কেন যেন, এই সিনেমারা, যারা অতীতের সাথে আঁতাত করিয়ে দেয় বর্তমানের, তারা কখনোই মলিন হয়না, ম্লান হয়না। পর্দার গল্পে তারা ক্রমশই মনে করায় শৈশব, কৈশোর, প্রণয়, তারুণ্য, শিক্ষাজীবন...বহুকিছু। ক্রমশই তারা নস্টালজিক করে। উপলব্ধি করায় প্রথম সবকিছুর তাৎপর্যও!

কিছু সিনেমা জীবনমুখী বার্তার সন্ধান দেয়। কিছু সিনেমার পুরোটাজুড়েই থাকে নিখাদ হাসি-খুশি-আনন্দ। আবার কিছু সিনেমা খুব সহজেই ঘুরিয়ে আনে স্মৃতির মেমোরি-লেন থেকে। এবং এই শেষোক্ত শ্রেণির সিনেমাগুলো বরাবরই অন্যরকম দ্যোতনার সন্ধান দিয়ে হয়ে থাকে অমলিন। কেন যেন, এই সিনেমারা, যারা অতীতের সাথে আঁতাত করিয়ে দেয় বর্তমানের, তারা কখনোই মলিন হয়না, ম্লান হয়না। পর্দার গল্পে তারা ক্রমশই মনে করায় শৈশব, কৈশোর, প্রণয়, তারুণ্য, শিক্ষাজীবন...বহুকিছু। এরকমই কিছু সিনেমা, যে সিনেমা অক্ষয় মানদণ্ডে ধ্রুবক থেকে ক্রমশই অতীত রোমন্থন করে, বিগত জীবনের স্মৃতিকাতরতায় বুঁদ করে, তাদের নিয়েই আজকের কথাবার্তা। 

১. থ্রি ইডিয়টস

বলিউডে অজস্র সিনেমা আসবে-যাবে, কিন্তু থ্রি ইডিয়টসের আবেদন বোধহয় ফুরোবেনা কোনোদিনই। বন্ধুত্ব, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা নিয়ে এমন মুগ্ধকর ছবি, এমন অর্থবহ জীবনবোধের টুকরো টুকরো আখ্যান... অনবদ্য। 'থ্রি ইডিয়টস' দেখার পরে যাপিত ধ্যানধারণায় পরিবর্তন তো আসেই, পাশাপাশি প্রিয় ক্লাসরুম, সহপাঠী কিংবা ভালোবাসার মানুষের কথাও মনে পড়ে ক্রমশ। 

থ্রি ইডিয়টস 

২. নাইন্টি সিক্স

এই সিনেমা নিয়ে যত কথা বলা যায়, ততই যেন কম হয়ে যায়। ক্লাসরুম, প্রথম প্রেম, দুরুদুরু বুক, আতঙ্ক, শঙ্কা... বিজয় সেথুপতি এবং তৃষার এই প্রণয়-গল্পে ক্রমশ যেন ফুটে ওঠে নাইন্টিজ এর তামিলনাড়ুও। বিষন্নতা, মায়া, স্নিগ্ধতা... পাশাপাশিই যেন হাত ধরাধরি করে এগোয় এ নির্মাণে। এবং এভাবেই ক্রমশই নষ্টালজিয়ায় ডুবিয়ে ফেলে অদ্ভুত সুন্দর এ ক্লাসিক। 

নাইন্টি সিক্স 

৩. সাতাই

জবরজঙ সরকারি স্কুলের নানাবিধ প্রতিকূলতা আর একঝাঁক বখে যাওয়া শিক্ষার্থী... এদের মাঝেই একদিন এসে উপস্থিত হলেন নতুন এক শিক্ষক। তিনি শুরু করলেন অবাধ্যদের বাধ্য করার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা, সিস্টেমকে শুধরানোর আখ্যান। এই নির্মাণে এসবের পাশাপাশি ক্রমশ উঠে এলো এমন সব পরিস্থিতি, যেসব পরিস্থিতির সাথে অতীতে আমরাও যুদ্ধ করেছি ক্রমশ। 'অতীত' নামক গুহাতেই যেন মশাল নিয়ে ঢুকে গেলো 'সাতাই' নামের এ নির্মাণ। 

৪. প্রেমাম

জর্জ নামের এক প্রোটাগনিস্ট এবং তার জীবনের তিনটি প্রেম নিয়ে যে অনবদ্য নির্মাণ 'প্রেমাম', তা দেখতে বসলে যে কারোরই মনে পড়বে প্রথম প্রেমে পড়ার স্মৃতি, বুকের মাঝে প্রথমবার পাখা ঝটপটানির আওয়াজ। 'প্রেমাম' যেন প্রথম প্রণয়কে মনে করানোর ছোটবেলার খুব ব্যক্তিগত ডায়েরি। খুব যত্নে আগলে রাখার যে প্রণয়-স্মৃতি, 'প্রেমাম' সেই স্মৃতিকেই উসকে দেওয়ার কাজ করে বরাবর। 

প্রেমাম

৫. আনন্দম

কলেজ থেকে শিক্ষাসফর গিয়ে প্রেমে পড়া, অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে সংকটের মুখোমুখি হওয়া... নানামুখী স্মৃতিতে ভাস্বর এ সিনেমায় ক্রমশ আবির্ভূত হয় কলেজ-জীবনের বন্ধুত্ব, হাসি-খুশি, খুনসুটিও। ফেলে আসা জীবন, প্রিয় সব বন্ধু,  যাদের নিয়েই ছিলো যাপিত সবকিছু,  তাদের কথা ক্ষণে ক্ষণে মনে করিয়ে হারানো সুরের পেলব-কোমল অভিজ্ঞতাই দেয় এ নির্মাণ। 

আনন্দম 

৬. থানির মাথান দিনাঙ্গাল

মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বিজ্ঞান বিতর্ক, ক্লাসরুমে শত পায়রার ওড়াওড়ি, বিতর্কিত ক্রিকেট ম্যাচ, প্রথম প্রেম... শৈশব ও কৈশোরের বহু টুকরো টুকরো স্মৃতিই যেন ক্রমশই চলে আসে এই নির্মাণের পুরো যাত্রাপথে। পুরো সিনেমায় অজস্র প্লট-সাবপ্লট থাকলেও নষ্টালজিয়ার অনুভূতিতে তা একটুও ব্যত্যয় ঘটায় না। বরং যথাযোগ্য সমর্থনই দিয়ে যায় পুরোপুরি। এবং শেষে এসে খানিকটা যেন চোখ বাষ্পীয়ও হয়। অতীতের কথা ভেবেই হয়তো! 

থানির মাথান দিনাঙ্গাল

৭. থ্রি

সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ঘরানার সিনেমা হওয়া সত্বেও 'থ্রি'তে রাম এবং জননীর প্রণয়ের দিনগুলো যেভাবে দুর্দান্ত সাবলীলভাবে উঠে আসে, তা যে কাউকেই যেন স্মৃতিকাতর করে দেয় এক লহমায়। এবং ঠিক সে সৌকর্য সাপেক্ষে, 'থ্রি'র মূল উপজীব্য অন্য কিছু হওয়া সত্বেও তার ফ্ল্যাশব্যাকে অতীত-রোমন্থনের ব্রিলিয়ান্সটুকু উপেক্ষা করা যায় না। খানিকটা স্মৃতিমেদুর যেন হতেই হয়। 

থ্রি

৮. পাত্তালাম

শৈশবের অবাধ্যতা, বাউন্ডুলেপনা কিংবা উন্মত্ততাই যেন উঠে আসে 'পাত্তালাম' এর পুরো উপাখ্যানে। শৈশব-কৈশোরের পায়ের তলায় সর্ষের দিনগুলো, বন্ধুত্ব, প্রণয়, ঈর্ষা, দূরত্ব... সবকিছুই ধীরে ধীরে মনে করায় 'পাত্তালাম।' মুমূর্ষু স্মৃতির নুড়িপাথরে আস্তে আস্তে হাঁটার জন্যে এরকম আদর্শ নির্মাণ আছে খুব কমই।

পাত্তালাম

অনুপম রায় গেয়েছিলেন- 

কখনও সময় পেলে একটু ভেবো,
আঙ্গুলের ফাঁকে আমি কই?

ব্যস্ততা আমাদের মোটেও দেয়না একটু তিষ্ঠোনোর অবকাশ, তবুও এক চিলতে সময় কখনো হাতে পেলে চোখ রাখা যেতে পারে এই নির্মাণগুলোর উপরে। যে নির্মাণেরা অস্ফুটে বরাবরই বলে প্রিয় অতীতের গল্প, যারা বরাবরই নিয়ে যায় এ জীবন ছেড়ে চলে যাওয়া বহু দূরের কুয়াশা-ভেজা বাতাসে। এবং ঠিক এখানে এসেই এই নির্মাণগুলো হয়ে যায় অমোঘ প্রাপ্তি কিংবা অতীত দেখার দুর্লভ বায়োস্কোপ।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা