আয়নাবাজির পর অমিতাভ রেজা চৌধুরী টাকাপয়সা জমিয়ে 'ঢাকা মেট্রো' নামে ওয়েব সিরিজ বানালেন। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র 'রিক্সা গার্ল' জার্মানি, কোরিয়া সহ বিভিন্ন দেশের ফেস্টিভ্যালে প্রবল প্রতাপে ঘুরছে। এখানেই শেষ না। তিনি এরইমধ্যে নির্মাণ করে ফেলেছেন 'মুন্সিগিরি' সিরিজের প্রথম ওয়েব ফিল্মও! 

পুলিশের চাকরী বিচিত্র। চোর-ডাকাত- মোটা গরাদ-চৌদ্দ শিকের বাইরেও অজস্র গল্প থাকে পুলিশের অদৃশ্য ঝুলিতে। যেসব গল্প সময়ে সময়ে খুব মানবিক, কখনো তীব্র অমানবিক। আমরা যারা সৈয়দ মুজতবা আলীর 'টুনি মেম', জরাসন্ধের 'লৌহ কপাট' কিংবা ধীরাজ ভট্টাচার্যের 'যখন পুলিস ছিলাম' পড়েছি, তখন জেনেছি, পুলিশি অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে ক্রমশ উঠে আসছে বিস্ময়কর সব আখ্যান। যেসব আখ্যান খুন-জখমের রহস্যভেদ না, বরং অদ্ভুত সব মানবিক গল্পের সুলুকসন্ধান! 

এরকম কিছু গল্প আছে মাসুদ মুন্সির ঝুলিতেও। যিনি খুব সাধারণ এক ডিবি অফিসার৷ শার্লক হোমস, এরকুল পোয়ারো, ফেলুদা কিংবা কিরীটী রায়ের মতন অসাধারণ কোনো মানবসন্তান নন তিনি। হয়তো অসাধারণ হওয়ার কোনো বাসনাও নেই তার। পুলিশি বিপদসঙ্কুল জীবন তার, আবার তার আছে এক সহজ-সরল, সোজাসাপটা জীবনও। তিনি প্রতিনিয়তই পেশাজীবন আর ব্যক্তিজীবনের মধ্যে সমান্তরাল রেখা টানতে চান। সাম্যাবস্থা রাখতে চান ভিন্নমুখী এই দ্বৈতসত্তার মধ্যে। কিন্তু এই যে সাম্যাবস্থা, সমান্তরাল রেখা টানার নিত্য-সমর, তাতে তিনি কতটুকুই বা কুলিয়ে উঠতে পারেন? আদৌ কি পারেন?

লেখক শিবব্রত বর্মণের গল্প-উপন্যাস বেশ উপভোগ্য। নিভৃতচারী এই মানুষটির বই যারা পড়েছেন, তারা তাঁর লেখার ধাঁচের সাথে বেশ অভ্যস্ত। যারা বই খুব একটা পড়েন না, তারা 'বঙ্গ বব' সিরিজের নাটক 'আলীবাবা ও চালিচার' কিংবা চরকির সাইকোলজিক্যাল অ্যান্থোলজি 'ঊনলৌকিক' দেখলে, তাঁর লেখার ধার সম্পর্কে ধারণা পাবেন। এটা দ্ব্যর্থকন্ঠে স্বীকার করতেই হবে, শিবব্রত বর্মনের লেখাগুলো মানুষকে ভাবায়। পড়লাম, বুঝলাম, শেষ হয়ে গেলো... মোটেও সেরকম না লেখাগুলো। বরং লেখাগুলো তীব্র ভাবনা-উদ্রেগকারী। এরকম চিন্তার মগজে ধাক্কা দেয়া লেখকের উপন্যাস 'মৃতেরাও কথা বলে' অবলম্বনে যখন নতুন ওয়েব ফিল্ম আসতে শুনি, যেটার পরিচালনায় আবার থাকবেন অমিতাভ রেজা চৌধুরী'র মতন সিদ্ধহস্ত নির্মাতা এবং অভিনয়ে নেতৃত্ব দেবেন মায়েস্ত্রো চঞ্চল চৌধুরী... আলাদা এক স্বস্তিই পাই যেন। 

চঞ্চল-অমিতাভ ঝড় কী ফিরবে আবার?

অমিতাভ রেজা চৌধুরীর ক্যারিয়ারের প্রথম থেকেই স্বপ্ন ছিলো, তিনি সিনেমা বানাবেন। কিন্তু এই ব-দ্বীপে সিনেমা বানানোর যে কী হ্যাপা, সে শুধুমাত্র 'আশীবিষে দংশেছে যারে' সেই বুঝবে। অমিতাভ রেজা চৌধুরী তাই অনেকদিন ধরে অজস্র বিজ্ঞাপন বানালেন। বিজ্ঞাপন বানিয়ে বানিয়েই একসময়ে জনপ্রিয় হয়ে গেলেন। টাকাপয়সা সঞ্চয় করলেন। বানালেন- আয়নাবাজি। চঞ্চল-অমিতাভের এই ডুয়েট হালফিল জনপ্রিয় হয়ে গেলো। গত এক দশকের ভালো সিনেমা বলতে আয়নাবাজি'র উপরে কাউকে স্থান দেওয়া যাবে কী না, তা নিরন্তর ভাবনার বিষয়৷ কিন্তু এক 'আয়নাবাজি' করেই থেমে গেলেন অমিতাভ রেজা চৌধুরী। আমরা অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করছি। অথচ, নির্মাতা যেন জাদুকরের সাদা রুমাল! ভোজবাজির মতন হাপিশ হয়ে গেলেন। পরে জানলাম, 'আয়নাবাজি' করে নির্মাতার পকেটে ঢোকেনি একটি টাকাও। হলগুলো সিনেমা দেখিয়েছে আর নির্মাতাকে করেছে বঞ্চিত। স্রেফ প্রবঞ্চনা করেছে। 

'আয়নাবাজি'র মুগ্ধতা কমেনি আজও! 

অমিতাভ রেজা চৌধুরী তখন আক্ষেপ করে জানিয়েছিলেন-

সিনেমা বানাবো কিভাবে? বিজ্ঞাপন বানিয়ে টাকা যোগাড় করে একটা সিনেমা বানালাম। অনেকেই পাইরেসি করলো। হল-মালিকেরা টাকা দিলো না। কষ্টের দাম তো বাদই রইলো। যে টাকা খরচ করলাম, সেটার মূল্যও পেলাম না। পকেটে সম্বল রইলো ফুটো পয়সা! 

একজন নির্মাতা দুর্দান্ত এক সিনেমা বানানোর পরেও যখন এরকম আক্ষেপ করেন, তখন বোধের ঠুনকো আস্তরে একটু হলেও চির ধরে। দেশের সংস্কৃতিজগত নিয়েও ক্রমশ শঙ্কাবোধ হয়। তবুও পরবর্তীতে খেয়াল করি, অমিতাভ রেজা চৌধুরী 'ঢাকা মেট্রো' নামে ওয়েব সিরিজ বানালেন। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র 'রিক্সা গার্ল' জার্মানি, কোরিয়া সহ বিভিন্ন দেশের ফেস্টিভ্যালে ঘুরছে। এরইমধ্যে নির্মাণ করে ফেলেছেন 'মুন্সিগিরি' সিরিজের প্রথম ওয়েব ফিল্মও। 

'মুন্সিগিরি' আসবে সামনে! 

আমি সঠিক জানি না, এই সিরিজের প্রথম পর্ব গুনগতমানে ঠিক কতটা উতরে যাবে। এটা জানেন না নির্মাতা নিজেও। অমিতাভ রেজা চৌধুরী যেমন বলেছিলেন- 

মোটেও বলবো না, খুব অসাধারণ এক গল্প এখানে আমি বলেছি। কিন্তু চেষ্টা করেছি এক গল্প বলতে। এখন সেটা সাধারণ না অসাধারণ, সেটা দর্শক বিচার করবেন। যদি দর্শকের গল্পটা ভালো লাগে, তাহলে 'মুন্সিগিরি' সিরিজের দ্বিতীয় নির্মাণ আসবে, নাহয় আসবে না।

নির্মাতা নিজেও আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখাচ্ছেন না কাউকে। যা সত্যি, সেটাই বলছেন। এরকম পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি কাম্য, যদি দর্শকেরা এই কাজটি দেখেন৷ নির্মাণ ভালো হলে হাততালি, না ভালো হলে ক্ষুরধার সমালোচনার সুযোগ তো রইলোই। কিন্তু এত কায়ক্লেশ করে যখন দেশের একজন গুণী নির্মাতা কোনোকিছু নির্মাণ করেন, সস্তা নাচ-গান-হুল্লোড়ের প্রথাগত কাঠামোকে উপেক্ষা করে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সুস্থ রুচির গল্প বলেন, তখন সেটিকে সমর্থন করার জন্যে হলেও আমাদের সরব হওয়া উচিত। এভাবে সরব হয়ে আলোচনা-সমালোচনা বাড়াতে বাড়াতে একসময়ে যে স্রোত সৃষ্টি হবে, সে খরস্রোতে ভেসে ভেসেই হয়তো এদেশের সংস্কৃতি সঠিক, সুস্থ, সাম্যাবস্থানে পৌঁছাবে। ঠিক সেজন্যেই এত অনুরোধ। এত শব্দব্যয়। এত স্বপ্ন দেখা। 

'মুন্সিগিরি' সিরিজের জন্যে শুভকামনা। ভালো কিছুর প্রতীক্ষায় রইলাম। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা