এক অবাঙালী এসে বলছে, বাংলায় সিনেমা বানানো সম্ভব নয়! ওই সভায় ছিলেন আবদুল জব্বার খান নামের একজন বাঙালী। তিনি প্রতিবাদ করলেন। বলে দিলেন, এই বঙ্গেও সিনেমা বানানো সম্ভব এবং তিনি বানাবেনও। দিয়ে বসলেন চ্যালেঞ্জ। প্রকাশ্যে, ভরা মজলিসের সামনে। কিন্তু এরপরেই বিপত্তি। সিনেমা বানাবেন তো বললেন, কিন্তু এর আগে সিনেমার ক্যামেরাও তো ধরেননি তিনি!

আচ্ছা এই পৃথিবীর একেবারে প্রথম সিনেমার নাম কী? কী ভেবে সিনেমার যাত্রাটা শুরু হয়েছিলো? কেমন ছিলো সেই যাত্রাটা? আপনি যদি সিনেমাপ্রেমী হন, তাহলে এই প্রশ্নগুলো আপনাকে নিশ্চয়ই ভাবায়। এগুলো নিয়ে জানার নিশ্চয়ই ইচ্ছে হয় আপনার। তাই না? 

পৃথিবীর সর্বপ্রথম সিনেমার নাম কী, তা নিয়ে বলতে গেলে একটু আটকে যাবে যে কেউই। কারণ আঠারো শতকের শেষের দিকে এক্সপেরিমেন্টাল সিনেমা বানানো শুরু করেছিলেন অনেকেই। সে তালিকায় ফরাসীদেশের মানুষ যেমন ছিলেন, জার্মান মানুষও ছিলেন৷ তাই এটি বলা কঠিন, প্রথম সিনেমা কোনটি। তবে অনেকেরই মতামত- পৃথিবীর প্রথম সিনেমার নাম- Roundhay Garden Scene. যেটা মুক্তি পায় ১৮৮৮ সালে। দৈর্ঘ্য- ৩ সেকেন্ডের কাছাকাছি! পরিচালনায় ছিলেন ফ্রান্সের লুইস লি প্রিন্স। আবার অনেকেই এই তথ্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। তাদের মতে পৃথিবীর প্রথম সিনেমা- The Horse In Motion. যেটা মুক্তি পায় ১৮৭৮ সালে। 

তবে যেটাই হোক না কেন, পৃথিবী আঠারো শতকের পরে সিনেমার বহুরকম পালাবদল দেখেছে। মোশন পিকচার হয়ে সাইলেন্ট ফিল্ম, সাউন্ড ফিল্ম, কালার ফিল্ম, ডিজিটাল ফিল্ম, থ্রিডি, ফোরডি... সিনেমার গল্পের সাথে প্রযুক্তি যুক্ত হয়ে এখন যে বিষয়টা তৈরী হয়েছে, সেখানে পরিচালক যা চান, সেটাই করতে পারেন। দর্শকও বুঝে উঠতে পারে না, সে কী সিনেমা দেখছে, নাকি সে নিজেও সিনেমার একটা অংশ। 

ধান ভানতে অনেক শিবের গীত হলো। এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। বাংলাদেশের সিনেমা জগতের গল্পও শুরুর পর দেখেছে অনেক পালাবদল। এদেশের সিনেমা নিয়ে যাদের একটু জানাশোনা আছে, তাদের অনেকেই ধারণা করেন, ঢাকায় নির্মিত প্রথম সিনেমা মুখ ও মুখোশ। যেটি ১৯৫৬ সালে মুক্তি পায়। কিন্তু এই তথ্যটি সামান্য ভুল। 'মুখ ও মুখোশ' ঢাকায় নির্মিত প্রথম সিনেমা নয়। ঢাকায় নির্মিত প্রথম সিনেমা 'দ্য লাস্ট কিস', যেটি মুক্তি পায় ১৯৩১ সালে। অম্বুজ গুপ্তের পরিচালনায় এটি ছিলো একটি নির্বাক সিনেমা। বাংলা, উর্দু ও হিন্দি তিন ভাষায় এই সিনেমাটি মুক্তি পায় ঢাকার তৎকালীন 'মুকুল' সিনেমাহলে। 

তবে আমাদের আজকের কথাবার্তা বাংলাদেশের প্রথম সবাক সিনেমা নিয়ে, যার নাম মুখ ও মুখোশ। এই সিনেমার পেছনের গল্পটা বেশ অন্যরকম। একটা সময় পর্যন্ত ঢাকায় নিয়মিত চলতো ভারতীয় বাংলা, হিন্দি, পশ্চিম পাকিস্তান ও হলিউডের ছবি। বাংলাদেশের কেউ সিনেমা বানানোর আগ্রহও দেখায়নি আগে। এরকমই এক সময়ে, ১৯৫৩ সালে ঢাকায় একটা সভা অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানে আসলেই কোনো সিনেমা নির্মান করা সম্ভব কী না, সিনেমা করা গেলে সুবিধা অসুবিধা কী কী, তা নিয়েই মূলত ছিলো সভা। 

কথাবার্তা চলছে। হুট করে এক ভদ্রলোক বলে বসলেন, পূর্ব পাকিস্তানের এই গরম আবহাওয়ায় সিনেমা নির্মান সম্ভব নয়। লোকটি ছিলেন গুলিস্তান সিনেমা হলের মালিক খানবাহাদুর ফজল আহমেদ, অবাঙালি। একজন অবাঙালি এসে বলছে, বাংলাদেশে সিনেমা নির্মান সম্ভব না, এ কথা শুনে বাঙ্গালীর আতে ঘাঁ লাগবে এটাই স্বাভাবিক। ওই সভায় ছিলেন আবদুল জব্বার  খান নামের একজন বাঙ্গালী। তিনি প্রতিবাদ করলেন। বলে দিলেন, বাংলাদেশেও সিনেমা বানানো সম্ভব এবং তিনি বানাবেনও। দিয়ে বসলেন চ্যালেঞ্জ। প্রকাশ্যে, ভরা মজলিসের সামনে। 

কিন্তু উত্তেজনার বশে তো একটা কথা বলে ফেলেছেন। পরে বুঝলেন, বেশ একটা কাঁচা কাজ হয়ে গিয়েছে। সিনেমার ক্যামেরাও তো ধরেননি কোনোদিন। তিনি কীভাবে সিনেমা বানাবেন? অথচ বুক ফুলিয়ে চ্যালেঞ্জ তো দিয়ে এসেছেন আগেই। একরকম গ্যাঁড়াকলে পড়ে হুট করেই সিদ্ধান্ত নিলেন, সিনেমা বানাবেন। ১৯৫৩ সালে নিজেই একটা নাটক লিখেছিলেন তিনি। ডাকাত নামে। সেটা দিয়েই তৈরি করলেন চিত্রনাট্য। সিনেমার নামও প্রথমে রাখলেন ডাকাত। পরে বদলে করলেন মুখ ও মুখোশ। একটা জবরজং গোছের মান্ধাতার আমলের 'আইমো' ক্যামেরা ভাড়া করলেন কলকাতা থেকে। সাউন্ড রেকর্ডের জন্যে ফিলিপস ক্যামেরা, জেনারেটর আর কিছু হালকা জিনিসপত্র। 

১৯৫৪ সালের ৬ই আগস্ট আবদুল জব্বার খানের সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর মহরত অনুষ্ঠিত হলো হোটেল শাহবাগে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ইস্কান্দার মির্জা ছবির মহরতের উদ্বোধন করলেন।

'মুখ ও মুখোশ' সিনেমার প্রথম পোস্টার

কিন্তু মহরত তো হলো। অভিনেতাও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো নারী অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে। পাওয়াই যাচ্ছেনা। কোনো মেয়েই সিনেমায় আসতে চাচ্ছেনা। তখন রীতিমতো পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নারী অভিনেত্রী খোঁজা শুরু হলো। পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি দেখে কয়েকজন এলেনও। তাদের নিয়েই শুরু হলো সিনেমা। মজার ব্যাপার হলো, এই সিনেমায় কাজ করার জন্যে কেউই কোনো পারিশ্রমিক নেননি। পূর্ণিমা সেন, সাইফুদ্দিন, বিনয় বিশ্বাস, আব্দুল জব্বার খান, ইনাম আহমেদ, জহরত আজরা সহ অনেকেই অভিনয় করেন 'মুখ ও মুখোশ' এ। 

অনেকটা এ্যাডভেঞ্চারের মত করেই সিনেমার শ্যুটিং হয় বুড়িগঙ্গা, কালীগঞ্জ, তেজগাঁও, লালমাটিয়া, জিঞ্জিরা ও টঙ্গীর বিভিন্ন জায়গায়। সবমিলিয়ে সিনেমার শ্যুটিং শেষ হয় ১৯৫৫ সালের ৩০ অক্টোবর। ছবির বাকি কাজ অর্থাৎ মুদ্রণ, পরিস্ফুটন ও সম্পাদনার কাজ শেষ হয় লাহোরের শাহনুর স্টুডিওতে। কারণ, ঢাকায় এই কাজগুলো করার মত কোনো স্টুডিও ছিলোনা। বাধ্য হয়েই লাহোরে করতে হয় কাজটি।

যাই হোক, সিনেমা তো করা হলো। এডিটিংসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলোও শেষ। কিন্তু এবারই তো আসল কাজ শুরু।  মুক্তি দেয়ার কাজ৷ কিন্তু পরিচালক আবদুল জব্বার খান ঢাকায় সিনেমা নিয়ে আসার অনুমতি পাননা। অগত্যা, মুখ ও মুখোশ’র প্রথম প্রদর্শনী হয় লাহোরে। এরপর সিনেমা নিয়ে ঢাকায় ফিরলেও এদেশীয় কোন প্রেক্ষাগৃহ সিনেমা নিয়ে আগ্রহ দেখায়না শুরুর দিকে। যদিও পরবর্তীতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং খুলনার উল্লাসিনী সিনেমায় একযোগে প্রদর্শিত হয় সিনেমাটি। ছবিটির প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয় রূপমহল প্রেক্ষাগৃহে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, ছবির প্রথম প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক।

সিনেমাটি সেরকম ব্যবসা করতে না পারলেও পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র হিসাব এটি বেশ আগ্রহ সৃষ্টি করে সবার মধ্যে। ৬০,০০০ রূপি ব্যয়ে নির্মিত সিনেমাটি ৪৮,০০০ রুপি আয় করে প্রথম দফাতেই। 

এ সিনেমা কত টাকা আয় করলো বা কতটা ব্যবসাসফল ছিলো, তার চেয়েও বড় বিষয়- এই সিনেমাটি এদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র। এ দেশের সবাক চলচ্চিত্রের হাতেখড়িই হয়েছে 'মুখ ও মুখোশ।' এর মাধ্যমে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে এ সিনেমা আসলে এক বাঙ্গালীর চ্যালেঞ্জ জেতারও গল্প। যে অবাঙ্গালী ভদ্রলোক বলেছিলেন, বাংলাদেশে সিনেমা বানানো যায় না। সেই ভদ্রলোককে এরকম সমুচিত জবাব দেয়ার জন্যে হলেও 'মুখ ও মুখোশ'কে মনে রাখা উচিত। মনে রাখা উচিত আবদুল জব্বার খানকেও। বাঙ্গালীর অতিরিক্ত আবেগ নিয়ে সবখানেই সমালোচনা হয়। তিনিও ঠিক সেরকমই আবগের বশে নেমে গিয়েছিলেন সিনেমা বানানোতে, কোনোরকম কারিগরি জ্ঞান ছাড়াই। কিন্তু শেষে এসে তিনি যে ইতিহাসের জন্ম দিলেন, তা বাঙ্গালী ভুলবেও বা কীভাবে? 

সিনেমার পরিচালক আবদুল জব্বার খান 

সিনেমাটির মুক্তির ৬৫ বছর পার হয়ে গেছে গতকাল। শ্রদ্ধাঞ্জলি রইলো 'মুখ ও মুখোশ' এর সাথে যুক্ত প্রত্যেকটা মানুষের প্রতি। ক্যামেরার সামনে ও পেছনের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা যে ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে, সেটিই নিঃসন্দেহে আমাদের চলচ্চিত্র জগতের পথের পাথেয়। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা