স্মৃতির পাতায় কত ছবি! সে কি আর, এত কম কথায় লিখে শেষ করা যায়। নব্বইয়ের দশকের ছেলেমেয়েরা জানে এসব শুধু বিজ্ঞাপন নয়, আমাদের ছোটবেলার স্মৃতি, আবেগ আর অনুভূতিরাও এই বিজ্ঞাপনগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে...

নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত বিজ্ঞাপনগুলোর কথা মনে পড়ে? হঠাৎ হঠাৎ সেসময়ের মনোমুগ্ধকর কিছু বিজ্ঞাপনের কথা মনে হলে নিশ্চয়ই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন আমার মত অনেকেই! এখন বিভিন্ন চ্যানেলে নাটক দেখতে বসলে ঘন্টার পর ঘন্টা নানা রকম বিজ্ঞাপন দেখে বাংলা চ্যানেল দেখার প্রতি তো অনেকের বিতৃষ্ণাই জন্মে যায়। কিন্তু, নব্বইয়ের দশকের ছেলেপেলেরা জানে কিছু সুন্দর বিজ্ঞাপনও কত কাঙ্খিত হতে পারে। 

তখন তো বেশিরভাগ মানুষের ঘরে টিভিতে দেখার মত একটা চ্যানেলই ছিল, বিটিভি। সে চ্যানেলের প্রতিটা খুঁটিনাটি অনুষ্ঠানই মধ্যবিত্তের ঘরের সবচেয়ে বড় বিনোদন। সে চ্যানেলে বিজ্ঞাপনও থাকত অল্প। সেই বিজ্ঞাপনগুলোর বেশিরভাগই এত সুন্দর ছিল যে আজও সেসব বিজ্ঞাপনের কথা মনে হলে আবেগে মন ভেসে যায়। পুরোনো দিনের সেসব বিজ্ঞাপনের কথা মনে আসতেই ইউটিউবে সার্চ দিলাম সেগুলো আছে নাকি দেখার জন্য। কিছু বিজ্ঞাপন পেলাম সেখানে, অনেককিছুই পেলাম না। যেগুলো পেলাম সেগুলো দেখতে গিয়েও স্মৃতির পাতায় কত ছবি ভেসে উঠল! সেসব ছবির কিছুটা আপনাদের সাথে শেয়ার করব বলে আজ লিখতে বসেছি। 

নব্বইয়ের দশকের বিটিভিতে প্রচারিত শাড়ির বিজ্ঞাপনগুলোর কথা মনে আছে? আজকালতো বাংলা চ্যানেলে শাড়ির বিজ্ঞাপন তেমন একটা দেখা যায় না। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হত সুন্দর সুন্দর সব শাড়ির বিজ্ঞাপন। চম্পা আর ছোট্ট মিমের অভিনীত, বৌরানী প্রিন্ট শাড়ির বিজ্ঞাপনের সেই অসাধারণ জিঙ্গেল তো সবার মুখে মুখে ফিরত, “রাণী রাণী রাণী রাণী বৌরানী, বৌরানী প্রিন্ট শাড়ি বৌরানী…”। 

নন্দিনী প্রিন্ট শাড়ির সেই বিজ্ঞাপন

অথবা বিজরী বরকতউল্লাহর অভিনীত সেই নন্দিনী প্রিন্ট শাড়ির বিজ্ঞাপন, “অনুরাগে অভিমানে ভাললাগা গানে গানে পরেছি গো নন্দীনি আজ…”। মৌসুমীর সুন্দরী প্রিন্ট শাড়িও বিজ্ঞাপন, “প্রিয়, ‍প্রিয়, সুন্দরী। সুন্দরী প্রিন্ট শাড়ি সুন্দরী..। এছাড়া মৌ-নোবেলের পাকিজা প্রিন্ট শাড়ি এবং বিপাশা নোবেলের জনী প্রিন্ট শাড়ির বিজ্ঞাপনও অনেকের দারুণ পছন্দের ছিল। 

মনে আছে, সেই শাইন-পুকুর হোল্ডিংস্ এর বিজ্ঞাপনগুলোর কথা? তেমন সুন্দর জিঙ্গেল ছিলোনা, কথায় কথায় সাজানো আবেগঘন সেসব বিজ্ঞাপন পরিবারের ছোট-খাট আবেগঘন মুহূর্তকে ফুটিয়ে তুলত। একজন ব্যাবসায়ীর অফিস থেকে ফেরার পথে স্ত্রীর সাথে কথোপকথন, একটা বাড়ির স্বপ্ন- 
-একটা দখিনের বারান্দা, একটা বাগান, বাচ্চাদের জন্য একটা খেলার জায়গা, শোবার ঘরের সাথে একটা বারান্দা, বড় ড্রেসিং রুম... 
-নিজেদের একটা বাড়ি? 
-না, একটা স্বপ্ন।” 

আরেকটা বিজ্ঞাপনে মাকে হাসপাতাল থেকে আনার পথে ছেলের মাকে দেওয়া আশ্বাস, “কাল ফ্লাটের পজিশন পেয়েছি। তোমাকে সারপ্রাইস দেব বলে বলিনি মা। সামনের বাগানে বাঁধানো বাগান পথ, কাদায় পিছলে আর পা ভাঙবেনা মা…।” অথবা এক ভদ্রলোকের স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে দেওয়া সারপ্রাইজ, “চোখ বন্ধ, বেছে নাও…। বিজ্ঞাপনগুলো কি যে ভালো লাগত তখন! সেসময় রঙের বিজ্ঞাপনগুলোও মজার ছিল, “রঙ রঙ রঙ রঙ রঙ, পেইলাক মনের মত রঙ” বা “সেই ১৯৫৩ সাল থেকে রক্সি পেইন্ট..হাজারো রঙের মাঝে আজও তাই সেরা সে যে প্রিয় নাম প্রিয় রং রক্সি” অথবা “দেখো দেখো দেখোরে রুমানার বাহার…”। মজার সেসব বিজ্ঞাপন দেখে তো ছোট বেলায় নাচই শুরু করে দিতাম বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলের তালে তালে।

সাবানের বিজ্ঞাপনগুলোও ছিলো চমৎকার। অনন্য সুন্দর সব লাক্সের মডেল বিপাশা, শমী কায়সার, মৌ, আফসানা মিমি, ঈশিতা, মৌ্সুমী আরও কত কে। মডেলদের স্নিগ্ধ সৌন্দর্য আর বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের মুন্সিয়ানায় সবার মন জয় করে নিত বিজ্ঞাপনগুলো। কেয়া সাবানের বিজ্ঞাপনে মৌ-নোবেল জুটি ছিল অনন্য। এছাড়া এরোমেটিক, মেরিল, কসকো, লিলি, ডেটল, লেমন, ক্যামেলিয়া এসব সাবানের বিজ্ঞাপনও ছিল চমৎকার। 

লাক্স সাবানের বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে শমি কায়সার ও বিপাশা হায়াত

নারিকেল তেলের বেশ কিছু সুন্দর বিজ্ঞাপন ছিল। জুঁই নারিকেল তেলের সেই যে, “সেই দিন মনে ভাসে আজও এখনো সজীব যেনো…” সুন্দর এই জিঙ্গেল এর সাথে দুই বান্ধবীর কথোপকথন, “মনে আছে, সেই নীল খাম চিঠি। তোমার ঘন কালো চুলে হারিয়ে যায় মন” এর মধ্যেই নায়কের আবির্ভাব, “আমার মন এখনো হারায়…”। মৌ নোবেলের কেয়া নারিকেল তেলের বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল তো আজও মন কেড়ে নেয়, “রুপসী রেশমী চুলে, দোলে গো কেয়া দোলে। চুলের ওই মেঘ কাজলে দোলে গো কেয়া দোলে।” এছাড়া হাঁসমার্কা নারিকেল তেল, তিব্বত কদুর তেল এসবের বিজ্ঞাপনও ছিল দেখার মত। 

এতকিছুর মাঝে লবণের বিজ্ঞাপনগুলোই বা বাদ থাকবে কেন, “ছিইল্লা কাইটা মোল্লা লবণ লাগায়া দিমু” তো মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেপেলেদের মুখের বুলি হয়ে গিয়েছিল। “লবণ খাঁটি ভাই লবণ খাঁটি, মধুমতী। তফাটটা তাই রাত আর দিন।” মজা ছিল এটাও। আরও কিছু বিজ্ঞাপনের কথা না বললে অন্যায় হয়ে যাবে। মেরিল ব্যান্ডের কিছু বিজ্ঞাপন ছিল খুবই সুন্দর। মেরিল সাবান, তেল, জেল আর পাউডার সব বিজ্ঞাপনই ভালো ছিল। 
“মনে পড়ে মনে পড়ে ফেলে আসা সুন্দর দিনগুলো।…ছোট ছোট কত স্মৃতি আজও মনে পড়ে” এক ছেলের, ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ রেড কাউ গুড়ো দুধের বিজ্ঞাপনে। সে তো আমাদের ছোটবেলার কত স্মৃতির সাথেই মিলে যায়। আবার এ্যাংকর মিল্ক এর বিজ্ঞাপন, “যে দেশে গরু খায়, সবুজ ঘাস, সেই দেশ দুধের দেশ নিউজিল্যান্ড….মায়েদের আস্থায় এ্যাংকর মিল্ক।” আর নতুন শতাব্দীর শুরুতে জেমস বা শুভ্র দেবের পেপসির বিজ্ঞাপনগুলোতো আক্ষরিক অর্থেই মনে প্রাণে দোলা দিয়ে যেত!   

অলিম্পিক ব্যাটারির সেই জনপ্রিয় জিঙ্গেল, “আলো আলো বেশি আলো, শব্দে শব্দে মত মাতালো। অলিম্পিক অলিম্পিক ব্যাটারী”। স্টার শিপ কনডেন্সট মিল্ক এর, “বেশি লাভ, বেশি কাপ, বেশি কাপ চা। স্টার শিপে বেশিকাপ চা…।” নিপ্পন টিভির, “নিপ্পন ভালো টেলিভিশন নিপ্পণ”। পেডরোলো পাম্প এর, “মাঠে কৃষি কাজেতে, পেডরোলো সাথী হে। ইতালির বিখ্যাত পেডরোলো পাম্প..” 

এসবই মানুষের, বিশেষ করে সেসময়ে আমাদের মত ছোট ছেলে-মেয়েদের মুখে মুখে ফিরত। লিখতে থাকলে শেষ হবে না। স্মৃতির পাতায় কত ছবি! সে কি আর, এত কম কথায় লিখে শেষ করা যায়। নব্বইয়ের দশকের ছেলেমেয়েরা জানে এসব শুধু বিজ্ঞাপন নয়, আমাদের ছোটবেলার স্মৃতি, আবেগ আর অনুভূতিরাও এই বিজ্ঞাপনগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা