জনতার ভীড় থেকে তিনি এখন পাদপ্রদীপের আলোয়, এক্সট্রা রোলের সেই সময়টা পেছনে ফেলে নওয়াজউদ্দিন এখন ভারতের সেরা অভিনেতাদের একজন। কিন্তু নওয়াজ তো শুধু দারুণ একজন অভিনেতাই নন, তিনি একজন যোদ্ধা, হাল না ছেড়ে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়া এক অনুপ্রেরনার ভাণ্ডারও...

তাঁর সম্পর্কে শাহরুখ খান বলেছিলেন- “নওয়াজ ভাই যতো বড় মাপের অভিনেতা, আমি তার ছিটেফোঁটাও নই। নিজের মেধা সম্পর্কে সম্ভবত উনারই সঠিক ধারণা নেই। ফিল্মে কাজ করছেন, থিয়েটার থেকে এসেছেন, অনেক ভালো আর অনেক বেশী আলাদা ঘরানার অভিনেতা তিনি। পঁচিশ বছর ধরে সিনেমায় কাজ করছি আমি, এই অভিজ্ঞতায় বলি; বয়স কিংবা সময়ের খাতায় হয়তো আমি নিজেকে সিনিয়র দাবী করতে পারি, কিন্ত অভিনয়ের স্কেলে আমি মোটেই সিনিয়র নই। উনার মতো অভিনেতারা যখন আমার সামনে দাঁড়ান, আমি দারুণ অনুপ্রাণিত হই। আমি শুধু প্রশংসা করছি এমনটা ভাববেন না, এগুলো বলছি কারন, দারুণ কোন অভিনেতাকে চোখের সামনে দেখলে বা তাঁর সাথে কাজ করার সুযোগ পেলে আমার খুব ভালো লাগে। আমরা তো যা তা করে পার হয়ে এসেছি, ক্যারিয়ারের অনেকগুলো বছর, অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করেছি। কিন্ত উনার অভিনয়ের যে আশ্চর্য্য দ্যুতি, সেটা আমার উপর যখন প্রতিফলিত হয়, তখন আমাকেই বোধহয় দেখতে খানিকটা ভালো লাগে।”

আমাদের আজকের গল্পের শুরুটা ১৯৭৪ সালের ১৯শে মে, ভারতের উত্তরপ্রদেশের ছোট্ট গ্রাম বুধানায়। মুজাফফরনগর জেলার অন্তর্গত এই গ্রামের মানুষের পেশা ছিল দুটি, একদল কাজ করতো দিনে, তারা করতেন কৃষিকাজ। অন্যদলের কাজ ছিল রাতের আঁধারে, ডাকাতিটাই ছিল অনেকের পেশা। শহর থেকে অনেক দূরে সেই অরাজক এক রাজ্যে সাত ভাই দুই বোনের ঘরে সবার বড় নওয়াজ বেড়ে উঠলেন গ্রামের ফসল আর মাটির গন্ধ গায়ে মেখে। 

বাবা ছিলেন কৃষক, তাঁরও সে পথেই যাবার কথা ছিল। কিন্ত পড়ালেখায় তাঁর আগ্রহ দেখে বাবা ভাবলেন, বড় ছেলেটা না হয় স্কুলটা শেষ করুক। গাড়িঘোড়া না পাক, অন্তত অল্প বেতনের একটা চাকুরী জুটিয়ে নিতে পারলেও মন্দ কি! রসায়নের মতো একটা কাঠখোট্টা সাবজেক্টের উপর দিল্লী থেকে শেষ করলেন গ্রাজুয়েশন; বলা বাহুল্য, তাঁর গ্রামের প্রথম গ্র্যাজুয়েট তিনিই। বরোদায় পেলেন চীফ কেমিস্টের চাকুরী। 

বেতন খারাপ ছিল না, কিন্ত বছরখানেকের মধ্যেই বিরক্তি এসে গেল কাজে। কোন নতুনত্ব নেই, নেই কোন পরিবর্তন। চাকুরীতে আর আগ্রহ পাচ্ছিলেন না, কিসে আগ্রহ ফিরে পাবেন সেটাও বুঝতে পারছিলেন না তখন, আর তাই চাকুরী ছেড়ে ফিরে গেলেন আবার দিল্লীতে।

নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী

পুনরায় দিল্লী যাত্রাই বদলে দিল তাঁর জীবনের গতিপথ। এক সন্ধ্যায় হাতে কাজ না থাকায় বন্ধুর সাথে গিয়েছিলেন স্থানীয় এক থিয়েটারে নাটক দেখতে। নাটক শেষ হল, থিয়েটার থেকে বেরিয়ে ঘরে চলে এলেন তিনি, কিন্ত মনটা রেখে এলেন সেখানেই, সেই মঞ্চে। অভিনয়ের নেশা জেগে উঠলো মনের গহীন অরণ্যে, মনে হল, এতোদিন ধরে যার জন্যে হন্যে হয়ে বেড়িয়েছেন, এটাই তো সেই কাঙ্খিত বস্ত! থিয়েটারের নিয়মিত দর্শক হয়ে উঠলেন এরপর থেকেই। প্রায় পঞ্চাশ-ষাটটা নাটক দেখে ফেললেন এভাবে, তাঁর ভাষায়-

“আমি একটানা পঞ্চাশ-ষাটটা নাটক দেখে ফেলেছিলাম, কারণ আমার মনে এই আত্মবিশ্বাস ছিল না যে আমি মঞ্চে উঠে একটা কথাও মুখ দিয়ে বলতে পারবো। একারনেই আমাকে এতোগুলো শো দেখতে হয়েছিল, আমি তাঁদের আচরণ, কথা বলার ভঙ্গী, এগুলো নিজের ভেতরে ঢোকানোর চেষ্টা করেছিলাম এই ক’দিনে।”

এরমধ্যেই যোগ দিলেন এক থিয়েটার গ্রুপে। দিল্লীতে থাকা-খাওয়ার খরচ চালানো তো আর মুখের কথা নয়, এদিকে থিয়েটারের নেশায় ফুলটাইমের কোন কাজও করতে পারবেন না, তাই বেছে নিলেন ওয়াচম্যানের চাকরী। রসায়নে গ্র্যাজুয়েট এই যুবক দশটা-পাঁচটা পাহারাদারের কাজ করতেন, তারপর সন্ধ্যায় হানা দিতেন থিয়েটারের মঞ্চে। তাঁর সাথে একই গ্রুপে কাজ করতেন বিখ্যাত অভিনেতা মনোজ বাজপাইও, সেখানে নওয়াজের জন্যে চরিত্রও মিলতো না রোজ। 

তবে প্রতিভা তো ছাইচাপা দিয়ে রাখা যায় না বেশীদিন, তাঁর প্রতিভাও চাপা রইলো না, রোল পেতে শুরু করলেন নাটকে, এরপর থিয়েটার ছেড়ে পাড়ি জমালেন ভারতের অভিনয়ের সূতিকাগার বলে বিবেচিত ‘ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা’য়, নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিতে ভর্তি হলেন এখানে। তিন বছরের ডিগ্রী নিলেন, তার পরের কয়েকটা বছরও এই প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে ঘুরেই কাটালেন। কখনও কাজ মিলেছে, নাটকে ছোটখাটো রোল পেয়েছেন, আবার কখনও টাকার অভাবে খালি পেটেও থেকেছেন। তারপর ঠিক করলেন, না খেয়ে মরতে হলে দিল্লী কেন, মুম্বাই গিয়েই মরি। এমনটা ভেবেই মুম্বাইয়ের ট্রেনে উঠে বসলেন।

মুম্বাইতে প্রতিদিন হাজারখানেক ছেলেমেয়ে শুধু অভিনেতা বা সুপারস্টার হবার বাসনা নিয়ে পা রাখেন, বলিউডের ফিল্মি দুনিয়ার রঙিন স্বপ্নগুলো জুহু বীচের জলে ভেসে যেতে সময় লাগে না বেশী। নওয়াজের স্বপ্ন ভাংতেও দেরী হল না। এই বিশাল শহরে কে কার খোজ রাখে? বলিউড মানেই তো হ্যান্ডসাম, ফিটফাট, ফর্সা-লম্বা ছাড়া আবার নায়ক হওয়া যায় নাকি? সেখানে সাড়ে পাঁচ ফুটের কৃষ্ণবর্ণের নওয়াজকে নিয়ে কাজ করবেন টা কে? তাঁর তো কোন ফাদার-গডফাদারও নেই ইন্ডাস্ট্রিতে। 

এই হতাশার পরিমাণটা ছিল প্রকাণ্ড। অভিনয় করতে এসে দেখলেন, এখানে মেধার চেয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের দাম অনেক বেশি। নওয়াজের ভাষায়- “সিরিয়ালে কাজ করে পেট চালাবো ভেবেছিলাম, কিন্ত সেখানে দেখি ভিখারীর চরিত্রও ছয়ফুট লম্বা সুন্দর চেহারার কাউকে দেয়া হয়। কয়েকটা পাসিং রোল কপালে মিলে গিয়েছিল, করেছিলাম, শুধু খাবারের টাকা জোগাড় করার আশায়। তারপর ফিল্মে চেষ্টা করতে শুরু করলাম। সি গ্রেডের কিছু সিনেমায় ছোটখাটো এক-দুই মিনিটের রোল পেতাম। ফেলে দেয়ার মতো অবস্থা ছিল না তখন আমার।

তারপর মোটামুটি ভালো কিছু ডিরেক্টরের সাথে খাতির জমানোর চেষ্টা করলাম, একটা-দুটো করে সীন মিলতে লাগলো, অনেক সিনেমায় আমি ভীড়ের মধ্যে একজন হয়ে দাঁড়িয়েছি, পাঁচশো-হাজার টাকা পাওয়া যেত এগুলো করে। দু-তিনদিনের খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যেত তাতে। কিন্ত জুনিয়র আর্টিস্টের কার্ড ছিল না আমার, তাই যা পেতাম, বেশীরভাগ সময়েই অর্ধেক রেখে দিত প্রোডাকশন ম্যানেজার বা কো-অর্ডিনেটর। ক্রাউড সীনে যখন ক্যামেরা আমার দিকে আসতো, আমি মাথা এদিক সেদিন নাড়িয়ে চেহারা লুকানোর চেষ্টা করতাম যাতে আমার পরিচিত কেউ দেখলে চিনতে না পারে।” 

তারপর সুযোগ পেলেন বড় প্রোডাকশনের হয়ে কাজ করার। ‘সারফারোশ’ সিনেমায় রোলটা পেলেন এক অপরাধীর, আমির খানের সামনে মিনিটখানেকের স্ক্রীনটাইম পেলেন তিনি। উদোম শরীরে কান্নাকাটি করে মাফ চাওয়াটাই ছিল কাজ। এরপর মনোজ বাজপাই’র ‘শুল’, রাজু হিরানী-সঞ্জয় দত্তের মাস্টারপিস ‘মুন্নাভাই এমবিবিএসে’র মতো বড় বড় সিনেমায় খুব ছোট ছোট রোল পেতে লাগলেন তিনি। কখনও হয়তো কাজ ঠিকই করেছেন সিনেমায়, কিন্ত এডিটিং এ বাদ দেয়া হয়েছে তাঁকে, ভালো দেখাচ্ছে না এমন অজুহাতে। 

হতাশা গ্রাস করছিল ধীরে ধীরে, এতোগুলো বছর কঠোর পরিশ্রম করেও বলার মতো কিছুই তো করতে পারলেন না। গ্রামে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন, লোকে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করে বলে। এলাকায় গেলেই লোকে টিটকারি দিত- আ গ্যায়া হিরো(দেখ, নায়ক এসেছে) বলে। সেই সময় ভরসা হয়ে পাশে এসে দাড়ালেন তাঁর মা। পড়ালেখা না জানা এই মহিলা তাঁকে জীবনের সবচেয়ে মধুর কয়েকটা বাক্য শুনিয়ে দিলেন, বললেন- “বারো বছর লাগে একটা একটা বাচ্চা মেয়ের কিশোরী হতে, তার পুরো দুনিয়াই যায় বদলে। তোর তো মাত্র ছয় বছর হলো। লেগে থাক, হাল ছাড়িস না বাবা...।”

নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি মায়ের কথা রেখেছেন। ঝড় ঝাপটা এসেছে, তিনি সয়ে নিয়েছেন, ভেঙে গিয়েছেন কিন্ত মচকে যাননি; হতাশ হয়েছেন, বারবার নুয়ে পড়েছেন, কিন্ত হাল ছেড়ে দেননি। মা’ও ছায়াসঙ্গী হয়ে পাশে ছিলেন পুরোটা সময়েই। পুরো বিশ্বে যারাই শূন্য থেকে শিখরে উঠেছেন, প্রত্যেকেই সংগ্রাম করেছেন। ইন্টারনেট আর মিডিয়ার বদৌলতে তাঁদের কষ্টকর পথচলাটা জানতে পারি আমরা। কিন্ত এই দুরূহ যাত্রায় তাঁদের কাছের মানুষগুলোর ত্যাগের খবর জানেন ক’জনে? সেটা তো আড়ালেই থেকে যায়। সিনেমায় নওয়াজের মা দেখেছিলেন, বাচ্চারা যা হতে চায় তাদের সেটা হবার স্বাধীনতা দেয়া উচিত। পড়ালেখা না জানলেও এই কথাটা বুঝতে পেরেছিলেন ভদ্রমহিলা, আর তাই নওয়াজের বন্ধুর পথে হাঁটার দিনগুলোতে সবচেয়ে বড়ো আশ্রয়স্থল আর অনুপ্রেরনার উৎস ছিলেন তিনিই।

‘নিউইয়র্ক’ সিনেমায় দুই মিনিটের একটা রোলে এসে আক্ষরিক অর্থেই কাঁপিয়ে দিলেন নওয়াজ, আমেরিকার ডিটেনশান সেন্টারে এফবিআইয়ের হাতে নির্যাতনের শিকার একজন হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছিলেন ক্যাটরিনা কাইফের ধরে রাখা ক্যামেরার সামনে, সেই দুই মিনিটেই দু’চোখের পানি বের করে নিয়েছেন অসংখ্য দর্শকের।

অনুরাগ কাশ্যপ নামের মেধাবী এক পরিচালক তখন অন্যরকম কিছু ফিল্মের স্ট্র্যাটেজি নিয়ে নিজেই স্ট্রাগল করছেন বি-টাউনে, নওজউদ্দিনকে বেশ আগেই চোখে পরেছিল তাঁর, কাজও করেছেন একসাথে কয়েকটা। তাঁর সিনেমাতেই প্রথম গুরুত্বপূর্ন চরিত্রে নওয়াজের আত্মপ্রকাশ, কিন্ত ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ সিনেমাটা আটকে ছিলো সেন্সরবোর্ডে। আমির খানের পিপলি লাইভ করে একটু নজরে এলেন, সুজয় ঘোষের ‘কাহানী’তে কাস্ট হলেন নিউইয়র্ক সিনেমার ওই দুই মিনিটের পারফরম্যান্সে। পুলিশ ইন্সপেক্টর খানের চরিত্রে ‘কাহানী’তে নওয়াজকে দেখে থ হয়ে গেলেন ক্রিটিক্সের লোকেরা পর্যন্ত। বলিউডপাড়ায় কানাকানি শুরু হলো তাঁকে নিয়ে। 

সাফল্য আসি আসি করেও ধরা দিচ্ছিলো না এতোদিন, হয়তো অপেক্ষা ছিল সঠিক সময়ের, কিংবা সঠিক চরিত্রের। নওয়াজের জীবনে সেই চরিত্র হয়ে এলেন ফায়জাল খান। ব্ল্যাক ফ্রাইডে বানানোর সময়ই অনুরাগ কাশ্যপ নওয়াজকে কথা দিয়েছিলেন, 'আপনাকে নিয়ে আমি একটা পুরো সিনেনা করব।' অনুরাগ তার দেয়া কথা রাখলেন, ২০১২ সালে বানালেন তাঁর দুই পর্বের মাস্টারপিস ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’, দ্বিতীয় পর্বে ফায়জাল খান চরিত্রে তাঁর দুর্দান্ত অভিনয় সারাজীবনই চোখে লেগে থাকবে মুভি ফ্রীকদের। বি-টাউনে এই সিনেমা দিয়েই নিজের অবস্থানটা পাকাপোক্ত করে নিলেন মুজাফফরনগরের অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে আসা ছেলেটা। সময়ের সেরা আরেক অভিনেতা মনোজ বাজপাইর সাথে সমানে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করলেন নওয়াজ, জীবনের গতিপথটা পাল্টে গেল ঠিক এই মোড়ে এসেই।

সিনেমার নাম গ্যাংস অব ওয়াসিপুর-২

২০১২-১৩ তে ইরফানের সাথে কাজ করেছেন ‘দ্যা লাঞ্চবক্স’, ‘পান সিং তোমার’ সিনেমায়। প্রথমবারের মতো লিড রোলে অভিনয় করেছেন ‘মিস লাভলি’ সিনেমাতে, সেটা ফ্লপ। আমির খান আবার তাঁকে নিলেন ‘তালাশ’- এ, একযুগ আগে যার সিনেমাতে এক মিনিটের রোল পেয়েছিলনে, তাঁর বিপরীতেই ভিলেন হিসেবে আবির্ভূত হলেন এবার। এরপর সালমান খানের সাথে করলেন ‘কিক’, পাগলাটে এক ভিলেনের চরিত্রে। নওয়াজের মায়ের প্রিয় সিনেমা এটা, কারণ এই সিনেমায় নওয়াজ কোট-প্যান্ট পরে অভিনয় করেছেন, তাঁকে দেখতে খানিকটা ভদ্রলোক লেগেছে। তাঁর গ্রামের মানুষের মধ্যেও নওয়াজের এই সিনেমাটাই সবচেয়ে জনপ্রিয়। 

‘কিক’-এর পর অবশ্য পেছনে প্রযোজক-পরিচালকদের লাইন লেগে গিয়েছে, বদলাপুরে তাঁর প্রত্যেকটা অভিব্যক্তি বাস্তবের চেয়েও নিখুঁত মনে হয়েছে, এর আগে ‘মাঝি দ্যা মাউন্টেনম্যানে’ দশরথ মাঝির সংগ্রামী জীবনকে সেলুলয়েডের ফিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন সূচারুরূপে। সালমান খানের বিপরীতেই আবার ‘বাজরাঙ্গী ভাইজানে’ সাংবাদিকের চরিত্রে হাজির হয়ে জানান দিয়েছেন, পজিটিভ রোলে তিনি কতোটা দারুণ করতে পারেন। ‘রইস’ সিনেমায় পুলিশের চরিত্রে নাচিয়ে ছেড়েছেন বলিউড বাদশা শাহরুখ খানকে। 

নন্দিতা দাসের 'মান্টো' সিনেমায় সাদাত হোসেন মান্টো'র রোলে তিনি আশ্চর্য্য সাবলীল, শুটিং শুরুর আগে উর্দুতে কথা বলা শেখার জন্যে দুইমাস সময় নিয়েছিলেন তিনি। এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্যে পারিশ্রমিক হিসেবে মাত্র এক রূপি নিয়েছিলেন নওয়াজ। নেটফ্লিক্সের স্যাক্রেড গেমস ওয়েব সিরিজে গণেশ গায়তোণ্ডে হিসেবেও তিনি অনবদ্য। কিছুদিন আগে মুক্তি পেলো 'ফটোগ্রাফ', সেখানেও অভিনয়ের দারুণ ভাণ্ডার খুলে বসেছিলেন তিনি। 

মধ্যচল্লিশে এসে জীবনটাকে খুব সোজাসাপ্টাভাবে দেখেন নওয়াজ। শূন্য থেকে সাফল্যের শিখরে আরোহন করেও বিন্দুমাত্র অহমিকা গ্রাস করতে পারেনি তাঁকে, এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন- “জীবনে অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছি। নিজের পছন্দ মতো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাচ্ছি, এতেই আমি খুশি। তারকা হওয়ার স্বপ্ন কোনকালেই ছিল না। শুধু ভাল অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পেতে চেয়েছিলাম। এখন বাণিজ্যিক ছবিতেও আমাকে ভেবে চরিত্র লেখা হচ্ছে। তাই বলিউডের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।”

তাঁর স্ত্রীর মতে, নওয়াজের সবচেয়ে বড় গুণ হাত পা গুটিয়ে বসে না থাকাটা। সারাক্ষনই কিছু না কিছু করছেন তিনি, নতুন কিছু করার জন্যে বরাবরই উন্মুখ নওয়াজ, আর এটাই তাঁকে বানিয়েছে প্রজন্মের অন্যতম সেরা ভিন্নমুখী অভিনেতা।

অভিনয় নিয়েও কোন তত্ত্বকথা বা বহুমাত্রিক দর্শনে বিশ্বাসী নন তিনি। অভিনয়টা তাঁর কাছে আত্মিক ব্যাপার। “কেউ যখন আমার দিকে তাকায়, মনে হয় সে আমাকে দেখছে না। আমার ভেতর অন্য কাউকে খুঁজছে। তারা আসলে আমাকে নয়, আমার ভেতরের তারকাকে খোঁজে। কিন্তু আমার তো সেই তারকাদ্যুতি নেই। তাই তাদের সেই চাহনির সঙ্গে এখনো আমি অভ্যস্ত হতে পারিনি”- হিন্দুস্তান টাইমসকে বলছিলেন নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি। জনতার ভীড় থেকে তিনি এখন পাদপ্রদীপের আলোয়, এক্সট্রা রোলের সেই সময়টা পেছনে ফেলে নওয়াজউদ্দিন এখন ভারতের সেরা অভিনেতাদের একজন। 

নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী তো শুধু দারুণ একজন অভিনেতাই নন, তিনি একজন যোদ্ধা, হাল না ছেড়ে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়া এক অনুপ্রেরনার ভাণ্ডার। আরো অনেকগুলো বছর অভিনয় দিয়ে মুগ্ধ করে রাখুন আমাদের, বলিউডের সুপারস্টারদের ভিড়ে অভিনেতাদের ছোট্ট লিস্টের সবচেয়ে উজ্জ্বল দ্যুতিময় তারকা তো আপনিই। ভালোবাসা নিরন্তর...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা