চুমকি খুব গর্ব করে বলেন, 'আমার মা আমাকে জন্ম দিয়েছেন, কিন্তু থিয়েটার আমাকে মানুষ করেছে।' মঞ্চের প্রতি চুমকির নিবেদন আর ভালোবাসা এই এক বাক্যেই স্পষ্ট। অথচ এমন একজন গুণী অভিনেত্রীকে ঠিকঠাক ব্যবহার করা যাচ্ছে না নাটক অথবা সিনেমায়...

আপাদমস্তক মঞ্চ অন্তঃপ্রাণ কিছু শিল্পী থাকেন, থিয়েটারটাকে যারা নিজেদের ঘরবাড়ি মনে করেন সারাটা জীবন। নাটক সিনেমায় অভিনয় করে তারা পুরোপুরি তৃপ্তি পান না, বারবার ফিরে যান আঁতুড়ঘরে, যেখানে তাদের শিল্পীস্বত্ত্বার জন্ম হয়েছিল। নাজনীন চুমকি সেরকম এক অভিনেত্রী। যিনি খুব গর্ব করে বলেন, 'আমার মা আমাকে জন্ম দিয়েছেন, কিন্তু থিয়েটার আমাকে মানুষ করেছে।' মঞ্চের প্রতি চুমকির নিবেদন আর ভালোবাসা এই এক বাক্যেই স্পষ্ট। এমন একজন অভিনেত্রীকে মরীচিকার মতো একটা ওয়েব কন্টেন্টের ট্রেলারে দেখতে পাওয়াটা অবাক হবার মতোই ব্যাপার ছিল। 

চুমকি চুয়াডাঙ্গার মেয়ে, স্থানীয় নাট্যদলে অভিনয়ের হাতেখড়ি। নব্বইয়ের দশক থেকে মঞ্চে কাজ করছেন। এই সময়ের তরুণ দর্শকেরা তার নাম জানবেন না, তাকে চিনবেন না, এটাই স্বাভাবিক। তবে টিভি দর্শকেরা তাকে মনে রাখলেও রাখতে পারেন। সালাউদ্দিন লাভলুর গহরগাছি নাটকে দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন। টেলিভিশনে তার সেরা অভিনয় বললেও ভুল হবে না। 

তবে নাজনীন চুমকির সেরাটা দেখেছে মঞ্চ। চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় এসে দেশ নাটকে যোগ দিয়েছিলেন, ১৯৯৬ সালের কথা সেটা। ‘লোহা’, ‘বিরষাকাব্য’, ‘নিত্যপুরাণ’সহ আরো কিছু নাটকে চুমকি অভিনয় করেছেন দেশ নাটকের হয়ে। অনন্ত হীরার পরিচালনায় টিভি নাটকে অভিষেক হয়েছিল ১৯৯৯ সালে, কিন্তু 'যেতে যেতে পথে' নামের সেই নাটকটার পর টিভি নাটকে অভিনয়ের ব্যাপারে একটা অনীহা জন্ম নিয়েছিল তার মধ্যে। মঞ্চে যতটা স্বাধীনতা নিয়ে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে তিনি অভিনয় করতে পারেন, টিভি নাটকে তেমনটা সম্ভব নয় বলেই মনে হয়েছিল চুমকির কাছে। একারণেই মঞ্চে নিয়মিত হলেও, টিভিতে তার কাজের সংখ্যা হাতেগোনা। এর মধ্যেও উল্লেখ করতে হবে অনন্ত হীরার বিষকাঁটা এবং একুশে টিভির ধারাবাহিক নাটক বন্ধনের কথা। 

নাজনীন চুমকি। ছবি কৃতজ্ঞতা- প্রথম আলো

পারিবারিক কারণে অবশ্য মঞ্চ থেকেও বছর সাতেকের একটা বিরতি নিয়েছিলেন। দেশ নাটকের পর ঢাকা থিয়েটারের হয়েও মঞ্চ মাতিয়েছেন, 'সীতার অগ্নিপরীক্ষা' যারা মঞ্চে বসে দেখেছেন, তারাই বলতে পারবেন নাজনীন চুমকি কোন মাপের অভিনেত্রী। অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক লিখেছেন, পরিচালনাও করেছেন। তার পরিচালিত নাটক প্রদর্শিত হয়েছে টিভিতেও। ২০০৬ সালে 'ঘানি' সিনেমায় ময়না চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য জিতেছেন সেরা অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। দাহকাল নামের একটা সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন, অজানা কারণে থেমে আছে সেটার শুটিং। 

নাটক-সিনেমার অফার নিয়মিতই পেয়েছেন, এখনও পান। কিন্তু অভিনয়ের সুযোগটা না থাকায় অজস্র প্রস্তাবকে 'না' বলেছেন চুমকি। বেশিরভাগ নির্মাতাই তার কাছে আসেন বড় বোন, ভাবী বা বান্ধবীর মতো চরিত্রের প্রস্তাব নিয়ে, যারা ছবিতে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়। অভিনয়েরও তেমন সুযোগ নেই। আর তাই তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না চুমকির। অভিনয়ের স্বাদ তো তিনি মঞ্চে পাচ্ছেনই, টিভি বা সিনেমায় করতে হলে দারুণ কিছুই করবেন, একঘেয়ে বিরক্তিকর চরিত্র কেন- এই হচ্ছে তার যুক্তি। 

গত কয়েক বছরে নাজনীন হাসান চুমকির কয়েকটি সাক্ষাৎকার আমি পড়েছি। এই ভদ্রমহিলা চমৎকার কথা বলেন, তার সাক্ষাৎকার নেয়াটা যে কোন বিনোদন সাংবাদিকের জন্য দারুণ একটা অভিজ্ঞতা হবার কথা। মঞ্চ, অভিনয় আর নিজের কাজের গণ্ডি ছাড়িয়ে তিনি কথা বলেন শিল্পীর স্বাধীনতা নিয়ে, এদেশে শিল্পের মৃতপ্রায় অবস্থা নিয়ে, তার কণ্ঠে উঠে আসে উপমহাদেশে মি-টু মুভমেন্ট সফল না হবার কারণ, কথা বলতে বলতেই তিনি ঢুকে পড়েন টিভি নাটকের একঘেয়ে কনসেপ্ট আর টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর টিআরপি ধরে রাখার মিশনের গভীরে।

মরীচিকা ওয়েব সিরিজের ট্রেলারে নাজনীন চুমকি

শিল্পীদের পারিশ্রমিক নিয়ে যেমন তিনি মুখ খোলেন, তেমনই তার কণ্ঠে উঠে আসে সিনিয়র-জুনিয়র শিল্পীদের সম্পর্কের অস্বাভাবিকতা থেকে শুরু করে বডি শেমিংয়ের মতো টপিকও। তিনি বলে চলেন নির্মাতা হিসেবে তার স্বপ্নের কথা, তিনি কি করতে চান, একটা চ্যানেলের দায়িত্ব পেলে কিভাবে বদলে দিতে চান সবকিছু। নাটক আর সিনেমার এই ঘুণে ধরা সিস্টেমটাকে বদলে দেয়ার অভিপ্রায়ের সঙ্গে সঙ্গে তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে বাস্তবতাও; তিনি জানেন পরিবর্তনটা কত কঠিন। তবু চুমকি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। 

পাদপ্রদীপের আলোর অনেকটা বাইরে থাকা গুণী এই অভিনেত্রী মঞ্চের বাইরেও আরেকটু নিয়মিত হবেন অভিনয় এবং পরিচালনায়, মন থেকে চাইবো এটা। হোক সেটা টিভি নাটকে, ওয়েব ফিল্মে কিংবা সিরিজে। দিল্লি ক্রাইম, মম বা ইংলিশ ভিংলিশের মতো কন্টেন্ট আমাদের দেশে হয় না। যদি হতো, সেসব কন্টেন্টে প্রথম পছন্দ হতে পারতেন চুমকি। তিন দশকের অভিনয়ের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ একজন অভিনেত্রী এভাবে অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছেন ইন্ডাস্ট্রিতে, সেটা আফসোস ছাড়া আর কোনকিছুর তো কারণ হতে পারে না।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা