'নেটওয়ার্কের বাইরে'র গঠনশৈলী, গুনগত মান, উৎকর্ষ নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা হচ্ছে, হবে। তবে এই নির্মাণ বেঞ্চমার্ক হয়ে থাকবে অন্য এক বিশেষ দিকে। যদি ভালো কন্টেন্ট হয়, তা যে জনরারই হোক না কেন, বাংলাদেশের দর্শক যে তা সাদরে গ্রহণ করতে আগ্রহী, সেটার সপক্ষে এই নির্মাণ খুব দারুণ এক উদাহরণ হয়ে থাকবে...

সম্প্রতি তুমুল আলোচিত তামিল সিনেমা 'থিট্টাম ইরান্ডু' দেখলাম। মজার বিষয়, এই সিনেমা নিয়ে যতটুকু যা কথাবার্তা, তার অধিকাংশই সিনেমার শেষদিকের বড়সড় টুইস্টটির জন্যে। 'থ্রিলার' ঘরানার এই সিনেমার পরতে পরতে অজস্র চুনোপুঁটি টুইস্ট তো ছিলোই। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে শেষের চমকই করেছে বিস্তর বাজিমাত। কিন্তু এই নির্মাণ দেখে আক্ষেপ বেড়েছে আমার। যে সামাজিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে এই সিনেমা নির্মিত হয়েছে (সঙ্গত কারণেই সে সমস্যার কথা এখানে বলছি না, স্পয়লার হয়ে যাবে), সেটাকে মূলজায়গায় রেখে যদি সিনেমাটি 'ড্রামা' জনরায় রাখা হতো, তাহলেই হয়তো সর্বাঙ্গসুন্দর হতো। শুধু শুধু 'থ্রিলার' জনরায় এ গল্পকে টেনেহিঁচড়ে এনে, জবরদস্তি করে আটকে, দমবন্ধ না করে দিলেই হয়তো বেশি প্রাসঙ্গিক হতো। 

স্ট্রিমিং সাইট 'জিফাইভ' এ আসা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী'র 'লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন' নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। যে থিম ভেবে এই ওয়েব সিরিজের সূত্রপাত এবং শুরুর দিকে যেভাবে এগোচ্ছিলো এই কন্টেন্ট, আশাবাদী হচ্ছিলাম। এই ওয়েব সিরিজ 'ওয়েব কন্টেন্ট মানেই থ্রিলার' নামক ন্যারেটিভের মুখে দারুণ এক চপেটাঘাত হবে, এটা ভেবে খানিকটা তৃপ্তিও পাচ্ছিলাম। কিন্তু, আচমকা বিপত্তি!  মাঝপথে গিয়ে নির্মাতা নিজেই থ্রিলারের মোড়কে আবৃত করে দিলেন গল্পকে। বলাবাহুল্য, প্রাথমিক উচ্ছ্বাসের জায়গা বেশ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেলো। বুঝলাম, খুব দারুণ এক গল্পের মৃত্যু ঘটেছে। 

এর পেছনে কারণ কী? নির্মাতারা কেন 'থ্রিলার' ছাড়া অন্য কোনো কাজে ঠিক ভরসা পান না? এর পেছনে একটা কারণ হতে পারে, মানুষ আর যা কিছু পছন্দ করুক আর না করুক, 'থ্রিলার' জনরার বই, সিনেমা, নাটক বেশ পছন্দ করে। সেগুলো দেখতে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করে। উদাহরণ হিসেবে বাংলা স্ট্রিমিং সাইট 'হৈচৈ' এর সাম্প্রতিক কন্টেন্টগুলো যদি দেখি, সেখানে আসা 'তাকদীর', 'মহানগর' 'মার্ডার ইন দ্য হিলস', 'রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি' নিয়ে যে পরিমাণ কথাবার্তা হয়, অন্যান্য কন্টেন্ট নিয়ে তার সিকিভাগও হয় না। এবং এই আলোচিত কন্টেন্টগুলোর প্রতিটিই থ্রিলার। অর্থাৎ এটি প্রমাণিত সত্য, জনরা 'থ্রিলার' হলে মানুষ সে কাজ দেখবেই। কথাবার্তা হবেই। পাবলিসিটি তো বলাবাহুল্য। সে নেগেটিভই হোক আর পজিটিভ। নির্মাতারা তাই আজকাল ঝুঁকির পথে হাঁটেন না৷ মানবিক গল্পই হোক বা কমেডি অথবা সোশ্যাল ড্রামা ...সবকিছুই আজকাল আচমকা ঢুকে পড়ে 'থ্রিলার' নামক টানেলে। উইন-উইন সিচুয়েশন! 

তবে, এই 'সেফমোডে' কাজ করার সংস্কৃতি কিছু ক্ষেত্রে বিপত্তিও ডেকে আনে। সাম্প্রতিক সময়ের অনেক নির্মাণই এরকম দেখেছি, সেগুলোতে অযাচিত থ্রিলার-টুইস্ট-সাসপেন্স যুক্ত করায়, শেষমুহুর্তে গিয়ে পুরো কাজটিকেই উপেক্ষা করার উপক্রম হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে দুয়েকটির কথা একটু আগেই বললাম। তাছাড়া, নির্দিষ্ট এক ঘরানার নিয়মিত সৃষ্টিকর্ম কাহাতকই বা আর সহ্য করা যায়। ঠিক সে কারণেই এখন মুখিয়ে থাকি, 'থ্রিলার' জনরার বাইরের কোনো কাজের জন্যে। এমন না, থ্রিলার-সাসপেন্স খারাপ। কিন্তু, নিয়মিত বিরিয়ানি দিলেও সেটাও তো একসময়ে এসে একপেশে বিরক্তিকর হয়ে যায়। এও অনেকটা সেরকম। 

আসি ভিন্ন প্রসঙ্গে। 'থ্রিলার' জনরার বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বেশ কিছু ভালো সিনেমা দেখলাম। 'দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কিচেন' , 'বিরিয়ানি', 'ম্যান্ডেলা', 'মালিক', 'মিমি' সিনেমার কথা বলা যেতে পারে। প্রত্যেকটা সিনেমাই সামাজিক নানা সমস্যার দারুণ সব পোর্ট্রেয়াল করেছে। এবং 'থ্রিলার' নামক জনরা'কে খুব সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছে। দর্শকেরা এই কাজগুলোর গুনমুগ্ধ প্রশংসাও করেছেন। অর্থাৎ, এও পরিষ্কার, নির্মাণ যদি ভালো হয়, মূলভাব যদি সমসাময়িক হয়, তাহলে সেখানে অযাচিত 'থ্রিলার' ঢুকিয়ে সামাজিক বার্তা দেবার দরকার নেই৷ দর্শকেরা নিজ তাগিদেই দারুণ কাজ খুঁজেপেতে বের করবে, প্রশংসায় ভাসাবে।

এই উদাহরণের সপক্ষে সাক্ষ্য দেয়-'চরকি'তে আসা মিজানুর রহমান আরিয়ানের ওয়েব ফিল্ম 'নেটওয়ার্কের বাইরে।' এই লেখার পূর্ববর্তী অংশে যেসব নির্মাণের কথা তুললাম, গুনগত মান বিচারে সেগুলোর তুলনায় 'নেটওয়ার্কের বাইরে' হয়তো বেশ খানিকটাই পিছিয়ে থাকবে। তবুও এই নির্মাণের নাম নেয়ার কারণ একটাই, নির্মাণটি সাম্প্রতিক৷ তুমুল জনপ্রিয়ও। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটা থ্রিলার জনরার বাইরের 'ফিল গুড' ক্যাটাগরির একটি সফল নির্মাণ। 

অনেকদিন পরে ব্যতিক্রমী এক স্বাদ দিলো 'নেটওয়ার্কের বাইরে' 

বাংলাদেশে 'ফিল গুড' কন্টেন্ট এমনিতেও কম হয়। বিদেশের 'দ্য টার্মিনাল', 'হ্যাপি ডেজ', 'দিল চাহতা হ্যায়', 'জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা', 'কারওয়ান', 'পিকু'র মতন কাজ আমাদের কম। এই বিশেষ জনরায় আমাদের যে কয়টি নির্মাণ, তা হাতের আঙ্গুল গুনে বলে দেয়া যাবে। কাজ কম হওয়ার কারণ, এই 'ফিল গুড' জনরায় খানিকটা ঝুঁকি আছে। কীরকম ঝুঁকি? এই জনরার নির্মাণে একটু পরিমিতিবোধের ঘাটতি হলেই পুরো নির্মাণটিই খেলো হয়ে যেতে পারে। প্রাসঙ্গিকতা হারাতে পারে পুরোপুরি। অনেকটা অঙ্কের মতন। ফলাফল না মিললে পুরো অঙ্কই বাতিল। তাই এই ঝুঁকি অনেক নির্মাতাই নেন না। 'ফিল গুড' মুভির ক্যাটাগরিতেও তাই আমাদের নতুন নির্মাণ যুক্ত করা সম্ভব হয় না৷

সে প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, 'নেটওয়ার্কের বাইরে'র মতন ঝুঁকিপূর্ণ সেক্টর নিয়ে কাজ করার চিন্তাভাবনা করাটাই যথেষ্ট সাহসের ব্যাপারের। সে সাহস তো তারা দেখিয়েছেনই এবং নির্মাণের প্রতিটি বিভাগে বেশ পরিচ্ছন্ন ও মেধাবী কাজ দেখিয়ে যে মিশেল তৈরী হয়েছে এখানে, সে মিশেল গুনগত মানের আদর্শেও উতরে গিয়েছে। আনন্দ, বিষাদ, রোমাঞ্চের পাশাপাশি এখানে সরবে উপস্থিত হয়েছে প্রাসঙ্গিক সামাজিক বার্তাও। 'থ্রিলার' এর বাইরে গিয়ে এরকম ভাবনাচিন্তা, সে ভাবনাচিন্তার এমন দুর্দান্ত এক্সিকিউশনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এখন তারা যে ভূয়সী প্রশংসাবাণে বিদ্ধ হচ্ছেন, সেটি একপ্রকার ভবিতব্যই ছিলো।

'নেটওয়ার্কের বাইরে' থ্রিলার ঘরানার বাইরে দারুণ এক নির্মাণ! 

'নেটওয়ার্কের বাইরে'র গঠনশৈলী, গুনগত মান, উৎকর্ষ নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা হচ্ছে, হবে। তবে এই নির্মাণ বেঞ্চমার্ক হয়ে থাকবে অন্য এক বিশেষ দিকে। যদি ভালো কন্টেন্ট হয়, তা যে জনরারই হোক না কেন, বাংলাদেশের দর্শক যে তা সাদরে গ্রহণ করতে আগ্রহী, সেটার সপক্ষে এই নির্মাণ খুব দারুণ এক উদাহরণ হয়ে থাকবে। সে সাথে আরেকটি বিষয়ও লক্ষ্যণীয়, সামাজিক নানা বিষয়ের বার্তা নিয়ে যদি প্রাসঙ্গিক কন্টেন্ট বানানো যায়, তাহলে শুধু শুধু 'থ্রিলার' এর মোড়কে তা আটকানোর দরকার নেই। চাইলে খুব সোজাসাপটা রেখেই দারুণ দারুণ সব গল্প বলা সম্ভব। সে গল্পকে জনপ্রিয় করাও সম্ভব।

'নেটওয়ার্কের বাইরে' প্রতিষ্ঠা করে যায় সেই ন্যারেটিভও...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা