'ওটিটি'র বরাতে তিনি পেয়েছিলেন 'গ্লোবাল স্টার' এর স্ট্যাটাস। ভারতে ওয়েব সিরিজের বেঞ্চমার্ক 'স্যাক্রেড গেমস' এর মূখ্য কুশীলব তিনি। সিরিয়াস মেন, রাত আকেলি হ্যায়, ঘুমকেতুর মতন ওটিটি কন্টেন্ট নিয়ে বাজিমাত করা সেই নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী যদি জানান, তিনি আর ওটিটিতে কাজ করবেন না... সে সংবাদে খানিকটা হলেও নড়েচড়ে বসতেই হয়!

হপ্তাখানেক আগেই বলিউডের রেসিজম নিয়ে বেশ থট প্রভোকিং কথাবার্তা বলেছিলেন নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী। নেপোটিজমের চেয়েও ভয়ঙ্কর হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এই ইন্ডাস্ট্রির চামড়াজাত বৈষম্যকে৷ যেসব কথা তিনি বলেছেন, তা সর্বৈব সত্যিও। খুব স্পষ্টভাবেই  বলিউডের 'ব্রাইটনেস নিয়ে উইকনেস' দেখানোর পাশাপাশি তিনি আক্ষেপ করেছেন, কিভাবে এ ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিভার চেয়ে গাত্রবর্ণ প্রকট হয়ে ওঠে! যদিও নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর এ কথার পরেও কারো কোনো হেলদোল আসে নি। 'অরণ্যে রোদন' হয়েই থেকে গিয়েছে এই গুণী অভিনেতার বলা নির্জলা সত্যিটুকু। বলিউড তার বর্ণবাদী মানসিকতা নিয়ে যে অবস্থানে আছে, সেখান থেকে নড়েনি একচুলও। ধ্রুব হয়েই রয়ে গিয়েছে একই অবস্থানে 

যা সত্যি, তা বলার ক্ষেত্রে বরাবরই সরব তিনি! 

তবে তাতে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর কিছু যায় আসে না। যা সত্যি বলে মনে করন তিনি, সেটি বলতে কখনোই পিছপা না হওয়ার যে অভ্যাস তার, তা তিনি বজায় রেখেছেন এখনও। যার রেশ ধরে সম্প্রতি যেমন তিনি এক হাত নিলেন ওটিটিকে। জানালেন- ওটিটি ছাড়তে চাচ্ছেন তিনি। এখন থেকে আর কোনো ওয়েব শো'তে অভিনয় করবেন না, সে সিদ্ধান্তও জানালেন এরপর। যদিও আকস্মিক এ সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছে প্রায় সবাই। যে 'ওটিটি'র বরাতে তিনি পেয়েছিলেন 'গ্লোবাল স্টার' এর স্ট্যাটাস, ভারতে ওয়েব সিরিজের মাইলফলক 'স্যাক্রেড গেমস' এর মূখ্য কুশীলব যিনি, সিরিয়াস মেন, রাত আকেলি হ্যায়, ঘুমকেতুর মতন ওটিটি কন্টেন্ট নিয়ে যিনি বাজিমাত করেছেন, সে মানুষটি যদি স্ট্রিমিংসাইট নিয়ে এমন কথা বলেন, তখন সাধারণ সিনেমাপ্রেমীদের চক্ষু চড়কগাছ হওয়াটাই স্বাভাবিক।  তাছাড়া আমরা যারা সিনেমা-সিরিজের নিয়মিত দর্শক, আমরা এও জানি, ওটিটির কল্যানেই ব্রডার রেঞ্জে দুর্দান্ত সব বৈচিত্র্যময় কাজ হচ্ছে। কাজগুলোর ইজি এবং কুইক ডিস্ট্রিবিউশন হচ্ছে। অনেক আর্টিস্ট কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন৷ সে সব কাজ বেটার এক্সপোজারও পাচ্ছে। সব মিলিয়ে উইন-উইন সিচুয়েশন। তাহলে এই প্ল্যাটফর্ম নিয়ে আক্ষেপ কেন থাকবে? 

'স্যাক্রেড গেমস' এর ফ্রন্টফেস নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী! 

নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর কথাগুলো যদিও বেশ বৈপরীত্যের দ্যোতনা নিয়েই আসে, তবে তিনি যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলো উড়িয়ে দেয়ার মতনও না। আক্ষেপ করেছেন, ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে আজকাল এমন সব কন্টেন্টই আসে, যেগুলো অপ্রয়োজনীয়, মানহীন। তাছাড়া অজস্র প্ল্যাটফর্ম, অজস্র প্রোডাকশন হাউজ, অজস্র অভিনেতা...সবাই মিলেঝিলে প্রতিদিন যেসব কন্টেন্টের জন্ম দিচ্ছে, সেগুলোর গুণগত গ্রহনযোগ্যতা আসলে কতটুকু, কয়জন মানুষ তা দেখে, তাও প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। নওয়াজউদ্দিনের ভাষায়- 

পুরোটাই এখন এক ধান্ধা। সবাই টাকা নিয়ে ছুটছে, যা খুশি বানাচ্ছে, দিয়ে দিচ্ছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। এত এত কাজ, কেউ কিছু দেখছেও না। কেউ কিছু বুঝছেও না। ভজঘট হয়ে গিয়েছে। আমি নিজেই কোনো ওটিটি কন্টেন্ট দেখি না। যে জিনিস আমি নিজে দেখি না, তা আমি অন্যকে কেন দেখতে বলবো? আমি তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর কোনো ওয়েব কন্টেন্টে কাজ করবো না। 

নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী তার এ প্রতিজ্ঞা রাখতে পারবেন কী না, তা জানা নেই কারো। তবে এটুকু সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন, অজস্র নির্মাণের অবিরল জলোচ্ছ্বাসে আমরা নিয়মিত নাকানিচোবানি খাচ্ছি। প্রতিটি স্ট্রিমিং সাইটই তাদের অডিয়েন্স হুক করার জন্যে প্রতিদিনই নানারকম কন্টেন্টের পসরা সাজিয়ে বসছে। আমরাও তেলেভাজা খেয়ে ঠোঙ্গা ফেলে দেওয়ার মতন এক কন্টেন্ট দেখা শেষেই সেটিকে ভুলে যাচ্ছি। হাত বাড়াচ্ছি অন্য কোথাও। যা পাচ্ছি, গোগ্রাসে গিলছি সব। কিন্তু ভাবছি কিছু? সেখানেই গলদ। পশ্চিমবঙ্গের লেখক চন্দ্রিল ভট্টাচার্য বলেছিলেন একবার- আজকাল এত কন্টেন্ট আশেপাশে। মানুষ ভাবতে ভুলে গিয়েছে। এ কথার সাথে দ্বিমত করার সুযোগ আছে একরত্তি? 

কন্টেন্টের অদ্ভুত নাভিশ্বাস উঠে যাওয়ার এ সময়ে দাঁড়িয়ে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর কথাগুলো তাই অমূলক না মোটেও। বরং, বড্ড প্রাসঙ্গিক। কাজ তো প্রচুর হচ্ছে। কিন্তু দাগ কাটার মত কাজ হচ্ছে ক'টা? প্রশ্ন ঠিক সেখানেই। যে প্রশ্ন নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী করেছেন। যে প্রশ্ন বাদবাকি সকলেরই। এবং এই ন্যায্য অজুহাতে গুণী এ অভিনেতা যদি স্ট্রিমিংসাইট এর ইট-কাঠ-কংক্রিট থেকে অব্যাহতি চান, খুব কী অমূলক সিদ্ধান্ত হবে তা? 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা