রায়হান রাফীর বিগত সিনেমাগুলোই সাক্ষ্য দেবে, সাধারণ দর্শকের পালস তিনি বেশ ভালোই বোঝেন। হিট সিনেমার ফর্মুলাও তার জানা। তিনি চাইলে 'নিঃশ্বাস'কে 'পরাণ' কিংবা 'পোড়ামন' এর মত আরেকটা পপুলিস্ট সিনেমায় কনভার্ট করলেও করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি যে নিজেকেই একটু অন্যভাবে বাজিয়ে দেখতে চাইলেন, সেটাই সবচেয়ে ইতিবাচক...

'হীরক রাজার দেশে' যে বয়সে দেখি, সে বয়সে এই সিনেমার পলিটিক্যাল মেটাফোরের দিকটি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। বুঝিনি 'যন্তরমন্তর ঘর' নামক রহস্যময় কামরার 'মগজ ধোলাই' এর কনসেপ্টও। কিন্তু যখন বুঝলাম, যখন মগজে ঢুকলো 'মগজ ধোলাই' এর পেছনের স্যাটায়ার... বেশ বিস্মিতই হয়েছিলাম। এবং যত সময় গড়াচ্ছে, আশেপাশে যত তাকাচ্ছি, বুঝতে পারছি এটাও, 'যন্তরমন্তর ঘর' কিংবা 'মগজ ধোলাই' এখনো প্রাসঙ্গিক। এখনো স্বমহিমায়। 'হীরকের রাজা ভগবান' 'জয় শ্রী রাম' কিংবা 'নারায়ে তাকবীর' এর ক্যামোফ্লাজে তারা বেঁচেবর্তেও আছে ভালোভাবে। 

রায়হান রাফীর এক্সপেরিমেন্টাল ওয়েব ফিল্ম 'নিঃশ্বাস' এর পুরোটাজুড়েই এই মগজ ধোলাইয়ের আলেখ্য৷ যেখানে একজন নারীকে কেন্দ্র করে এগোয় গল্প, যিনি কিছু মানুষের মগজ ধোলাইয়ের শিকার। ব্যক্তিগত জীবনে প্রচণ্ড টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যাওয়া এ নারীর টানাপোড়েনের সুযোগ নিয়ে, তার অসহায়ত্বকে 'হাতিয়ার' বানিয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ তাকে বানায় এমনই এক পথের যাত্রী, যে পথে হয়তো যাওয়া যায় অবলীলায়, কিন্তু ফিরে আসা হয় না। এই নারী, তার চারপাশ, এসবের মাঝখানে ওঠা নাভিশ্বাস, এসবের যৌথ গল্পই 'নিঃশ্বাস।' 

যে ইস্যু নিয়ে রাফী এখানে ডিল করেছেন, তা উপমহাদেশের সাপেক্ষে খুব সেন্সিটিভ এক ইস্যু।  এই ইস্যু নিয়ে আলাদাভাবে কথা বলে অস্বস্তিতে পড়তে চান না আজকাল কেউই। এবং রাফী ঠিক এখানটাতে এসেই খানিকটা ভিন্ন পথের অনুসন্ধানে নামেন। এমন এক দগদগে প্রসঙ্গে কথা বলার চেষ্ট করেন- যা নিয়ে কথা বলা উচিত সবারই। কিন্তু, কথা সেভাবে হচ্ছেনা। কথা বলার চেষ্টা করলেও থামানো হচ্ছে অনেককে। 

জুতসই হলোনা ফারিণের অভিনয়

যদিও এই যে সিরিয়াস ইস্যু, সেটাকে সরাসরি না বলে তিনি কিছু কমার্শিয়াল ট্রুপসের সাহায্য নিয়েছেন, কিছু পপুলিস্ট ন্যারেশনের ক্যামোফ্লাজ নিয়েছেন, কিছু জিনিস রাখঢাক করে বলেছেন। পাশাপাশি কিছু এক্সপেরিমেন্টও করেছেন৷ বেশ গ্রাম্পি একটা সেট অ্যাটমোস্ফিয়ার রেখেছেন। নন লিনিয়ার স্টাইলে গল্প বলার ক্ষেত্রে নিজের চিরাচরিত গণ্ডির বাইরে হেঁটেছেন, শট ডিস্ট্রিবিউশনেও কিছু চমক রেখেছেন। এগুলোর প্রতিটিই দারুণ বিষয়। কিন্তু, আক্ষেপ এটাই, মূল যে গল্প সেটা আরেকটু স্টাবলিশড হলে, এই এক্সট্রা টপিংসগুলো আলাদাভাবে কথা বলতো। কিন্তু সেটা হয়নি, অর্থাৎ, গল্পটা খানিকটা ফ্ল্যাট টোনের হওয়াতে, আলাদা দিকগুলোই চোখে পড়েছে বেশি। গল্পটা মাঝখান দিয়ে ম্যাড়মেড়ে রয়ে গিয়েছে। 

গল্পটা আরেকটু জমলে পারতো

তবে গল্প ভালো না হলেও ভালো হয়েছে শিল্পীদের অভিনয়ও। যদিও প্রোটাগনিস্ট তাসনিয়া ফারিণের অভিনয় আরেকটু ভালো হতে পারতো। ভালো করার সুযোগ ছিলো ইমতিয়াজ বর্ষণেরও। তবে তারা ছাড়া বাকিরা ঠিকঠাক। দিলারা জামান, অপু, সাফা, অশোক ব্যাপারী, ছবি... নিজ নিজ জায়গাতে ঠিকঠাকই পারফর্ম করেছেন তারা। স্ক্রিপ্টে খুব বেশি জায়গা এক তাসনিয়া ফারিণ ছাড়া কারোরই ছিলো না, তারপরেও স্বল্প গণ্ডিতে মোটামুটি ঠিকঠাক ডেলিভারিই দিয়েছেন সবাই।

মালায়ালাম বিখ্যাত সিনেমা 'সুপার ডিল্যাক্স' এ একটা লাইন ছিলো-

জনস্রোতের প্রচলিত মতামতের বাইরে গিয়ে দাঁড়ানো বরাবরই রিস্কি। 

রায়হান রাফী সেই কাজটিই যেন করেন 'নিঃশ্বাস' এ। রাফীর বিগত সিনেমাগুলোই সাক্ষ্য দেবে, সাধারণ দর্শকের পালস তিনি বেশ ভালোই বোঝেন। হিট সিনেমার ফর্মুলাও তার জানা। তিনি চাইলে 'নিঃশ্বাস'কে 'পরাণ' কিংবা 'পোড়ামন' এর মত আরেকটা পপুলিস্ট সিনেমায় কনভার্ট করলেও করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি যে নিজেকেই একটু অন্যভাবে বাজিয়ে দেখতে চাইলেন, সেটাই সবচেয়ে ইতিবাচক। 'নিঃশ্বাস' ভালো লাগবে কি না, সেটা দর্শকের জন্যেই বজায় থাকুক। কিন্তু একজন মেইনস্ট্রিম ডিরেক্টরের খানিকটা ভিন্ন পথে হাঁটার যে প্রচেষ্টা, সে প্রচেষ্টা কতটুকু উতরোলো, সেটা জানার জন্যে হলেও 'নিঃশ্বাস' এ চোখ রাখা যেতে পারে। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা