন। 

শ্রীদেবী, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিক, অক্ষয় খান্না... সাথে বেশ ছিমছাম এক থ্রিলার গল্প, দারুণ সিনেম্যাটোগ্রাফী, সবমিলিয়ে 'মম' আসলেই অনবদ্য৷ কিন্তু গল্পে সবকিছু ছাপিয়ে প্রকট হয়েছে, নিজের মেয়ের সাথে হওয়া অন্যায়ের বিচার পাওয়ার জন্যে এক মায়ের অক্লান্ত সংগ্রামের গল্প। 'মম' কিছু ক্ষেত্রে একটু বেশি ড্রামাটিক মনে হতে পারে। তবে, সেটুকু বাদ দিলে, বাকিটা ছিমছাম। সে সাথে  শ্রীদেবীর অসাধারণ অভিনয়, উপরি পাওনা হিসেবে তো রইলোই। 

মম! 

৫. আম্মাজান

মা-দিবসের স্পেশাল সিনেমা নিয়ে কথা হবে আর সেখানে 'আম্মাজান' আসবে না, এটা মোটেও হতে পারে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মা-ছেলের সম্পর্ক নিয়ে এরকম সিনেমা এসেছেও তো খুব কম। 

মায়ের সাথে ঘটা একটি অন্যায়ের পরে মা স্তব্ধ হয়ে যান৷ কথা বলা বন্ধ করে দেন ছেলের সাথে। এদিকে ছেলেও আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে, মা কে স্বাভাবিক করার জন্যে। শেষপর্যন্ত কী হয়? 

'আম্মাজান' সিনেমা দেখেননি, এমন মানুষ খুব কমই আছে। তাই ডিটেইলসে কাহিনী বলারও কিছু নেই। মান্নার অসাধারণ অভিনয়শৈলীর এক নজিরই আমরা পাই এই সিনেমাতে। সে সাথে সিনেমার অন্যান্য লেয়ারগুলো তো রইলোই। মান্না,  শবনম, মৌসুমী, ডিপজল এর দারুণ পারফরম্যান্স আর মা-ছেলের সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা নিয়ে দারুণ এক বানিজ্যিক সিনেমা... আম্মাজান মাস্টওয়াচ! সাথে, টাইটেল ট্রাক! আহা! 

আম্মাজান! 

৬. হাঙর নদী গ্রেনেড

সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলামের কালজয়ী সিনেমা 'হাঙর নদী গ্রেনেড' আমরা সবাই-ই দেখেছি। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে বিটিভিতে এই সিনেমা এত অজস্রবার দেখিয়েছে, আমরা মাঝেমধ্যে বিরক্তও হয়েছি। তবু, যতই বিরক্তবোধ করি না কেন, এই সিনেমার অসাধারণত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই কারো। 

আমাদের যুদ্ধকালীন সময়ে মায়েদের ত্যাগের অনেক গল্পই আমরা জানি৷ আজাদের মায়ের সারাজীবন ধরে ভাত না খাওয়ার গল্প জানি। দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবান করে, যা তুই যুদ্ধে যা' বলা শহীদজননী জাহানারা ইমামের গল্পও জানি। আবার কালজয়ী 'হাঙ্গর নদী গ্রেনেড' সিনেমার সেই মায়ের গল্পও জানি, যে যুদ্ধকালে নিজের আলাভোলা সন্তানটিকে ঠেলে দিয়েছিলো হানাদারদের অস্ত্রের মুখে, নিজের যোদ্ধা সন্তানটিকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে৷ 

একাত্তরে অনেক মায়েরই আছে এরকম অজস্র আত্মত্যাগের গল্প। 'বুড়ি' চরিত্রে অভিনয় করা সুচরিতা যেন সেইসব মায়েদেরই প্রতিনিধিত্ব করেন, যারা যুদ্ধকালে হয়তো নিজেরা হাতিয়ার হাতে ধরেননি, কিন্তু প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানদের বানিয়েছিলেন এমন শক্ত হাতিয়ার, যে হাতিয়ার কেড়ে এনেছিলো বিজয়। তাও মাত্র নয় মাসে!

'হাঙর নদী গ্রেনেড' দেখা অবশ্যকর্তব্য। যুদ্ধের ব্যপ্তি বোঝার জন্যে। মাতৃহৃদয় এর বৈচিত্র‍্য বোঝার জন্যে।

হাঙর নদী গ্রেনেড

মা দিবসে এই ছয় সিনেমা থাকা উচিত ওয়াচলিস্টে। এবং এ সিনেমাগুলো দেখার সময় সাথে রাখতে হবে মাকেও। মায়ের সাথে একসাথে বসলেই সিনেমাগুলো দেখার তৃপ্তি বাড়বে বহুগুণ।

সবাইকে 'মা দিবস' এর শুভেচ্ছা। পৃথিবীর সব মা ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক, শান্তিতে থাকুক৷ সে সাথে ভালো থাকুক প্রিয় দেশমাতৃকাও। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা