চরিত্রের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে একই গল্প ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখানোর ব্যাপারটা মাস্টারস্ট্রোক ছিল। অনেকটা অ্যামাজন প্রাইমের পাতাললোকের কথা মনে করিয়ে দেয় এই ন্যারেটিভ স্টাইল, যেখানে চরিত্র ধরে গল্প আগায়। শুধু এখানেই থেমে থাকেননি পরিচালক রিহান, তিনি দুটো টাইমলাইন এনে ক্রমাগত সুইচ করেছেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। এতে করে ন্যারেটিভ প্রাণ পেয়েছে, নন-লিনিয়ার এই ট্রিটমেন্ট নতুন বয়ান তৈরি করেছে...

নিখোঁজের ট্রেলার দেখে কিংবা শুরুর দু-এক এপিসোড দেখেও ঠিক আঁচ করা যায় না কোন এক গোলকধাঁধায় আটকাতে যাচ্ছে দর্শক। সাদামাটা একটা গল্প হুট করেই জটিল লাগতে শুরু করে। নির্দেশক কেবল ভেতরে টানেন দর্শকদের, আঁচ দিয়ে যান যে- হ্যাঁ দর্শক, আপনি যা ভাবছেন ঠিক। কিন্তু প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনই জানাতে পারবো না, একটু অপেক্ষা করুন। আমরা আমাদের প্রশ্নগুলো নিয়ে নির্দেশকের দেখানো পথে চলতে থাকি। একই ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের চোখে ভাসে। আমরা টের পাই ঐ চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, ঐ চরিত্রের স্ট্রাগল আলাদা করে। তারপর শেষমেশ গিয়ে আবিষ্কার করি এক অমোঘ সত্যের, যেটির আশঙ্কা শুরু থেকেই আমাদের ছিল। কিন্তু তখন প্রশ্নের উত্তর জানলে যে ভাবার্থ নেয়া যেত, পরে সে উত্তর জানায় বদলে গেছে তার সংজ্ঞা অনেকটাই। এই যে অপেক্ষাটুকু, এই যে একসাথে পথচলা চরিত্রদের সাথে এগুলোর সম্মেলনই নিখোঁজ।

নিখোঁজের খুঁতগুলো আগে ধরে নেই। তাহলে পরে গিয়ে আলোচনায় সুবিধা হবে। নিখোঁজের খুঁত হচ্ছে ভালো করতে করতে সেটার ধারাবাহিকতা না ধরে রাখতে পারা। কোন চরিত্র আলাদাভাবে গ্রো করছে, করছে তারপর হুট করেই তার গ্রোথ থেমে যাওয়া, চেহারা বদল হওয়া-সাথে বদলে যাওয়া পুরো সত্তা। মেলানো যায় না যেন আগের চরিত্রের সাথে এই চরিত্রকে। স্পর্শিয়ার সাফিয়া হিসেবে স্ট্রাগল মিমির সাফিয়ার সাথে মেলাতে কষ্ট হয়। নাছোড়বান্দা সাফিয়া কীভাবে ২০ বছরের ব্যবধানে এমন নির্লিপ্ত সাফিয়ায় পরিণত হল সেটাও তেমন স্ট্যাবলিশ হল না যেন। দুর্দান্তভাবে গ্রো করা চরিত্র ড্রাগ এডিক্ট সাইফ কীভাবে এমন সফল ল'ইয়ার হয়ে উঠলো একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেটারও কোন হদিস পাওয়া গেল না। লাইটিং, সাউন্ডে অযত্নের ছাপ চোখে পড়েছে। কন্টিনিউয়িটি নেই, ডাবিং কানে বেজেছে কয়েক জায়গায়। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ হয়তো এই সিরিজ নিয়ে এটাই আসবে যে স্ক্রিনপ্লে বেশ শ্লথগতির। কিন্তু এটাই আমার কাছে মূল ভালো লাগার জায়গা।

আমি ক্লান্ত টুইস্ট এন্ড টার্নস দেখতে দেখতে, থ্রিলার মানেই যেন দৌড়াতে হবে। গল্পের গরু গাছে চড়ে যাক, সমস্যা নেই। আনএক্সপেক্টেড কিছু দেখাতে হবে দর্শকদের। আমার কাছে সবসময় শান্ত থ্রিলার পছন্দ। যে থ্রিলারে গল্পের প্রতিটা পরত সময় নিয়ে খুলবে, যেমন করে বাস্তবে ঘটে। একটা দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিটা চরিত্রের মানসিক দিকগুলো, তার নিজস্ব স্ট্রাগলগুলো উঠে আসবে। ‘নিখোঁজ’-এ ঠিক যেন এটাই দেখি আমরা। স্বামীকে তুলে নিয়ে যাবার যে প্রভাব মায়ের ওপর পড়বে, তার স্ট্রাগল যেমন হবে; পরিবারের বড় মেয়ে বাবাকে হারিয়ে তেমন স্ট্রাগল করবে না, তার স্ট্রাগল হবে ভিন্ন। আবার ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে বসা টিনেজ ছেলেটার মনস্তত্ত্বে বাবাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ছবি তাড়া করবে ভিন্নভাবে।

নিখোঁজ ওয়েব সিরিজটি দেখা যাচ্ছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে

নির্দেশক রিহান রহমান খুব যত্ন নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে এই তিন চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে যার যার স্ট্রাগলের গল্পটা বলেছেন। এতে করে একটি ঘটনারই প্রায় সবগুলো দিক সম্পর্কে দর্শক জেনেছে, বুঝেছে। ক্লাইম্যাক্স তাই একেক রকমভাবে আঘাত করেছে দর্শককে, যেমনটা করবে ঐ পরিবারকেও। রিহান রহমান তরুণ নির্মাতা, এই যে চরিত্রের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে একই গল্প ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখানো, মাস্টারস্ট্রোক মনে হয়েছে আমার কাছে। অনেকটা অ্যামাজন প্রাইমের পাতাললোকের কথা মনে করিয়ে দেয় এই ন্যারেটিভ স্টাইল, যেখানে চরিত্র ধরে গল্প আগায়। শুধু এখানেই থেমে থাকেননি রিহান, তিনি দুটো টাইমলাইন এনে ক্রমাগত সুইচ করেছেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। এতে করে ন্যারেটিভ প্রাণ পেয়েছে, নন-লিনিয়ার এই ট্রিটমেন্ট নতুন বয়ান তৈরি করেছে।

অভিনয়ের দিক থেকে স্পর্শিয়া আর মাসুম রিজওয়ান বেশি মুগ্ধ করেছে। তরুণী সাফিয়া আর টিনেজ সাইফ চরিত্রে বাবা হারানো দিকভ্রান্ত দুই ভাইবোন হিসেবে নিজেদের তারা মেলে ধরেছেন দারুণভাবে। মাসুম নিশ্চিতভাবেই অনেক দূর যাবেন, সেটি টের পাইয়ে দিয়েছেন। বিশ বছর পরে একই চরিত্রে আফসানা মিমি ও শ্যামল মাওলাও ভালো অভিনয় করেছেন। সাইফের মেন্টাল স্ট্রাগল ক্যারি করেছেন শ্যামল বিশ বছর পরে এসেও। সাফিয়ার চরিত্রে মিমিকে ক্লান্ত লেগেছে, হয়তো সাফিয়া আদতেই ক্লান্ত বাবার সত্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে। শতাব্দী ওয়াদুদ দুর্দান্ত। খায়রুল বাসার দারুণ। ইন্তেখাব দিনার, দীপান্বিতা মার্টিন, শিল্পী সরকার যার যার চরিত্রে মানানসই ছিলেন। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের স্বল্পতা ভালো লেগেছে।

ভালো লেগেছে এরকম একটা ইস্যু নিয়ে রিহান ডিল করায়। জঙ্গিবাদকে প্রতিহত করার সাহসী এক গল্পই তিনি রচনা করেছেন। কারণ খুব ভালো সুযোগ ছিল এই গল্পে সিমপ্যাথি ভুল দিকে যাবার, খুব সাবধানে রিহান সেটাকে কাটিয়ে উঠেছেন শেষভাগে এসে। অনুকম্পা, সহানুভুতি আসে ঠিকই তবে তার পুরোটাই সে পরিবারের জন্য, কোন ব্রেইনওয়াশড ইন্ডিভিজুয়ালের জন্য নয়। ‘নিখোঁজ’ বছরের সেরা ওয়েব সিরিজগুলোর একটা হয়ে থাকবে আশা করি। নতুন হিসেবে রিহান রহমানের প্রতি আশা অনেক বেড়ে গেল, তার পরবর্তী কাজগুলো দেখার অপেক্ষায় রইলাম।


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা