'নেটওয়ার্কের বাইরে'র কুশীলবেরা মিলে গুলশানের এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে অ্যাক্সিডেন্ট করেন। এই নিষ্পাপ, নির্দোষ সংবাদটি সামাজিক মাধ্যমে আসার পরপরেই বিস্ময়ের সাথে খেয়াল করি, পঙ্গপালের মতন তেড়ে আসছে লকলকে জিহ্বার ভয়ঙ্কর প্রাণীরা। অদ্ভুত সব মন্তব্য তাদের। রাত তিনটায় গুলশান কেন? মাল খেয়ে গাড়ি চালিয়েছে, এদের মরা উচিত...ইত্যাদি ইত্যাদি!

ভার্চুয়াল পৃথিবীর ক্রমশ রূপান্তরে আমরা সবাই এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে মানুষের চিন্তা-আচরণ-কথাবার্তায় বিশ্বাস-সম্মান-সহানুভূতির লেশমাত্রও নেই। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, সব মানুষ কখনোই একই মতাদর্শের, একই আদর্শের অনুসারী হয় না। বৈচিত্র‍্য থাকে। এই বৈচিত্র্য থাকাটাও দরকার। কিন্তু সে বৈচিত্র্য আজকাল এতটাই কদর্য, হিংস্র এবং বর্বর...ভাবতে অবাক লাগে, আমরা কী আসলেই মানুষ আছি? নাকি, ক্রমশ রূপান্তরিত হয়েছি বিশেষ কোনো ক্লেদাক্ত পরজীবীতে? পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তো বাদই দিলাম, পারস্পরিক অশ্রদ্ধাবোধও আজকাল এতটাই নোংরা প্রতিবিম্বে প্রকাশিত, সেসব নিয়ে ভাবতে গেলে নৈরাশ্যে তলানো ছাড়া আর কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। 

পঞ্চাশ-একশো টাকার ইন্টারনেট এবং হাজার পাঁচেক টাকার মোবাইল কিনলেই এখন ধরাকে সরাজ্ঞান করা যায়। যাদের সাথে বাস্তব জীবনে কোনোদিন দেখা হবে না, যাদের সাথে দেখা হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ পেলেও হয়তো বর্তে যেতো কেউ কেউ, এই ইন্টারনেট-স্মার্টফোনের মিলিত বদান্যতায় ঠিক সেসব মানুষকেই তার পরিবার-ধর্ম-সমাজ উঠিয়ে নোংরা আক্রমণ করা যায়। তাদের দিকে অশ্লীল ইঙ্গিত করে নিজেদের নোংরা যৌনাবেগকে আরেকটু উসকে দেয়া যায়। বাস্তব জীবনে যে প্রাণী পরপর দুই লাইনও গুছিয়ে বলার ক্ষমতা রাখে না, সে প্রাণীই অনলাইনে রূপান্তরিত হন প্রচণ্ড পরাক্রমশালী সরীসৃপে। যে সরীসৃপ তার লকলকে জিহ্বা দিয়ে চাটতে চায় সব। বাস্তব জীবনের নিস্ফল আক্রোশের ফলাফলে যে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে চায় কাছে-দূরের সবাইকে! 

আজকাল এই অসুস্থ, বিকৃত প্রাণীদের পদচারণায় বিরাট ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে সামাজিক মাধ্যমের একেকটি অঞ্চল। এখন শিল্পের সুকুমারবৃত্তি নিয়ে কথা বলা যায় না, শিল্পীর মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা করা যায় না, নিদেনপক্ষে যাপিত দুঃখকষ্টও বলা যায় না। কোনো কিছু দিয়েই কাউকে সন্তুষ্ট করা যায় না। সোশ্যাল মিডিয়াতে কেউ যদি কিছু বলেন-লেখেন-প্রকাশ করেন, সঙ্গেসঙ্গে সেখানে তেড়েফুঁড়ে চলে আসে সেই প্রাণীরা, যে প্রাণীদের বিকৃত অবয়ব ক্রমশই বিবমিষা জাগায়, 'মানুষ' হিসেবে সবাই আসলে একই প্রজাতির কী না, তা নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক হয়। মোর‍্যাল পুলিশিং থেকে শুরু করে ধর্ম-দর্শন-সামাজিকতার নানাবিধ ফতোয়া নিয়ে আসেন এই আধুনিক ধর্মপূত্র যুধিষ্ঠিরেরা! যেন স্রষ্টা এ কাজের দায়ভার তাদেরকে অর্পণ করে শান্তিতে সুখনিদ্রা দিয়েছেন! 

চঞ্চল চৌধুরী হিন্দু কেন, তা নিয়ে তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয়। আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণের খবরের যে কমেন্ট সেকশন, সেখানে কেউ লিখে দেয়- সারাজীবন গান গেয়েছেন, হারাম কাজ করেছেন, তিনি যাবেন দোজখে! পরীমনির দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে ভার্চুয়াল পৃথিবীতে রীতিমতো হরিলুট করে ধর্ষণ করা হয়। একবার না, বহুবার। অভিনেতা সিয়াম, নিলয়, ক্রিকেটার সাকিব, তাসকিন এর স্ত্রী নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বলা হয়। ফেনিয়ে ওঠা যৌনাবেগ নিয়ে রগরগে মন্তব্য করা হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো অভিনেত্রী কোনো ছবি দিলে পড়িমড়ি করে সেখানে ধর্ম-রাজনীতি-যৌননীতির নানাবিধ ছবক নিয়ে ছুটে আসেন বিজ্ঞ (!) সব মহল! 

এই অনাচার-মিথ্যাচার- বিদ্বেষানল বেশ ক'বছর ধরে রমরমিয়ে চলছে। ক্রমান্বয়ে আমাদের এগুলো গা সওয়াও হয়ে গিয়েছে। তবুও মাঝেমধ্যে চমকে উঠি, সভ্যতা-ভব্যতার চৌকাঠ থেকে এসব প্রাণীর আচরণ এত দূরে সরে যেতে দেখে বিস্ময়ে আঁতকে উঠি। যেরকমটা হলো গতকাল। স্ট্রিমিং সাইট 'চরকি'তে আসা ওয়েব ফিল্ম 'নেটওয়ার্কের বাইরে'র কুশীলবেরা মিলে গিয়েছিলেন গুলশানের এক অনুষ্ঠানে। সেখান থেকে ফেরার পথে তারা অ্যাক্সিডেন্ট করেন। সবাইকেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কারো কারো অবস্থা এখনও সংকটজনক। এই নিষ্পাপ, নির্দোষ সংবাদটি সামাজিক মাধ্যমে আসার পরপরেই বিস্ময়ের সাথে খেয়াল করি, পঙ্গপালের মতন তেড়ে আসছে সেই লকলকে জিহ্বার ভয়ঙ্কর প্রাণীরা। অদ্ভুত সব মন্তব্য তাদের। রাত তিনটায় গুলশান কেন? মাল খেয়ে গাড়ি চালিয়েছে, এদের মরা উচিত, এগুলো মরলে জাহান্নামে যাবে, মিডিয়ার একটাও মানুষ না...ইত্যাদি ইত্যাদি। 

দূর্ঘটনার পরে বিধ্বস্ত সেই গাড়ি! 

যেসব প্রাণীরা এই মানুষদের নিয়ে এমন অসুস্থ মন্তব্য করেছে, সেসব মানুষদের কেউই কিন্তু এইসব প্রাণীর কাছে টাকার জন্যে যায় নি, সাহায্যের জন্যে যায় নি, জোরজবরদস্তি করেও যায় নি। তবুও নিজের মেগাবাইট, নিজের মোবাইল নিয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে যেচে এসে হামলে পড়ে এই প্রাণীকুল। নিজেদের নোংরা, পূতিগন্ধময় শরীরকে উলঙ্গ করে ভরা মজলিসে, সবার সামনে। বুঝিয়ে দেয়, চেহারা মানুষসুলভ হলেই তারা আসলে মোটেও মানুষ না। মানুষের ছিঁটেফোঁটাও ধারণ করেন না তারা।

দূর্ঘটনাগ্রস্থ এইঅভিনয়শিল্পীরা এখনও ঝুঁকির মধ্যে আছেন! 

এবং বিস্ময়ের বিষয়, এ ধরণের কাজ যারা করেন, তারা সবাই যে সমাজের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ, তা মোটেও না। এমন সব প্রাণীকেও এসব জায়গায় দেখি, যারা সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। যাদের সমাজে গ্রহনযোগ্যতা আছে, যারা সমাজের বিজ্ঞ তালেবর। সেসব প্রাণীই যখন এরকম বর্বর বিষদাঁত বের করে কামড়াতে চান আপামর মানুষকে, হিসেব মেলাতে গেলে গুলিয়ে যেতে হয় বারবার। এটা কী শিক্ষার অভাব? নাকি, সুশিক্ষার অভাব? নাকি, মানসিক দৈন্যতা? মানসিক প্রতিবন্ধীত্ব? জানা নেই।

কে মারা গেলে কোথায় যাবে, কে হিন্দু না কে মুসলিম, কে কী পোশাক পড়বে, কে কার সাথে কোথায় ঘুরবে, কে কার সাথে কী খাবে, কে কখন বাইরে থাকবে, কে কখন ঘরে যাবে, কে কোন কাজটা করবে, কে কার সাথে সম্পর্কে জড়াবে... এসব বিষয় যার যার ব্যক্তিগত। একটা মানুষ পাবলিকলি এসব শেয়ার করছেন বলেই  বিষয়গুলো পাবলিক প্রোপার্টি হয়ে যায় না। এখানে এসে গনহারে অভ্যন্তরীণ বর্জ্য নিষ্কাশনের মোচ্ছব দেখালে প্রকৃতপক্ষে স্ব স্ব দীনতা,অসারতা এবং অক্ষম ক্লান্তিকর বেঁচে থাকাটাই শুধু প্রকাশিত হয়। এসব অসুখী প্রাণীর জন্যে তাই বিস্তর করুণা হয়, ঘৃণা হয়, দুঃখবোধও হয়। কিন্তু এসব প্রাণীকে আর মানুষ বলে মনে হয় না। অমানুষও মনে হয় না। এগুলো মনে হওয়ার জন্যেও খানিকটা যোগ্যতা লাগে। 

এদেরকে স্রেফ পিশাচ মনে হয়। এবং এটাই তাদের একমাত্র পরিচয়...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা