এই সিনেমা মানুষের কথা বলে, ক্ষমতার কথা বলে, রাজনীতির কথা বলে। চোখে ঠুলি পরে রোমান্স, ড্রামায় না মাতিয়ে নিজেদের অক্ষমতা,গণতন্ত্রের আড়ালে স্বৈরতন্ত্র, নির্বাচন নামক স্টেজ শোর অসাড়তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তারা পারে, তারা দেখায়। আমরা তো কল্পনাও করতে পারি না!

মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রি উঠতে বসতে ভালো সিনেমা বানায়, গ্রিপিং সিনেমা বানায়। সে সিনেমাগুলো দেখলে মনে হয় যে বাস্তব উঠে এসেছে। এমন একটা গল্প, এমন একটা কালচার, এমন একটা বয়ন উঠে এসেছে যেটা একইসাথে আলাদা ও তাদের নিজস্ব আবার পাশাপাশি রিলেটেবলও বটে।

উপমহাদেশের রাজনীতির স্বরূপ আমাদের সবারই কম-বেশি দেখা। গণতন্ত্রর নামে আসলে ক্ষমতার অপব্যবহারকেই আমরা যুগের পর যুগ ধরে পুষে আসছি। সেটাই এখন আমাদের জন্য স্বাভাবিক। তো একটা রাষ্ট্রযন্ত্র যখন ক্ষমতার অপব্যবহার করে চলতে থাকে তখন স্বাভাবিকভাবেই এর নিয়ন্ত্রণে থাকা কর্মী বাহিনিকেই তাদের হয়ে 'ডার্টি ওয়ার্ক'গুলো করতে হয়।

এজন্য আমাদের সাধারণ জনগণের জন্য তৈরি হওয়া নানান গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান কিংবা বাহিনীকে উল্টো সাধারণ মানুষের সাথেই ক্রমাগত ক্ষমতার অপব্যবহার করতে দেখা যায়। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে পুলিশই সবচেয়ে এগিয়ে। তারা যেহেতু মাঝামাঝি অবস্থান করে তাই তাদের জনতার রোষও সামলাতে হয় আবার ক্ষমতাসীনদের তোপও। পুলিশের নিজস্ব ক্ষমতার অপব্যবহার, তারপর এই দু পক্ষের ঝামেলার মাঝে তাদের ক্ষমতাহীনতা- এই দুটো বিষয়ই মূলত 'নায়াত্তু' সিনেমার মূল প্রেক্ষাপট। 

নায়াত্তু সিনেমার পোস্টার

সিনেমাতে তিনজন পুলিশ ক্যারেক্টারকে আমরা যার যার গল্প নিয়ে শুরু করতে দেখি। মাইকেল পুলিশে জয়েন করেছে, তার বাবাও পুলিশে ছিল। তার প্রতি বাড়তি চাওয়া সবারই। বাড়িতে অসুস্থ মা আর বিয়ে নিয়ে ক্রমাগত প্রেশার তাকে চিন্তিত রাখে সবসময়ই। অন্যদিকে মানিয়াপ্পান সিনিয়র অফিসার। জীবনের দীর্ঘ একটা সময় পার্বত্য অঞ্চলে ডিউটি করার কারণে পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন একটি সময় গিয়ে যে নিজের স্ত্রী ও সন্তানকে ঠিকঠাক সময় দেবেন। মেয়ের স্কুলের ড্রামার কম্পিটিশন নিয়ে তাকে খুবই উদগ্রীব দেখানো হয়।

আরেকজন হল সুনিতা, যে কীনা নিজের আত্মীয়স্বজনের যন্ত্রণাতেই অতিষ্ঠ। একদিকে টাকার সংকট, অন্যদিকে গুণ্ডাদের হুমকিতে সে বিপর্যস্ত থাকে সবসময়। তিনজনের সবগুলো গল্প একসাথে মিশে যায় যখন শহরে নির্বাচনের প্রাক্কালে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশের ক্ষমতা ও পুলিশের ক্ষমতাহীনতা দুটোই প্রকট হয়ে ওঠে গল্প আগাতে থাকলে।

নায়াত্তু একদম নিরেট, নির্মেদ একটি ক্রাইম থ্রিলার। বাড়তি কোনকিছুই নেই। ২ ঘণ্টা রানটাইমের এই সিনেমা প্রথমে ধীরলয়ে শুরু হলেও দ্রুতই গতিশীল হতে থাকে। নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি, পুলিশের ওপর সরকারের প্রভাব, জাতবিদ্বেষকে পুঁজি করে রাজনীতি- অনেকগুলো বিষয়ই তুলে এনেছেন এখানে পরিচালক মার্টিন প্রাক্কাত দারুণ দক্ষতায়।

নায়াত্তু সিনেমার একটি দৃশ্য

মার্টিনের ব্যাপারে আরেকটি তথ্য দিয়ে যাই, সেটা হল তার আগের পরিচালিত সিনেমাটি ছিল ৬ বছর আগে এবং সেটির নাম ছিল 'চার্লি'। হ্যাঁ, দুলকার সালমানের চার্লি। কীভাবে এরা এক জনরা থেকে অন্য জনরায় সুইচ করে এবং এতোটা ভালোভাবে করে সেটাই মাঝে মাঝে রহস্যময় লাগে। এই সিনেমার অভিনেতারা প্রত্যেকেই অনেক ন্যাচারাল ছিল। মাইকেল চরিত্রে অভিনয় করা কানচাকো বোবানের আগের সিনেমা আঞ্জাম পাথিরাও ছিল অসাধারণ একটি থ্রিলার। এরা নিয়মিত দারুণ দারুণ কাজ করেই যাচ্ছে। মানিয়াপ্পান চরিত্রে জজু জর্জ ছিলেন অনবদ্য।

সব মিলিয়ে নায়াত্তু বেশ ইম্পরট্যান্ট একটি সিনেমা। ইম্পরট্যান্ট এই অর্থে যে এই সিনেমা মানুষের কথা বলে, ক্ষমতার কথা বলে, রাজনীতির কথা বলে। চোখে ঠুলি পরে রোমান্স, ড্রামায় না মাতিয়ে নিজেদের অক্ষমতা,গণতন্ত্রের আড়ালে স্বৈরতন্ত্র, নির্বাচন নামক স্টেজ শোর অসাড়তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তারা পারে, তারা দেখায়। আমরা তো কল্পনাও করতে পারি না।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা