আসলে কি গল্প ছাড়া সিনেমা হয়? হ্যাঁ, হয়, নীল মুকুটই হয়েছে। ডকু-ড্রামা ঘরানার এই সিনেমাটি অনেকের হালকা স্লো ও বোরিং মনে হলেও আদতে জীবনের গভীর মমতাবোধ এই সিনেমায় ফুটে ওঠে। এই সিনেমা আপনার পছন্দ হোক কিংবা না হোক, বাস্তবতার রেশ আপনাকে ছুঁয়ে যাবে সিনেমা শেষ হবার পরও...

এই ফিল্মটি নিয়ে যারা খানিকটা শুনেছেন তারা কিছু না শুনলেও এটা হয়তো কানে এসেছে যে, নীল মুকুট সিনেমায় আদতে কোন গল্প নেই। কিন্তু আসলে কি গল্প ছাড়া সিনেমা হয়? চিত্রকলায় অনেক আগে থেকেই অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আঁকিবুকি দেখতে পাই। যার আদতে কোন মানে নেই। ধীরে ধীরে সাহিত্যে অনেক লেখকই তাদের লেখায় অ্যাবস্ট্রাক্ট এনেছেন। লেখায় উঠে এসেছে জীবনের বিমূর্ত সব ধারণা। এখন একটি সিনেমা কি বিমূর্ত ধারণাকে সামনে এনে তৈরি করা সম্ভব?

ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে মুক্তি পেয়েছে চলচ্চিত্রকার কামার আহমাদ সাইমনের নতুন ছবি ‘নীল মুকুট’। এই সিনেমায় উঠে এসেছে আমাদের দেখা জীবনের বিমূর্ত দৃশ্য। ডকুমেন্টারি ড্রামা ঘরানায় তৈরি এই সিনেমাটি অনেকের হালকা স্লো ও বোরিং মনে হলেও আদতে জীবনের গভীর মমতাবোধ এই সিনেমায় ফুটে উঠে।

সিনেমার শুরুই হয় একটি গ্রামের সাধারণ বাড়ির উঠোনে বৃষ্টি দেখানোর মাধ্যমে। এবং আমরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পারি, একজন নারী তার ঘর থেকে বিদায় নিতে চলেছেন। ঘরের ভেতর আলো-আধারির মাত্রা প্রচন্ড কম হওয়ায় অনুমান হয়, বিদায় দৃশ্যটি সম্ভবত পরিবারের মধ্যকার কেউ তার মুঠোফোন দিয়ে ধারণ করছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি, বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন আবহে আসলে আমাদের দেখার দৃষ্টিও খানিকটা পরিবর্তন হয়। সিনেমার পর্দায় কামার আহমাদ সাইমন মূলত মানুষের দেখার দৃষ্টিকেই আনতে চেয়েছেন।

আবারও বলি, যেহেতু ডকু-ড্রামা ঘরানার ফিল্ম, তাই সবার কাছে উপভোগ্য মনে না-ও হতে পারে। কিন্তু একশো মিনিট দৈর্ঘ্যের এই সিনেমাটি আপনাকে বাস্তব দৃশ্যের একদম কাছে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশ পুলিশের একটি দল মিশনে হাইতি নামক স্থানে যাবার আগের প্রস্তুতি, অনুশীলন, সেখানে থেমে থেমে যাওয়া ডিউটি এসবই মুলত সিনেমাটির মুল উপজীব্য। কিন্তু খুব খেয়াল করলে আমরা দেখি, সিনেমার নান্দনিকতা প্রকাশের জন্য কোনরকম সিনেমাটিক শট ব্যবহার করা হয়নি। বরং একজন মানুষের দৃষ্টির মতো করে ক্যামেরার নড়াচড়া করা হয়েছে। এমনকি বাস্তবতার সঙ্গে মিল রাখতে কোথাও কোন আবহ সঙ্গীতের ব্যবহার করা হয়নি।

এই সিনেমাটির আরও কিছু কারিগরি ব্যপারে বলার আগে ভেতরে ঢোকা প্রয়োজন। যেমন এই সিনেমার ন্যারাশনে কোন ধরণের ‘মূল পরিচয়কে আলাদা করে দেখানো’ বিষয়ে প্রবনতা ছিলো না। একদম প্রথম দিকে এক দু’জনকে 'মূল চরিত্র' হিসেবে মনে হলেও ধীরে ধীরে আপনি অনেক চরিত্রের মাঝে এদেরকে হারিয়ে ফেলবেন। এমনকি আমার মত সাধারণ দর্শক হলে হয়তো ভুলেই যাবেন যে, কোন চরিত্রটিকে দেখে আপনি সিনেমাটি শুরু করেছিলেন। শুরুই শুধু নয়; বরং সিনেমা শেষেও কোন একটি বিশেষ চরিত্রের উপাখ্যানকে ঘোষণা করে শেষ করে দেয়া হয়নি। এটি অনেক সিনেমা সমালোচকদের অস্বস্তির কারণ হয় যে, খানিকটা চরিত্রদের ঘোষনা করে চিনিয়ে দেয়া। এই সিনেমায় খুব সচেতন ভাবে নির্মাতা এটি এড়িয়ে গেছেন। ব্যক্তি ও সমষ্টির পারস্পরিকতায়, এমনকি উচ্চারণে এবং অভিনয়হীন শরীরী ভাষায়- অতীত ও ভবিষ্যতসহ বর্তমানকে চোখের সামনে যথাসম্ভব প্রত্যক্ষ করাই ছিল ক্যামেরার লক্ষ্য।

নির্মাতার ভাবনাটি খানিকটা সনাতন হলেও বেশ নান্দনিক। তিনি ভাবেন যে, তিনি যদি কোন 'গল্প' বলতে চান, তবে তা বিভিন্নভাবেই বলা সম্ভব। লিখিত বা অন্য যে কোন মাধ্যমে। কিন্তু যথাসম্ভব বাস্তব সময়কে ধারণ করার যে ন্যারাটিভ স্টাইল, হয়তোবা তা কোন গল্পে আটকে থাকতে পারে না। তবে স্বাভাবিক ভাবেই এতে আনন্দ-বেদনার মুহুর্ত থাকবে। কিন্তু তাও হবে সিনেমাটিক আবহ ছাড়া একদমই বাস্তব। 

হাইতি অঞ্চলে মিশনে গিয়ে পুলিশের একজন নারী কর্মী যখন ভিডিও কলে তার সন্তানের সঙ্গে কথা বলেন, সন্তান তাকে স্বভাবমত বিড়ালের ডাক শোনায়, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি দিয়ে মায়ের সঙ্গে শারীরিয় যোগাযোগ করেন। কিন্তু মা ফোন রাখার পর খানিক সময় পর চোখ মোছেন। এই চোখের জল আমাদেরকে বেশ খানিকটা বেদনা দেয়। কিন্তু আমরা খানিক পরে বুঝতে পারি, বাচ্চা ছেলেটির যখন ক্ষুধা লাগতো সে তার বয়সী হেয়ালি করে বিড়ালের মত ডেকে জানান দিতো, তার ক্ষুধা লেগেছে। দেশ থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে মা ছেলের মুখে বিড়ালের ডাক শুনে উপলব্ধি করেন তার সন্তানের ক্ষুধার কথা। কিন্তু এখানে বসে তিনি তার সন্তানকে খাওয়াতে পারেন না। এইটুকু দৃশ্য বাস্তবতার ফ্রেমে উঠিয়ে আনতে নির্মাতা যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তাতে আপনি অবাক না হয়ে পারবেন না।

নীল মুকুট সিনেমার কোন গল্প নেই, কথাটা আংশিক সত্যি। এটি আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালগুলোতে যাওয়ার অনেক আগেই (খানিকটা করোনার কল্যানে) ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়ে গেলো। এই সিনেমা আপনার পছন্দ হোক কিংবা না হোক, বাস্তবতার রেশ আপনাকে ছুঁয়ে যাবে সিনেমা শেষ হবার পরও।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা